
মো. এমদাদুল হক (রাজশাহী): বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ জমিতে যে ফসল উৎপাদন হয় সেটি ধান। আর ধান থেকে যে চাল হয়, সে চাল বিশ্বের মানুষের কাছে সবচেয়ে পুষ্টিসমৃদ্ধ ও প্রিয় খাবার। ভাত ছাড়া বাঙালির তো চলেই না। ভাত খাওয়ার মাধ্যমে আমাদের শরীরের অধিকাংশ পুষ্টি চাহিদা পূরণ হয়। বাংলার মানুষ ভাত ছাড়া অন্য বিকল্প খাবারের কথা ভাবতেই পারে না।
আমাদের দেশের চাষিরা জমির অবস্থা ও পরিবেশগত পরিস্থিতির কারণে অনেক জমিতে ধান চাষের বিকল্প কোনো ফসলের কথাও ভাবতে পারে না। চাষির এই দুর্বলতার সুযোগে নীতিনির্ধারকদের কারণে ধানের বাজার ব্যবস্থাপনা বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে।
চাষি পর্যায়ে ধানের ফলন প্রতি বিঘায় প্রায় ১৮ মণ (কিছু কম-বেশি)। অন্যদিকে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) উদ্ভাবিত ধান চাষে তাদের ফলন প্রতি বিঘায় ২৭ মণের বেশি। চাষির ১ বিঘা জমির ১৮ মণ ধানের বর্তমান বাজারে প্রতি মণের দাম ১১০০ টাকা হয়। এ হিসাবে ১৮ মণ ধানের দাম হয় ১৯,৮০০ টাকা। খড়ের দাম ৪,০০০ টাকা। মোট = ২৩,৮০০ টাকা।
সরকার নির্ধারিত ধানের মূল্য প্রতি কেজি ৩৬ টাকা অনুযায়ী ১ মণ ধানের দাম ১,৪৪০ টাকা। ১৮ মণ ধানের দাম ২৫,৯২০ টাকা, কিন্তু বর্তমান বাজারে এ দাম পাওয়া যায় না (চাষিরা পায়না)।
ধান চাষির এক বিঘা জমিতে উৎপাদন খরচ:
• বীজের দাম: ৫০০ টাকা
• জমি চাষ ও মই: ২,৫০০ টাকা
• চারা রোপণ: ১,৫০০ টাকা
• রাসায়নিক সার: ৩,৫০০ টাকা
• আগাছা দমন: ১,০০০ টাকা
• পানি সেচ: ২,০০০ টাকা
• ধান কাটা: ২,০০০ টাকা
• কাটা ধান পরিবহন: ৩,০০০ টাকা
• ধান মাড়াই: ২,০০০ টাকা
• কীটনাশক: ৫০০ টাকা
• বালাইনাশক: ৫০০ টাকা
মোট উৎপাদন খরচ: ১৯,০০০ টাকা
বাজার মূল্য ১১০০ টাকা মন হলে, ১ বিঘা জমির ১৮ মণ ধান ও খড়ের দাম ২৩,৮০০ টাকা। এ অনুযায়ী কৃষকের লাভ ৪,৮০০ টাকা। নিজস্ব জমি থাকলে তিনি এ লাভ করতে পারেন। কিন্তু যারা বর্গা, কন্ট্রাক্ট বা লিজ জমিতে ধান চাষ করেন, তাদের হিসাব করা খুবই কঠিন। আবার কেউ যদি মনে করে বর্ণনাকৃত টাকা খরচ করে ১ বিঘা জমির আবাদ সম্পূর্ণ করবে, তাহলে তা সম্ভব নয়। ধান আবাদে চাষিকে অনেকবার জমিতে যেতে হয়, কাজ করতে হয় সে সকল শ্রম বিনামূল্যে ধরা হয় ।
আর প্রকৃতি যখন স্বাভাবিক থাকে, তখন কৃষকও স্বাভাবিকভাবে ফসল ঘরে তুলতে পারে। কিন্তু প্রকৃতির চরম বৈরিতা খরা, অতিবৃষ্টি, বন্যার শিকার হলে কৃষকের জীবনকে করে তোলে অত্যন্ত কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে তাদের হিসাব-নিকাশও হয়ে পড়ে আরও কঠিন ও অনিশ্চিত। এলাকাভেদে শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য ভিন্ন কারণে মোট খরচে পরিবর্তন আসতে পারে, ফলে লাভ-লোকসানেরও পরিবর্তন হবে।
এবার আসি আমরা যারা অন্য পেশায় জড়িত, সুশীলজন বা শহরের সাহেব বাবু। আমরা বাজারে চাল কিনতে গেলেই বলি চালের দাম অনেক বেশি, প্রধান খাদ্যের এমন দাম হওয়া কাম্য নয়। এছাড়াও মিডিয়ার টকশো ও বিভিন্ন বিশ্লেষণ শুনে এক শ্রেণির মানুষ আনন্দিত হয়, কিন্তু প্রধান খাদ্য উৎপাদনকারীরা অসহায়ের মতো উৎপাদন করে যাচ্ছে।
অসহায় চাষিরা মনে করছে আমাদের পেশা এমনই, আমাদের অবস্থার উন্নতি হবে না। তাই তারা চায় তাদের সন্তানরা যেন কৃষি পেশায় না আসে। কৃষকের সন্তানরা কেউ হচ্ছে উচ্চশিক্ষিত, কেউ অর্ধশিক্ষিত, আবার অনেকেই দারিদ্র্যের কারণে অশিক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
এই কৃষক অভিভাবকরা চান তাদের সন্তানরা কৃষক না হয়ে শহরের বাবু সাহেব হোক। উচ্চশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিতরা অন্য পেশায় যাচ্ছে। অশিক্ষিতদের অনেকেই শহরে গিয়ে অটোরিকশা চালক বা কারখানার শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। এভাবে তারা শহরের আধা-বাবু, আধা-সাহেব হয়ে উঠছে, কিন্তু আর কৃষিতে ফিরতে চায় না।
এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকলে আমাদের জন্য এটি বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হবে। যদি এমন সময় আসে, যখন বাজারে চাল পাওয়া যাবে না, তখন কী হবে? আমরা কি ভেবে দেখেছি, যদি সম্পূর্ণভাবে বিদেশ থেকে চাল আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে কী পরিস্থিতি তৈরি হবে।
আমরা ধরে নিয়েছি কেউ না কেউ ধান উৎপাদন করবেই। কিন্তু বাস্তবে উৎপাদনকারীর সংখ্যা কমছে, শ্রমিক সংকট বাড়ছে এবং মানুষ কৃষি পেশা ছেড়ে দিচ্ছে।
ভাত ছাড়া বাঙালির চলেই না। তাহলে যদি বাজারে ভাতের চাল না থাকে, বা সম্পূর্ণভাবে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয় তখন আমাদের ও বাবু সাহেবের কী হবে।
এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ কৃষকের সংখ্যা কমে গেলে এবং কৃষি পেশায় আগ্রহ কমে গেলে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হবে। তখন আমাদের বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে, যা অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
অতএব, কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং কৃষি পেশাকে লাভজনক ও সম্মানজনক করে তোলা অত্যন্ত জরুরি। নইলে এমন এক সময় আসতে পারে, যখন ভাত ছাড়া বাঙালির জীবন অচল হয়ে পড়বে, অথচ সেই ভাতের চালই আমাদের নাগালের বাইরে চলে যাবে। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। তাই কৃষকের ন্যায্য অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।
ভেবে দেখার দরকার, বাজারে যদি চালের সরবরাহ কমে যায় বা একেবারেই না থাকে, তবে অন্য পেশায় নিয়োজিত সুশীলজন কিংবা শহরের সাহেব, বাবু, আধা-বাবু, আধা-সাহেবদের ও আমাদের কী হবে?



