
খুলনা সংবাদদাতা: নিরাপদ, টেকসই ও আধুনিক ব্রয়লার উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে খুলনায় অনুষ্ঠিত হয়েছে “খুলনা বিভাগীয় কর্মশালা”। ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন—বাংলাদেশ শাখা (WPSA-BB) আয়োজিত এ কর্মশালায় ব্রয়লার খামারে সঠিক পুষ্টি ও ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত মাংস উৎপাদন এবং আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) খুলনার সোনাডাঙ্গায় হোটেল গ্র্যান্ড খুলনা-এ দিনব্যাপী এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালায় পোল্ট্রি খাতের উদ্যোক্তা, খামারি, বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, সরকারি কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা অংশ নেন।
কর্মশালার মূল লক্ষ্য ছিল মাঠপর্যায়ের খামারিদের আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ব্রয়লার পালন সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক ধারণা দেওয়া এবং নিরাপদ ও মানসম্মত ব্রয়লার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
সকাল ৯টা থেকে শুরু হয় কর্মশালার নিবন্ধন কার্যক্রম। পরে অতিথিদের আসন গ্রহণের মধ্য দিয়ে মূল কার্যক্রম শুরু হয়। পরে স্বাগত বক্তব্য ও কর্মশালার উদ্দেশ্য এবং ওয়াপসা-বিবির কার্যক্রম তুলে ধরেন মো. জাকারিয়া ইসলাম, সদস্য ওয়াপসা-বিবি।
কর্মশালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেশন ছিল “নিরাপদ ও আদর্শ ব্রয়লার খামার তৈরিতে পুষ্টি ও ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব”। এ বিষয়ে আলোচনা করেন ওয়াপসা-বিবির সদস্য মোহাম্মদ নাজমুস সাকিব হামিম।
সেশনে ব্রয়লারের সঠিক বৃদ্ধির জন্য বয়সভিত্তিক সুষম পুষ্টি, খাদ্যের গুণগত মান, পানি ব্যবস্থাপনা, ফিড ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং খামারের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বিশেষ করে, শুধু ভালো মানের বাচ্চা বা ফিড ব্যবহার করলেই কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন নিশ্চিত করা যায় না—বরং বাচ্চার জেনেটিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সঠিক পুষ্টি, পরিবেশ, পানি, বায়োসিকিউরিটি ও দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন—এ বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
এরপর “নিরাপদ ও আদর্শ ব্রয়লার খামার তৈরিতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব” শীর্ষক সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য দেন খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ডা. মো. শহিদুল ইসলাম।
তিনি ব্রয়লার খামারে রোগ প্রতিরোধ, খামারের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখা, বায়োসিকিউরিটি, পরিচ্ছন্নতা ও জীবাণুনিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
আলোচনায় রোগ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসার পরিবর্তে ভ্যাক্সিনেশন সিডিউল ও রোগ প্রতিরোধে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়। একই সঙ্গে খামারে প্রবেশ ও বহির্গমন নিয়ন্ত্রণ, সরঞ্জাম ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে রোগের ঝুঁকি কমানোর বিষয়েও আলোচনা করা হয়।
কর্মশালায় বিশেষ গুরুত্ব পায় অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত ব্রয়লার উৎপাদন। এ বিষয়ে ওয়াপসা-বিবির সদস্য মো. আবদুর রহমান “এন্টিবায়োটিকমুক্ত ব্রয়লার উৎপাদনের বিবেচ্য বিষয়সমূহ” শীর্ষক আলোচনা করেন।
সেশনে অপ্রয়োজনীয় ও অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ঝুঁকি, সঠিক রোগ নির্ণয়, প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা এবং খামার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রোগের চাপ কমানোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের পরিবর্তে বিভিন্ন প্রি- বায়োটিক, প্রো-বায়োটিক, পোস্ট বায়োটিক, সিম-বায়োটিক, ব্যাকটেরিওফাজ, ফাইটোজেনিক ও এনজাইমের উপর গুরুতু এবং এগুলোতে ভোক্তার আস্থা তৈরির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
এছাড়াও কর্মশালায় একটি নতুন সম্ভাবনাময় খাত হাঁস পালন নিয়ে আলোচনা করেন এ.এফ.এম. ফয়জুল ইসলাম মানিক। বক্তা বলেন বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৭ কোটি হাঁস রয়েছে , যা বিশ্বে চীন ও ভিয়েতনামের পর তৃতীয় বৃহত্তম। হাঁসের ফিড, হ্যাচারি, নিরাপদ ডিম-মাংস, প্রসেসিং, ভ্যাকসিন ও ডায়াগনস্টিকসে বড় বাজার তৈরি হলেও জেনেটিকস, স্বাস্থ্য ও কোল্ড-চেইনে এখনও গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি রয়েছে। জনগণের জন্য এটি নিরাপদ ও মানসম্মত প্রাণিজ প্রোটিনের সুযোগ, আর বিনিয়োগকারীদের জন্য-হ্যাচারি, ফিড, ভ্যাকসিন, প্রসেসিং ও লাস্ট-মাইল সেবায় একটি দ্রুত-বর্ধনশীল সম্ভাবনাময় খাত হতে পারে ডাক ইন্ডাস্ট্রি।
কর্মশালার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল খামারিদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়। এ পর্বে অংশগ্রহণকারী খামারিরা মাঠপর্যায়ে ব্রয়লার উৎপাদনের সময় তাদের বিভিন্ন সমস্যা, চ্যালেঞ্জ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে কর্মশালায় উপস্থিত অতিথিরা বক্তব্য প্রদান করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ওয়াপসা-বিবির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফয়েজুর রহমান।
তিনি পোল্ট্রি শিল্পের টেকসই উন্নয়নে খামারি, শিল্প উদ্যোক্তা, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আরও অংশ নেন খুলনা বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ডা. মো. আব্দুর রহিম। তিনি মাঠপর্যায়ে প্রাণিসম্পদ ও পোল্ট্রি উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি সেবা ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আলোচনা করেন।
এছাড়া যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. ফারুক হাসান কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন। তিনি নিরাপদ পোল্ট্রি উৎপাদনে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান।
কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান সরকার। তিনি নিরাপদ ও মানসম্মত পোল্ট্রি উৎপাদনে বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরেন। পোল্ট্রি খাতের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভোক্তার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে খামার পর্যায় থেকেই যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা, পোল্ট্রি শিল্প ও খামারিদের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন ওয়াপসা-বিবির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং ওয়াপসা-বিবি বিভাগীয় কর্মশালা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াস হোসেন।
সভাপতির বক্তব্যে পোল্ট্রি খাতের উন্নয়নে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, জ্ঞান বিনিময় এবং মাঠপর্যায়ের খামারিদের আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, একটি আধুনিক ও নিরাপদ ব্রয়লার খামার প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; বরং পুষ্টি, স্বাস্থ্য, বায়োসিকিউরিটি, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ খাদ্য এবং দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সমন্বিত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কর্মশালার শেষ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ-পরবর্তী মূল্যায়ন অনুষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণের আলোচিত বিষয়গুলো সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের জ্ঞান ও উপলব্ধির পরিবর্তন মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়।
খুলনা বিভাগের এই কর্মশালার মধ্য দিয়ে পোল্ট্রি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়—সঠিক পুষ্টি, আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা, রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, বায়োসিকিউরিটি এবং অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত নিরাপদ ব্রয়লার উৎপাদন—একটি সমন্বিত প্রশিক্ষণ কাঠামোর মধ্যে তুলে ধরা হয়।
আয়োজকদের মতে, মাঠপর্যায়ে খামারিদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে নিরাপদ ও টেকসই পোল্ট্রি উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ ধরনের বিভাগীয় কর্মশালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন—বাংলাদেশ শাখা (WPSA-BB)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মশালা পোল্ট্রি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবভিত্তিক সমাধান বিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়। সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন ওয়াপসা-বিবির সদস্য মোহামেমদ নাজমুস সাকিব হামিম।



