
অঞ্জন মজুমদার : জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি সত্যিই নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির পথে এগোচ্ছি, নাকি শুধু প্রতি বছর দিবস পালনেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছি? বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার আলোচনায় লাইভস্টক খাতকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। ডিম, দুধ, মাংস—এই প্রাণিজ আমিষই গুলোই প্রতিদিন দেশের কোটি মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করছে। ফলে লাইভস্টক খাতের দুর্বলতা মানেই সরাসরি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় ওয়ান হেলথ এপ্রোচ আজ আর তাত্ত্বিক ধারণা নয় বরং সময়ের অপরিহার্য কৌশল।মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশ—এই তিনটির স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। খামারে অস্বাস্থ্যকর উৎপাদন ব্যবস্থা, অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার কিংবা পরিবেশ দূষণ—সবশেষে এর প্রভাব গিয়ে পড়ে মানুষের খাদ্য ও স্বাস্থ্যে।নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে তাই খণ্ডিত নয়, নীতিগত ও বাস্তবায়নে সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।
বাংলাদেশের লাইভস্টক খাত উৎপাদনে অগ্রগতি অর্জন করলেও নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণে এখনও ঘাটতি রয়ে গেছে। খামার পর্যায়ে বায়োসিকিউরিটির দুর্বলতা, খামারে ফিড ও ঔষধ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার ভোক্তা স্বার্থকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ওয়ান হেলথ কাঠামোর আলোকে এসব সমস্যা কেবল প্রাণিস্বাস্থ্যের নয় বরং জনস্বাস্থ্য সংকটের অংশ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত।
ভোক্তার নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির দৃষ্টিতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—নিরাপদ খাদ্যের আলোচনায় খামারিকে প্রায়ই অপরাধীর কাতারে দাঁড় করানো হয় অথচ ব্যবস্থাগত দুর্বলতা আড়ালে থেকে যায়। প্রশিক্ষণ, মানসম্মত ইনপুট ও ন্যায্য বাজারব্যবস্থা ছাড়া খামারির পক্ষে নিরাপদ উৎপাদনের চাপ বহন করা সম্ভব নয়। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও বিপননে শাস্তিমুখী নিয়ন্ত্রণ নয় বরং সহায়ক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিই হতে পারে নিরাপদ খাদ্যের টেকসই পথ।
ওয়ান হেলথ এপ্রোচ বাস্তবায়নে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়ন্ত্রণ এখন অগ্রাধিকার হওয়া জরুরি। প্রাণিখাতে অযৌক্তিক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার শুধু খামারের সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি আগাম বার্তা । নিরাপদ খাদ্য দিবসের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—প্রেস্ক্রিপশনভিত্তিক ওষুধ ব্যবহার, বিকল্প পুষ্টি কৌশল (বায়ো টেকনোলজিস প্রয়োগ) ও শক্তিশালী নজরদারি।
পরিবেশগত দিকটি উপেক্ষা করলেও ওয়ান হেলথ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাশয় দূষণ ও মাটি ক্ষয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্য শৃঙ্খলেই ফিরে আসে। লাইভস্টক বর্জ্যকে জৈবসার ও জ্বালানিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নিরাপদ খাদ্য ও পরিবেশ সুরক্ষার যৌথ সমাধান দিতে পারে যা সার্কুলার ও গ্রীন ইকোনমির উদ্যোগকে সমর্থণ করে।
জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস কেবল প্রতীকী পালন নয়— এই দিবসের আবেদন হওয়া উচিত আত্মসমালোচনার উপলক্ষ। ওয়ান হেলথ এপ্রোচকে বাস্তব নীতিতে রূপান্তর করতে না পারলে লাইভস্টক খাতের অগ্রগতি টেকসই হবে না আর ভোক্তার নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে না। নিরাপদ খাদ্য মানেই নিরাপদ মানুষ ও বাসযোগ্য পরিবেশ—এই উপলব্ধিই হোক আজকের জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবসের মূল বার্তা।
লেখক: পোল্ট্রি প্রোডাকশন এন্ড সাপ্লাই চেইন স্পেশালিষ্ট।



