
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি।বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান খুবই সামান্য—প্রায় ০.৪ শতাংশ অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব সবচেয়ে বেশি ভোগ করতে হচ্ছে এই দেশকেই। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত অথবা হঠাৎ অতিবৃষ্টি, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস —এসবের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর। বাংলাদেশের বাস্তবতায় টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে এখনই জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে অভিযোজিত কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং এর সাথে যুক্ত নতুন নতুন পেশা সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত; দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১১–১২ শতাংশ আসে কৃষি থেকে এবং প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের জীবিকা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষির স্বাভাবিক পরিবেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের অনিয়ম এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসল উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন কয়েক শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে যদি রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে অভিযোজিত ফসলের জাত ও প্রযুক্তি গবেষণা এবং উদ্ভাবন না করা হয় ।
বর্তমানে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের উপকূলীয় এলাকার উল্লেখযোগ্য অংশ ইতোমধ্যে লবণাক্ততার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, অনেক জায়গায় ধান ও অন্যান্য ফসল চাষ করা কঠিন হয়ে পড়ছে এর সাথে ক্রমেই কিছু এলাকায় সুপেয় পানির অভাব । অন্যদিকে, উত্তরাঞ্চলে খরার প্রকোপ এবং মধ্যাঞ্চলে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষি উৎপাদনের ধারাবাহিকতাকে ব্যাহত করছে, ফলে ঝুঁকি বাড়ছে আগামী দিনে খাদ্য নিরাপত্তায়। প্রতি বছর বন্যা ও নদীভাঙনের কারণে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা কৃষি পেশা ও খাদ্য উৎপাদনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু উৎপাদনের ওপর নয়, কৃষকের আয় ও জীবিকার ওপরও পড়ছে। তীব্র তাপপ্রবাহ ও অনিয়মিত আবহাওয়ার কারণে কৃষি শ্রমিকদের কাজের সময় কমে যাচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, ফলে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে হলে জলবায়ু অভিযোজিত কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প নেই। জলবায়ু অভিযোজিত কৃষি বলতে এমন কৃষি পদ্ধতিকে বোঝায় যা পরিবর্তিত আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে উৎপাদন ধরে রাখতে পারে এবং কৃষকের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে কিছু উদ্ভাবনী উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে; যেমন—লবনাক্ততা সহিষ্ণু ও খরা সহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবন, উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি ও ধানের সমন্বিত চাষ, জলাবদ্ধ এলাকায় ভাসমান কৃষি, খরা প্রবন এলাকায় পানি সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি ইত্যাদি। এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে যে সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যেও কৃষি উৎপাদন বজায় রাখা সম্ভব।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জলবায়ু অভিযোজিত কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর বিষয় নয়; এটি নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি, কৃষি পরামর্শ সেবা, সেন্সর ভিত্তিক রিয়েল টাইম ডিজিটাল কৃষি তথ্য প্রদান, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে অভিযোজিত উন্নত বীজ উৎপাদন, পরিবারভিত্তিক প্রাণিসম্পদ ও পোল্ট্রি খামার—এসব খাতে বিপুল কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।
এক্ষেত্রে সার্কুলার ইকোনমি বা চক্রাকার অর্থনীতির ধারণা কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে পারে। কৃষি ব্যবস্থায় উৎপাদনের প্রতিটি ধাপের বর্জ্যকে নতুন সম্পদে রূপান্তর করা হলে একদিকে পরিবেশ দূষণ কমবে, অন্যদিকে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হবে। যেমন—গবাদিপশুর বর্জ্য থেকে জৈব সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদন, কচুরিপানা, জলজ আগাছা, শিল্পের বায়ো ডিগ্রেডেবল বর্জ্য, পোল্ট্রি লিটার থেকে উন্নত জৈব সার তৈরি ,ফসলের অবশিষ্টাংশ থেকে কম্পোস্ট বা জ্বালানি উৎপাদন ইত্যাদি, এতে করে একই সম্পদ বারবার ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি আরও টেকসই ও লাভজনক হতে পারে এবং গ্রামীণ এলাকায় নতুন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও পেশার সৃষ্টি সম্ভব হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে জলবায়ু অভিযোজনভিত্তিক কৃষিতে সফলতার উদাহরণ তৈরি করেছে। নেদারল্যান্ডস সীমিত জমি ও বন্যার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম বড় কৃষি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। ভিয়েতনাম উপকূলীয় অঞ্চলে লবণসহিষ্ণু ধান এবং চিংড়ি-ধান সমন্বিত চাষের মাধ্যমে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি করেছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে খরা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে খাপ খাইয়ে বিকল্প ফসল ও পানি ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, চীন মরুভূমিতে ফসল,মাছচাষ এবং সবুজ বনায়ন সৃষ্টি করছে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—জলবায়ু ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সঠিক পরিকল্পনা, গবেষণা এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষিকে টেকসই ও লাভজনক করা সম্ভব।
বাংলাদেশে জলবায়ু অভিযোজিত কৃষি ও নতুন পেশা সৃষ্টির জন্য কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, জলবায়ু সহনশীল ফসল ও কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, অঞ্চলভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে কারণ দেশের প্রতিটি অঞ্চলের জলবায়ু ঝুঁকি ভিন্ন। তৃতীয়ত, গ্রামীণ তরুণদের কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। চতুর্থত, কৃষি প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকদের তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করতে হবে এবং বাজার সংযোগ বাড়াতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কৃষিকে শুধু একটি উৎপাদন খাত হিসেবে না দেখে একটি আধুনিক ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, এতে করে কৃষি খাতে তরুণদের আগ্রহ বাড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবে এর মধ্যেই রয়েছে নতুন সম্ভাবনার দ্বার। পরিকল্পিতভাবে জলবায়ু অভিযোজিত কৃষি এবং নতুন পেশা সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া গেলে বাংলাদেশ শুধু খাদ্য নিরাপত্তাই নিশ্চিত করতে পারবে না বরং একটি টেকসই ও কর্মসংস্থানমুখী কৃষি অর্থনীতি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে তাই প্রশ্ন একটাই—আমরা কি কৃষি উৎপাদনে পুরোনো পদ্ধতিতে আটকে থাকব, নাকি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সাথে খাপ খাইয়ে এগিয়ে যাওয়ার নতুন পথ তৈরি করব? বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সেই সিদ্ধান্তের ওপর।
লেখক: অঞ্জন মজুমদার, পোল্ট্রি প্রোডাকশন এন্ড সাপ্লাই চেইন স্পেশালিষ্ট।



