
মো. খোরশেদ আলম জুয়েল: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতার প্রভাব যখন বিশ্বজুড়ে পোল্ট্রি খাতে চাপ তৈরি করছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশের এই খাতকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে অভ্যন্তরীণ একাধিক সংকটের। ফলে সামগ্রিকভাবে শিল্পটি এখন একটি জটিল ও স্পর্শকাতর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশের বেশ কয়েকটি ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে ফিডের দাম বাড়িয়েছে। ভুট্টা, সয়াবিন মিল ও আমদানিনির্ভর অন্যান্য উপকরণের ওপর দামের চাপ বাড়ায় ফিডমিলারদের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে, যার প্রভাব পড়ছে খামারিদের ওপর।
তবে খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সংকট শুধু খরচ বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর শিকড় আরও গভীরে। দীর্ঘদিন ধরে ব্রয়লার, সোনালী মুরগি ও ডিমের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় দেশের হাজার হাজার খামার ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ছোট-মাঝারি খামারিদের উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে, যা বাজারে সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।
এর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে রোগব্যাধির প্রাদুর্ভাবের খবর। অসমর্থিত বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বেশ কয়েক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণে অসংখ্য মুরগি মারা গেছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি, তবুও খামারিদের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে হারিয়ে যেতে পারে হাজারো খামারি, কমে যেতে পারে উৎপাদন, যার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়বে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি এবং ভোক্তাদের ওপর।
পবিত্র ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে বাজারে স্বাভাবিকভাবেই চাহিদা বেড়েছিল। সে সময় ব্রয়লার মুরগির দাম কিছুটা বাড়লেও ঈদের পরপরই তা আবার কমে এসেছে। অন্যদিকে সোনালী মুরগির দাম বাড়ার পর এখনো কিছুটা সেই অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে বাড়েনি ডিমের দাম এবং ফিডের দাম বাড়ার কারণে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে এ খাতে বাড়বে আরো চাপ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের পোল্ট্রি খাত একদিকে বৈশ্বিক অস্থিরতার চাপ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ দাম ও উৎপাদন সংকট-এই তিন এর মধ্যে আটকে পড়েছে। খামার বন্ধ হয়ে যাওয়া, রোগের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে খাতটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাজার স্থিতিশীল রাখা, খামারিদের টিকিয়ে রাখা এবং রোগ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের পোল্ট্রি খাত আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক ও স্থানীয় সংকটের দ্বৈত চাপে বাংলাদেশের পোল্ট্রি খাত এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই অবস্থায় সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও কার্যকর নীতিমালা গ্রহণই নির্ধারণ করবে খাতটির ভবিষ্যৎ পথচলা।



