
কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার : বাংলাদেশে উন্নয়ন, নগরায়ন ও ভোক্তা অর্থনীতির প্রসারের সাথে সাথে সবচেয়ে দ্রুত যে সংকটটি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে তা হলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
প্রতিদিন শহর-গ্রাম মিলিয়ে বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্য, খাদ্য বর্জ্য, প্লাস্টিক, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। এগুলোর একটি বড় অংশ উন্মুক্ত স্থানে ফেলা হচ্ছে, খালে-বিলে জমছে বা পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। ফলে মাটি, পানি ও বায়ু দূষণ বাড়ছে, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে এবং জলাবদ্ধতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও তীব্র হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে শুধু পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন নির্ভর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আর কার্যকর নয়। প্রয়োজন সমবায়ভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং তার সঙ্গে সংযুক্ত সার্কুলার ইকোনমি বা চক্রাকার অর্থনীতি যার মাধ্যমে হবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।
সমবায় ধারণাটি বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। কৃষি, দুগ্ধ, সঞ্চয়-ঋণ—এসব ক্ষেত্রে সমবায় বহুদিন ধরে গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে আছে। কিন্তু বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমবায়ের ব্যবহার এখনও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠেনি অথচ বর্জ্য এমন একটি সম্পদ যা ব্যক্তি একা ব্যবস্থাপনা করতে পারে না, আবার শুধু সরকারও দক্ষভাবে সামলাতে পারে না।
এখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পরিবার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও সংগঠিত শ্রমের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তাই বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার ও পুনরুৎপাদন—এই পুরো চক্রকে যদি একটি নিবন্ধিত সমবায় সংগঠন পরিচালনা করে, তাহলে এটি একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা ও কর্মসংস্থান—দুই লক্ষ্যই পূরণ করতে পারে।
বাংলাদেশে বর্তমানে বড় সমস্যা হচ্ছে মিশ্র বর্জ্য। বাসাবাড়ির খাদ্য বর্জ্য, প্লাস্টিক, কাচ, কাগজ, চিকিৎসা বর্জ্য—সব একসাথে ফেলা হয়। ফলে বর্জ্য আর সম্পদ থাকে না বরং দূষণের উৎসে পরিণত হয়। সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি পাড়া বা গ্রামে “ওয়ার্ড বর্জ্য সমবায়” গঠন করা যেতে পারে। সদস্য হবে সেই এলাকার পরিবারগুলো। তারা মাসিক সামান্য ফি দেবে আর সমবায় তাদের ঘর থেকে আলাদা আলাদা বর্জ্য সংগ্রহ করবে—জৈব, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য আলাদাভাবে এতে পৌরসভার ওপর চাপ কমবে এবং বর্জ্য উৎসেই নিয়ন্ত্রিত হবে।
এখানেই আসে সার্কুলার ইকোনমি ধারণা। প্রচলিত অর্থনীতি হলো “নাও-ব্যবহার করো-ফেলে দাও” (Take-Make-Dispose) কিন্তু সার্কুলার ইকোনমি বলে—বর্জ্য বলে কিছু নেই; প্রতিটি উপাদান নতুন উৎপাদনের কাঁচামাল অর্থাৎ খাদ্য বর্জ্য কম্পোস্ট বা বায়োগ্যাসে যাবে, প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাত হবে, কাগজ পুনর্ব্যবহার হবে, এবং কৃষি-প্রাণিসম্পদ বর্জ্য সার ও জ্বালানিতে রূপান্তরিত হবে। এতে একই সম্পদ বহুবার ব্যবহৃত হবে এবং প্রকৃতির ওপর চাপ কমবে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ বাস্তবতায় সার্কুলার ইকোনমির সবচেয়ে বড় সুযোগ রয়েছে জৈব বর্জ্যে। রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট, গবাদিপশুর গোবর, পোল্ট্রির লিটার, বাজারের পচা সবজি, জলাশয়ে আগাছা,কচুরিপানা —এসব দিয়ে সমবায়ভিত্তিক কম্পোস্ট ও বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন করা যায়। উৎপাদিত জৈবসার স্থানীয় কৃষকের কাছে বিক্রি হবে, গ্যাস রান্না বা ক্ষুদ্র শিল্পে ব্যবহার হবে। এতে রাসায়নিক সারের নির্ভরতা কমবে এবং কৃষি-পরিবেশ সুস্থ থাকবে। একই সঙ্গে সমবায়ের সদস্যরা লাভের অংশ পাবে—অর্থাৎ বর্জ্য থেকে আয় সৃষ্টি হবে।
শহরাঞ্চলেও সমবায়ভিত্তিক পুনর্ব্যবহার শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন, কাগজ, ক্যান—এসব এখনো অনানুষ্ঠানিকভাবে কুড়ানো শ্রমিকরা সংগ্রহ করে। তাদেরকে সংগঠিত করে “রিসাইক্লিং সমবায়” গঠন করা হলে তারা সামাজিক সুরক্ষা, ন্যায্য দাম ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ পাবে। একই সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার শিল্পভিত্তি তৈরি হবে, যা দেশের আমদানি নির্ভর কাঁচামাল কমাতে সাহায্য করবে।
সমবায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় সরকার ও নাগরিক অংশীদারিত্ব। পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ ভূমি, প্রশিক্ষণ ও প্রাথমিক অবকাঠামো দেবে; সমবায় পরিচালনা করবে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ; বেসরকারি উদ্যোক্তা বাজার সংযোগ তৈরি করবে। এই ত্রিপক্ষীয় মডেল টেকসই হবে কারণ এখানে দায়িত্ব ও লাভ—দুইই ভাগাভাগি হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এ ব্যবস্থা আরও গুরুত্বপূর্ণ। উন্মুক্ত ডাম্পিং থেকে মিথেন গ্যাস নির্গত হয়, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে বহু গুণ ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস কিন্তু একই বর্জ্য যদি বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপ নেয়। অর্থাৎ সমবায়ভিত্তিক সার্কুলার অর্থনীতি একদিকে পরিবেশ দূষণ কমাবে, অন্যদিকে জলবায়ু অভিযোজনেও ভূমিকা রাখবে।
সামাজিক দিক থেকেও এর গুরুত্ব অনেক। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে নারী ও যুবকদের অংশগ্রহণ বাড়ানো যায়। গৃহভিত্তিক কম্পোস্টিং, জৈবসার উৎপাদন, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য তৈরির মাধ্যমে গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, ফলে শহরমুখী অভিবাসন কমবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপ কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয় বরং সম্পদের দক্ষ ব্যবহার।
বর্জ্যকে সমস্যা হিসেবে না দেখে সম্পদ হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো সমবায়ভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সার্কুলার ইকোনমির নীতি প্রয়োগ। এতে পরিবেশ রক্ষা, অর্থনৈতিক লাভ, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি—সবগুলো লক্ষ্য একসাথে অর্জিত হতে পারে।
বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে স্থানীয় জনগণের হাতে, সমবায়ের কাঠামোর মধ্যে এবং সার্কুলার অর্থনীতির দর্শনে পরিচালিত করতে হবে তখনই “বর্জ্য”আর বোঝা থাকবে না—তা হয়ে উঠবে নতুন সম্পদ, নতুন কর্মসংস্থান এবং সবুজ ভবিষ্যতের ভিত্তি।
লেখক: পোল্ট্রি প্রোডাকশন এন্ড সাপ্লাই চেইন স্পেশালিষ্ট।



