
অঞ্জন মজুমদার: ডিজিটাল যুগে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের রূপান্তর আর কেবল সম্ভাবনার কথা নয়—এটি এখন টেকসই উন্নয়নের একটি অপরিহার্য শর্ত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রান্তিক পোল্ট্রি ও ক্ষুদ্র খামারিদের উৎপাদন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে “ডিজিটাল ডাটাবেজ, রিয়েল-টাইম মনিটরিং এবং স্মার্ট কার্ড” ভিত্তিক একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলা অত্যন্ত সময়োপযোগী, এই উদ্যোগ শুধু উৎপাদন বাড়াবে না বরং স্বচ্ছতা,জবাবদিহিতা, প্রকৃত উৎপাদন ও বাজার সংযোগও নিশ্চিত করবে।
পোল্ট্রি শিল্পের একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে দেশের প্রতিটি প্রান্তিক খামারির তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। খামারির নাম, অবস্থান, খামারের ধরন, উৎপাদন ক্ষমতা, রিয়েল টাইমে প্রকৃত উৎপাদন, জনবলের সংখ্যা,রোগবালাইয়ের ইতিহাস, টিকাদান রেকর্ড, এমনকি আর্থিক লেনদেন পর্যন্ত এই ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে; এর ফলে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সহজেই খামারিদের অবস্থা বিশ্লেষণ করতে পারবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সহায়তা দিতে পারবে। একইসঙ্গে, এই ডাটাবেজ নীতিনির্ধারণে একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা প্রবর্তন করলে খামার ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারে। মোবাইল অ্যাপ, সেন্সর প্রযুক্তি বা সহজ ডিজিটাল রিপোর্টিং সিস্টেমের মাধ্যমে খামারিরা প্রতিদিনের উৎপাদন, খাদ্য ব্যবহারের পরিমাণ, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা, এবং পাখির স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য আপডেট করতে পারবে, যার প্রভাবে রোগের প্রাদুর্ভাব আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে এবং দ্রুত প্রতিকার নেওয়া যাবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-সংবেদনশীল দেশে এই ধরনের মনিটরিং ব্যবস্থা খামারিদের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রান্তিক খামারিদের জন্য স্মার্ট কার্ড চালু করা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে; এই স্মার্ট কার্ড হবে একটি ডিজিটাল পরিচয়পত্র, যা খামারির সকল তথ্যের সাথে সংযুক্ত থাকবে- এর মাধ্যমে খামারিরা সহজেই সরকারি ভর্তুকি, ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং চিকিৎসা সেবা পেতে পারবে।একইসঙ্গে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো খামারির তথ্য যাচাই করে দ্রুত ঋণ প্রদান করতে পারবে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করবে।
এই তিনটি উপাদান—ডাটাবেজ, মনিটরিং এবং স্মার্ট কার্ড—একত্রে একটি সমন্বিত ইকোসিস্টেম তৈরি করতে পারে; উদাহরণস্বরূপ, কোনো খামারে রোগের লক্ষণ দেখা দিলে রিয়েল-টাইম মনিটরিং সিস্টেম তা শনাক্ত করে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে আপডেট করবে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট খামারির স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে তাকে সতর্কবার্তা ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা যাবে। ফলে প্রতিক্রিয়া সময় কমবে এবং ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস পাবে।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব, ইন্টারনেট সংযোগের সীমাবদ্ধতা এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ঘাটতি বড় বাধা হতে পারে। এজন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, সহজ ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব। স্থানীয় পর্যায়ে সহায়ক কর্মী বা “ডিজিটাল এক্সটেনশন ওয়ার্কার” নিয়োগ করা যেতে পারে, যারা খামারিদের হাতে-কলমে সহায়তা প্রদান করবে।
প্রান্তিক খামারিদের ক্ষমতায়নে ডিজিটাল ডাটাবেজ, রিয়েল-টাইম মনিটরিং এবং স্মার্ট কার্ড একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে। এটি শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি করবে না বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রাণিসম্পদ খাত গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। সঠিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই খাতে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে সক্ষম হবে।
লেখক : সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশন (BPIA) এবং পোল্ট্রি প্রোডাকশন এন্ড সাপ্লাই চেইন স্পেশালিষ্ট



