
ডা: এ.এস.এম. রেজোয়ান : আমাদের অনেকেই ঘরে কুকুর, বিড়াল, খরগোশ কিংবা পাখির মতো পোষা প্রাণী পালন করে থাকি। এদের আমরা শুধুই প্রাণী হিসেবে দেখি না; বরং পরিবারের একজন সদস্যের মতোই ভালোবাসি। কিন্তু এই ভালোবাসার পাশাপাশি তাদের সঠিক যত্ন নেওয়াটাও আমাদের দায়িত্ব। পোষা প্রাণীর সুস্থতা নিশ্চিত করতে সবচেয়ে কার্যকর যে বিষয়টি রয়েছে, তা হলো ভ্যাকসিন।
ভ্যাকসিন হলো একটি প্রতিরোধমূলক টিকা, যা প্রাণীর শরীরে এমন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করে, যাতে তারা ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট কিছু রোগে আক্রান্ত না হয়। যেমন—কুকুরের র্যাবিস (জলাতঙ্ক), বিড়ালের ভাইরাসজনিত জ্বরসহ অন্যান্য মারাত্মক রোগ। এসব রোগ থেকে প্রাণীকে রক্ষা করতে ভ্যাকসিন অত্যন্ত কার্যকর।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কিছু রোগ প্রাণী থেকে মানুষের শরীরেও সংক্রমিত হতে পারে। জলাতঙ্ক তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তাই শুধু প্রাণীর সুরক্ষাই নয়, আমাদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্যও ভ্যাকসিন প্রয়োজন। একটি সুস্থ পোষা প্রাণী যেমন আমাদের আনন্দ দেয়, তেমনি অসুস্থ প্রাণী আমাদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, নিয়মিত ভ্যাকসিন দেওয়া থাকলে প্রাণী কম অসুস্থ হয়, ফলে চিকিৎসার খরচও কমে যায়। আগে থেকেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকলে অনেক সময় বড় রোগ হওয়ার আগেই তা প্রতিহত করা সম্ভব হয়। এতে প্রাণীর জীবনও নিরাপদ থাকে।
তবে ভ্যাকসিন দেওয়ার আগে একজন অভিজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রতিটি প্রাণীর জন্য নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী ভ্যাকসিন দেওয়া উচিত। সাধারণত জন্মের কিছু সপ্তাহ পর থেকে ভ্যাকসিন শুরু করা হয় এবং পরবর্তীতে নির্দিষ্ট সময় পরপর বুস্টার ডোজ দিতে হয়।
ফেলাইন প্যানলিউকোপেনিয়া (FPV) ও ক্যানাইন পারভোভাইরাস (CPV)
Feline Panleukopenia (FPV) এবং Canine Parvovirus (CPV-2) অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাল রোগ, যা যথাক্রমে বিড়াল ও কুকুরকে আক্রান্ত করে।
ফেলাইন প্যানলিউকোপেনিয়া (FPV) এর লক্ষণসমূহ:
অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত বিড়ালের মধ্যে দৃশ্যমান কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তবে বিশেষ করে ১ বছরের কম বয়সী বিড়ালের ক্ষেত্রে নিচের লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারে—
- ডায়রিয়া
- বমি
- জ্বর
- অবসাদ বা অলসতা
- ক্ষুধামন্দা
- পানিশূন্যতা (চোখ বসে যাওয়া বা মাড়ি শুকিয়ে যাওয়া)
- পেটে ব্যথা
আক্রান্ত বিড়াল, বিশেষ করে বাচ্চা বিড়াল, হঠাৎ করে মারা যেতে পারে।
যদি আপনার বিড়ালের মধ্যে এসব লক্ষণ দেখা যায়, তবে দ্রুত ভেটেরিনারিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করুন এবং সংক্রমণ ছড়ানো রোধে তাকে অন্য বিড়াল থেকে আলাদা রাখুন।
FPV রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়, ফলে বিড়াল সহজেই অন্যান্য সংক্রমণে আক্রান্ত হতে পারে। যেসব বিড়াল এই রোগ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠে, তাদের অসুস্থতা সাধারণত এক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয় না। ৫ মাসের কম বয়সী বাচ্চা বিড়ালের মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
ক্যানাইন পারভোভাইরাস (CPV-2) এর লক্ষণসমূহ:
- তীব্র দুর্বলতা ও ক্লান্তি (lethargy)
- খাবারের প্রতি অনীহা
- পেটে ব্যথা ও ফেঁপে যাওয়া
- জ্বর বা শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া (Hypothermia)
- বারবার বমি
- তীব্র ডায়রিয়া (অনেক সময় রক্তমিশ্রিত)
এই রোগে অনেক ক্ষেত্রে লক্ষণ প্রকাশের ৪৮–৭২ ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যু ঘটতে পারে, যদি দ্রুত চিকিৎসা না দেওয়া হয়।
জটিলতা ও ঝুঁকি
- বমি ও ডায়রিয়ার কারণে দ্রুত পানিশূন্যতা (Severe dehydration)
- অন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া এবং সেপ্টিক শক
- শ্বেত রক্তকণিকা (white blood cells) কমে গিয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাওয়া
উপরে বর্ণিত ভাইরাসগুলো দ্বারা আক্রান্ত বিড়াল ও কুকুরের বেঁচে থাকার চান্স খুব কম থাকে। তাই সময় থাকতেই ভ্যাকসিন করে নেয়া উচিত। নিচে বিশ^ স্মল এনিমেল ভেটেরিনারি এর একটি গাইডলাইন দেয়া হলো
বিড়ালের ভ্যাকসিন
| ভ্যাকসিন | বিড়ালছানা (১৬ সপ্তাহের নিচে) | বিড়ালছানা (১৬ সপ্তাহের উপরে) | বুস্টার ডোজ |
| ফেলাইন প্যানলিউকোপেনিয়া (PUREVAX FELINE 4) | ৬ সপ্তাহ থেকে দেয়া যাবে। তারপর প্রতি ৩-৪ সপ্তাহ পরপর ভ্যাকসিন করতে হবে, ১৬ সপ্তাহ না হওয়া পর্যন্ত। | দুইটা টিকা ২ থেকে ৪ সপ্তাহের ব্যবধানে দেওয়া ভালো। তবে একটা ডোজ ও করা যেতে পারে। | ৬ তম মাসে করা যাবে |
কুকুরের ভ্যাকসিন
| ভ্যাকসিন | কুকুরছানা (১৬ সপ্তাহের নিচে) | কুকুরছানা (১৬ সপ্তাহের উপরে) | বুস্টার ডোজ |
| ক্যানাইন পারভোভাইরাস (RECOMBITEK C4) | ৬ সপ্তাহ থেকে দেয়া যাবে। তারপর প্রতি ৩-৪ সপ্তাহ পরপর ভ্যাকসিন করতে হবে, ১৬ সপ্তাহ না হওয়া পর্যন্ত। | দুইটা টিকা ২ থেকে ৪ সপ্তাহের ব্যবধানে দেওয়া ভালো। তবে একটা ডোজ ও করা যেতে পারে। | ৬ তম মাসে করা যাবে |
বাংলাদেশে বর্তমানে এসব ভ্যাকসিন সহজলভ্য। যেমন—বিড়ালের জন্য PUREVAX FELINE 4 এবং কুকুরের জন্য RECOMBITEK C4, যা স্কয়ার এগ্রোভেট ডিভিশন বাজারজাত করছে।
উপসংহার
পোষা প্রাণীর সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে ভ্যাকসিন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। কুকুর, বিড়ালসহ অন্যান্য পোষা প্রাণী বিভিন্ন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে, যা কখনও কখনও মানুষের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এসব সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষার জন্য নিয়মিত ভ্যাকসিনই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
তবে ভ্যাকসিন প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। অবশ্যই লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও অভিজ্ঞ পশু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিকা দিতে হবে। নির্ধারিত সময়সূচি মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টিকা দেওয়ার পর সাময়িকভাবে হালকা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, তবে তা সাধারণত গুরুতর নয়।
সবশেষে বলা যায়, পোষা প্রাণী যদি সত্যিই আমাদের পরিবারের অংশ হয়, তাহলে তাদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়েও আমাদের সমানভাবে সচেতন হতে হবে। সময়মতো ভ্যাকসিন প্রদান তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্বশীল ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। এতে তারা যেমন সুস্থ থাকবে, তেমনি আমরাও থাকব নিশ্চিন্ত।
লেখক: ডিভিএম, এমএস (রাবি), পিজিটি
প্রোডাক্ট এক্সিকিউটিভ
এগ্রোভেট ডিভিশন
স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি



