
ড. মো. শরীফুল ইসলাম : বাংলার নদী বয়ে চলে—ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে গল্প, ইতিহাস আর জীবনের সুর। সেই সুরের গভীরে লুকিয়ে থাকে এক অমূল্য সম্পদ—ইলিশ। পান্তা-ইলিশ হোক কিংবা উৎসবের আয়োজন, ইলিশ যেন বাঙালির অস্তিত্বেরই অংশ। কিন্তু এই গর্বের প্রতীক আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। তাই সময় এসেছে নতুন করে জেগে ওঠার, দায়িত্ব নেওয়ার—জাটকা বাঁচানোর, ইলিশ বাড়ানোর। এবারের জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে জাটকা ধরা থামাই যদি, ইলিশে ভরবে সাগর-নদী। ৭ এপ্রিল থেকে আগামী ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে “জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ ২০২৬” পালন করা হচ্ছে। “জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ ২০২৬” তাই কেবল একটি কর্মসূচি নয়; এটি একযোগে সচেতনতা, আবেগ এবং জাতীয় অঙ্গীকারের নাম।
জাটকা—ছোট্ট একটি মাছ, কিন্তু তার ভেতরেই লুকিয়ে আছে বিশাল সম্ভাবনা। ২৩ সেন্টিমিটার বা তার কম দৈর্ঘ্যের এই ইলিশ পোনাগুলো যদি আজ ধরা না পড়ে, তাহলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তা পূর্ণবয়স্ক ইলিশে পরিণত হয়। একটি জাটকা শুধু একটি মাছ নয়, এটি ভবিষ্যতের অসংখ্য ইলিশের উৎস। গবেষণা বলছে, একটি জাটকা রক্ষা করা মানে ভবিষ্যতে বহু ইলিশ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করা। অর্থাৎ, আজ আমরা যদি ধৈর্য ধরি, আগামীকাল নদী আমাদের ফিরিয়ে দেবে তার বহুগুণ।
বাংলাদেশ আজ বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনে শীর্ষস্থানে। বিশ্বে উৎপাদিত মোট ইলিশের ৭৫ শতাংশের অধিক আসে এই দেশের নদী থেকে। বছরে প্রায় ৫.৫ থেকে ৬ লাখ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদিত হয়, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। প্রায় পাঁচ লাখ জেলে পরিবার সরাসরি এই ইলিশের ওপর নির্ভরশীল। শুধু তাই নয়, জাতীয় মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে এবং জিডিপিতে এর অবদান প্রায় ১ শতাংশ। অথচ একসময় এই উৎপাদন নেমে গিয়েছিল মাত্র দুই লাখ টনের কাছাকাছি। সঠিক পরিকল্পনা, বিশেষ করে জাটকা সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করার ফলেই আজ আমরা আবার আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। এই সাফল্য আমাদের শিখিয়েছে—জাটকা বাঁচানো মানেই ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা।
সরকার ইতোমধ্যে ইলিশ সংরক্ষণে একাধিক কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে জাটকা ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদী এলাকায় অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে মাছ ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়। নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের জন্য খাদ্য সহায়তা এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। “জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ ২০২৬” উপলক্ষে দেশজুড়ে চলছে ব্যাপক প্রচারণা—নদীপাড়ে সচেতনতা কার্যক্রম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা, গণমাধ্যমে প্রচার। উদ্দেশ্য একটাই—মানুষকে বোঝানো, ছোট মাছ ছেড়ে দিলে বড় লাভ ফিরে আসে।
তবে বাস্তবতার চিত্র সবসময় এত সরল নয়। দারিদ্র্য, বিকল্প আয়ের অভাব এবং সচেতনতার ঘাটতির কারণে অনেক সময় জেলেরা নিষেধাজ্ঞা মানতে পারেন না। কিছু অসাধু চক্র গোপনে জাটকা ক্রয়-বিক্রয় চালিয়ে যায়। নদীর দূষণ, নাব্যতা হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইলিশের প্রজনন ব্যবস্থাকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে শুধু আইন করলেই হবে না; প্রয়োজন মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন, সম্মিলিত দায়িত্ববোধ।
এই জায়গাতেই আসে আমাদের ভূমিকা। আমরা যারা ভোক্তা, আমাদের সিদ্ধান্তই বাজারকে প্রভাবিত করে। আমরা যদি জাটকা না কিনি, তাহলে জাটকার বাজার নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে। পরিবারে, সমাজে, শিশুদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে—ছোট মাছ ধরলে ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জেলেদের জন্য টেকসই বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করাও জরুরি, যাতে তারা নিষেধাজ্ঞার সময় জীবিকার সংকটে না পড়ে।
ইলিশ শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, এটি পরিবেশেরও সূচক। একটি সুস্থ নদীই পারে ইলিশকে টিকিয়ে রাখতে। নদী যদি বাঁচে, ইলিশও বাঁচবে; আর ইলিশ বাঁচলে দেশের মানুষের জীবন-জীবিকাও সুরক্ষিত থাকবে। তাই জাটকা সংরক্ষণ মানে কেবল একটি মাছ রক্ষা নয়—এটি নদী, প্রকৃতি এবং মানুষের সম্মিলিত অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ ২০২৬ আমাদের সামনে সেই বার্তাই নতুন করে তুলে ধরে। ছোট্ট একটি সিদ্ধান্ত, ছোট্ট একটি সচেতনতা—কিন্তু তার প্রভাব হতে পারে বিশাল। আজ যদি আমরা জাটকাকে বাঁচতে দিই, তাহলে আগামীকাল আমাদের নদী ভরে উঠবে রুপালি ইলিশে।
চলুন, আমরা সবাই একসাথে বলি—জাটকা বাঁচাও, ইলিশ বাড়াও; নদী বাঁচাও, দেশ গড়াও। কারণ, আজকের এই ছোট্ট জাটকাই একদিন হয়ে উঠবে বাংলাদেশের সোনালি স্বপ্ন।
লেখক: সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিষ্ট (ফিশারিজ), সার্ক কৃষি কেন্দ্র, ফার্মগেট, ঢাকা, বাংলাদেশ।
ইমেইল: bausharif@gmail.com



