
মো. খোরশেদ আলম জুয়েল : দেশের মানুষের পুষ্টির অন্যতম সহজলভ্য উৎস ডিম। কিন্তু যে ডিম কোটি মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা পূরণ করছে, সেই ডিম উৎপাদন করেই গত ১৯ মাস ধরে টানা লোকসান গুনেছেন দেশের খামারিরা। উৎপাদন খরচের সঙ্গে বাজারদরের দীর্ঘস্থায়ী ব্যবধান, উচ্চ ফিডের দাম, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং খামার পর্যায়ের দামের ওপর মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব—সব মিলিয়ে ডিম উৎপাদন এখন অনেক খামারির জন্য লাভজনক ব্যবসার বদলে এখন অস্তিত্ব টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোল্ট্রি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. বাপন দে’র সম্প্রতি বিশ্ব ডিম দিবস-২০২৬ উপলক্ষে প্রস্তুত করা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ডিম উৎপাদন খাতের এই কঠিন বাস্তবতা। প্রেজেন্টেশনের তথ্য অনুযায়ী, একটি সাদা ডিম উৎপাদনে খরচ প্রায় ১০ টাকা ১৬ পয়সা এবং বাদামি ডিমে প্রায় ১০ টাকা ৮৪ পয়সা। এর মধ্যে সাদা ডিমের মোট খরচের ৭৪ দশমিক ১ শতাংশ এবং বাদামি ডিমের ৭৫ দশমিক ১ শতাংশই ফিড বাবদ ব্যয় হয়।
অর্থাৎ ডিমের উৎপাদন ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে ফিডের দাম। অথচ বাজারে ডিমের দাম যখন উৎপাদন খরচের নিচে নেমে যায়, তখন খামারির সামনে লোকসান মেনে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া কার্যত আর কোনো পথ থাকে না। খামারি ইচ্ছে করলেই দু’দিনরে জন্য ডিম উৎপাদন বন্ধ করে দিতে পারে না, এক্ষেত্রে প্রকৃতির কাছে তারা বড্ড অসহায়। এ যেন এমন এক শিল্প, যেখানে দেশের কোটি মানুষের পুষ্টির জোগান দিতে গিয়ে উৎপাদনকারী নিজেই ক্রমাগত আর্থিক অপুষ্টির শিকার হচ্ছেন।
প্রফেসর বাপন দে’র প্রেজেন্টেশনে মাসভিত্তিক দেয়া তথ্যে আরও ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। বিগত ২০২৫ সনের জানুয়ারিতে ডিমের দাম ছিল ৯ টাকা ৭৩ পয়সা। একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৯ টাকা ৪৫ পয়সা, মার্চে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা, এপ্রিলে ৯ টাকা ৬ পয়সা এবং জুনে ৮ টাকা ৫২ পয়সায় নেমে আসে। বছরের শেষদিকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় -নভেম্বরে ডিমের দাম ৮ টাকা ৮৫ পয়সা এবং ডিসেম্বরে মাত্র ৭ টাকা ৬৭ পয়সায় দাঁড়ায়।
২০২৬ সালেও খামারিদের দুর্দশা কাটেনি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডিমের দাম ছিল ৭ টাকা ৮৫ পয়সা, ফেব্রুয়ারিতে ৭ টাকা ২৬ পয়সা এবং মার্চে ৭ টাকা ৪৩ পয়সা। এপ্রিলেও দাম ছিল ৮ টাকা ৭৮ পয়সা। মে মাসে কিছুটা বেড়ে ৯ টাকা ৯৮ পয়সা হলেও তা ১০ টাকা উৎপাদন ব্যয়ের নিচেই ছিল। জুনে আবার দাম নেমে আসে ৮ টাকা ৫০ পয়সায়। জুলাইয়ে ৯ টাকা ৬০ পয়সা। অর্থাৎ ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত টানা ১৯ মাসে ডিমপ্রতি উৎপাদন খরচ কমসে কম ১০ টাকা ধরলেও খামারিরা লোকসানের মুখে ছিলেন। তবে বিগত ৩ মাসে ফিডের দাম বৃদ্ধির হিসেবে করলে ডিমপ্রতি উৎপাদন খরচ আরো বাড়বে -এতে কোন সন্দেহ নাই।
দীর্ঘ এবং একটানা ১৯ মাসের লেয়ার খামারিদের এই লোকসানকে শুধু একটি পণ্যের দামের ওঠানামার গল্প হিসেবে বিবেচনা করলে হবে না; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো খামারির বিনিয়োগ, ঋণ, শ্রম এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ। একটি খামারে প্রতিদিন হাজার হাজার ডিম উৎপাদিত হলেও প্রতি ডিমে মাত্র এক-দুই টাকা লোকসানও মাস শেষে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিতে পরিণত হয়। অথচ খামারের বিদ্যুৎ, শ্রম, ওষুধ, টিকা, পানি, পরিবহন, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য ব্যয় কমানোর সুযোগও সীমিত।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডিমের উৎপাদন খরচের সবচেয়ে বড় অংশ ফিড হলেও খামারিরা ফিডের বাজারে বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ রাখেন না, এমনকি ডিমের দাম নির্ধারনের নিয়ন্ত্রণও এসব প্রান্তিক খামারিদের হাতে নেই। প্রেজেন্টেশনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাদা ডিমের ক্ষেত্রে ১০ টাকা ১৬ পয়সা এবং বাদামি ডিমের ক্ষেত্রে ১০ টাকা ৮৪ পয়সা পর্যন্ত উৎপাদন ব্যয় দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে খামার পর্যায়ে ১১ টাকার নিচে ডিম বিক্রি হলে লোকসান অনিবার্য।
ডিমের দাম ও উৎপাদন ব্যয়ের এই সংকটের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থার আরেকটি বৈপরীত্যও উঠে এসেছে প্রেজেন্টেশনে। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে খামার পর্যায়ে ডিমের দাম প্রায় ১৮ শতাংশ কমেছে, কিন্তু খামার ও খুচরা বাজারের দামের ব্যবধান ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ খামারিরা কম দামে ডিম বিক্রি করলেও সেই সুবিধা সমানভাবে ভোক্তার কাছে পৌঁছায়নি; সরবরাহ শৃঙ্খলের মধ্যবর্তী অংশে (মধ্যস্বত্বভোগী) দামের একটি বড় ব্যবধান থেকে গেছে।
ডিম শিল্পের সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানেই সামনে আসে—খামারি কম দামে বিক্রি করছেন, অথচ ভোক্তাও সেই অনুপাতে কম দামে ডিম পাচ্ছেন না; তাহলে মূল্য ব্যবস্থার মাঝখানে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত ব্যবধানটি যাচ্ছে কোথায়?
বাংলাদেশে ডিমের উৎপাদন অবশ্য থেমে নেই। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ২৫.০৯ বিলিয়ন ডিম উৎপাদনের তথ্য দেখানো হয়েছে। মাথাপিছু প্রাপ্যতা প্রায় ১৩৭ দশমিক ২টি ডিম। একই সঙ্গে ডিএলএসের হিসাবে চাহিদা ধরা হয়েছে ১০৪টি ডিম মাথাপিছু হিসেবে এবং উৎপাদনে ৩০-৩২ শতাংশ উদ্বৃত্তের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সংখ্যার বিচারে এটি বাংলাদেশের পোল্ট্রি ও ডিম শিল্পের বড় সাফল্য। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেই খামারির আয় বাড়ে না—বর্তমান পরিস্থিতি সেই কঠিন বাস্তবতাই সামনে এনেছে। বাজারে সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয় এবং ন্যায্য মূল্য—এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে উৎপাদন বাড়লেও খামারির অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
ডিম শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাতীয় পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা। প্রেজেন্টেশনে ডিমকে পুষ্টি, সাশ্রয়ী খাদ্য, জাতীয় অর্থনীতি ও লাখো মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ২০২৪ সালে ডিমের উৎপাদন প্রায় ১০ কোটি টনে পৌঁছেছে এবং এর বড় অংশই এশিয়ায় উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশও বৈশ্বিক ডিম উৎপাদনকারী দেশগুলোর তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উৎপাদন বাড়ানো নয়; বরং উৎপাদনকারীকে টিকিয়ে রাখা। কারণ খামারি যদি ধারাবাহিক লোকসানের কারণে খামার বন্ধ করে দেন, তাহলে ভবিষ্যতে উৎপাদন কমে যেতে পারে, বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে এবং শেষ পর্যন্ত এর চাপ ভোক্তার ওপরই পড়বে ।
ডিম শিল্পের সামনে শুধু মূল্য সংকটই নেই। প্রেজেন্টেশনে আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও উচ্চ সুদের হার, রোগ ও বায়োসিকিউরিটির দুর্বলতা, তাপমাত্রাজনিত চাপ ও জলবায়ু ঝুঁকি, উচ্চ ইনপুট ও ফিড ব্যয় এবং মূল্য বিকৃতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব—এই পাঁচটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে সংকটের মধ্যেও সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিদিনের স্পট মার্কেটে কাঁচা ডিম বিক্রির ওপর নির্ভরতা কমাতে তরল ডিম, ডিমের গুঁড়া, মানভিত্তিক ও ব্র্যান্ডেড ডিম, প্রাতিষ্ঠানিক সরবরাহ এবং ভবিষ্যতে রপ্তানির মতো মূল্য সংযোজনমূলক বাজার তৈরি করা যেতে পারে। এসব উদ্যোগ খামারিকে শুধু দৈনিক বাজারদরের ওপর নির্ভরশীল না রেখে তুলনামূলক স্থিতিশীল ও উচ্চমূল্যের বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।
বিশ্ব ডিম দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ছিল“Protein that Powers and Protects”। পুষ্টি, রোগ প্রতিরোধ, শিশুদের বিকাশ এবং খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ডিমের গুরুত্ব নিয়ে বিশ্বজুড়ে যখন সচেতনতা বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে, তখন বাংলাদেশে সেই ডিম উৎপাদনকারী খামারির দীর্ঘমেয়াদি লোকসানের বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
কারণ, ডিমের পুষ্টিগুণ নিয়ে যত কথা বলা হোক, ডিমের উৎপাদনকারী মানুষটি যদি টিকে থাকতে না পারেন, তাহলে আগামী দিনের ডিমের সরবরাহ নিশ্চিত করাই কঠিন হয়ে পড়বে।
তাই প্রশ্ন এখন শুধু—ডিমের দাম কত? -এটি নয়।
প্রশ্ন হওয়া উচিত—যে খামারি ডিম উৎপাদন করছেন, তিনি কতদিন লোকসান সহ্য করে উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারবেন?
টানা ১৯ মাসের লোকসান সেই প্রশ্নেরই কঠিন উত্তর খুঁজতে বাধ্য করছে। ডিমকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে হলে যেমন ভোক্তার স্বার্থ দেখতে হবে, তেমনি ডিম উৎপাদনকারী খামারির ন্যায্য উৎপাদন ব্যয় ও টেকসই মুনাফাও নিশ্চিত করতে হবে। নইলে আজকের সস্তা ডিমের বাজারই আগামী দিনের উৎপাদন সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।



