
ফরিদপুর সংবাদদাতা : পারিবারিক পর্যায়ে দেশি মুরগি পালনকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ নারীদের স্বাবলম্বী ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) উদ্যোগে মাঠ দিবস ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ শনিবার (২৭ জুন) বিএলআরআই আঞ্চলিক কেন্দ্র, ফরিদপুরে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রকল্পের আওতায় গড়ে ওঠা নারী উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা, সাফল্য ও সম্ভাবনার নানা দিক উঠে আসে।
বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি (বিএএস)-এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ)-এর অর্থায়নে পরিচালিত ‘স্টাডি অন রুরাল ফ্যামিলি চিকেন এগ্রো-এন্টারপ্রাইজেস মডেলিং’ শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে ‘পারিবারিক দেশি মুরগি পালনভিত্তিক গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন মডেল’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এ আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির সম্মানিত ফেলো এবং বিএলআরআই’র সাবেক মহাপরিচালক ড. খান শহিদুল হক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএলআরআই’র মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক।
সকাল ১০টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। স্বাগত বক্তব্য দেন বিএলআরআই’র প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং প্রকল্পের প্রধান গবেষক ড. মোহাম্মদ আব্দুর রশিদ। তিনি প্রকল্পের উদ্দেশ্য, বাস্তবায়ন অগ্রগতি এবং অর্জিত সাফল্যের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
উপস্থাপনায় তিনি জানান, ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার গঙ্গাধরদী গ্রামে চারটি গ্রুপের মাধ্যমে ১২০ জন গ্রামীণ নারীকে দেশি মুরগি পালনভিত্তিক উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।
উদ্যোক্তাদের প্রত্যেককে মোরগ-মুরগি, খামার স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সহায়তা, ওষুধ, কৃমিনাশক ও ভ্যাকসিন সরবরাহের পাশাপাশি নিয়মিত কারিগরি প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। এর ফলে প্রকল্পের আওতায় গড়ে ওঠা অনেক নারী ইতোমধ্যে স্বাবলম্বী খামারি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের সমন্বয়ে গঠিত সমিতিগুলোতে বর্তমানে প্রায় চার লাখ টাকার সঞ্চয় জমা হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তা কার্যক্রম সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মূল উপস্থাপনার পর অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে নারী উদ্যোক্তা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং বিএলআরআই’র বিভিন্ন বিভাগের বিভাগীয় ও দপ্তর প্রধানরা অংশ নেন। আলোচনা সভায় প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্নোত্তর, মতবিনিময় এবং কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ ও টেকসই করার বিষয়ে নানা পরামর্শ উঠে আসে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল প্রকল্পের আওতায় গড়ে ওঠা সফল নারী উদ্যোক্তাদের সম্মাননা প্রদান। স্থানীয় পর্যায়ে গঠিত বিচারক কমিটির মূল্যায়নের ভিত্তিতে ১০ জন নারী উদ্যোক্তাকে সম্মাননা জানানো হয়। এর মধ্যে হাসনাহেনা গ্রুপের মোছা. ফিরোজা আক্তার ‘শ্রেষ্ঠ নারী উদ্যোক্তা’ হিসেবে নির্বাচিত হন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. খান শহিদুল হক বলেন, এই প্রকল্প শুধু নারী উদ্যোক্তা তৈরিই করেনি, বরং গ্রামীণ নারীদের নেতৃত্ব বিকাশ এবং ক্ষমতায়নের একটি কার্যকর মডেল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তিনি বলেন, “নারীরা পরিবার ও সমাজের কেন্দ্রবিন্দু। তাদের শিক্ষা, পুষ্টি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা গেলে একটি জাতির সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।”
গবেষণার বাস্তব প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি আরও বলেন, “গবেষণার ফলাফল গবেষণাগারের দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। তা খামারির ঘরে পৌঁছাতে হবে এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে। মানুষের কল্যাণে ব্যবহার না হলে গবেষণার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।”
প্রকল্পের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বিএলআরআই’র অব্যাহত সহযোগিতা কামনা করে তিনি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য টেকসই ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে বিএলআরআই’র মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক বলেন, প্রকল্পের সফলতা মূলত সংশ্লিষ্ট জনবলের আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ এবং অংশগ্রহণকারীদের আগ্রহের ওপর নির্ভর করে।
তিনি বলেন, “দেশি মুরগি পালন নিয়ে গ্রামীণ পর্যায়ে প্রচলিত বহু ভ্রান্ত ধারণা এই প্রকল্পের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব হয়েছে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। খামারিরা যদি বিএলআরআই’র বিজ্ঞানভিত্তিক পরামর্শ ও প্রযুক্তি যথাযথভাবে অনুসরণ করেন, তবে এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় সফলতায় রূপ নেবে।”
তিনি নারী উদ্যোক্তাদের ধারাবাহিকভাবে খামার পরিচালনা ও সম্প্রসারণের আহ্বান জানান এবং ভবিষ্যতেও বিএলআরআই’র পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও পরামর্শমূলক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।
এই সংস্করণে সংবাদটির ইনট্রো, তথ্য প্রবাহ, উদ্ধৃতি ব্যবস্থাপনা, অনুচ্ছেদ বিভাজন এবং ভাষার গতি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার মান অনুসারে সাজানো হয়েছে, ফলে এটি সরাসরি প্রকাশযোগ্য।



