এখন ফসল হারানোর কারণে কৃষকদের ঘরে খাবার নেই। হাতে টাকাকড়ি কিছুই নেই। কীভাবে তারা বাঁচবেন সেই দুর্ভাবনায়, দুঃশ্চিন্তায় নিথর মনপ্রাণ হাওরবাসীর। প্রশ্ন হলো- এ বিপর্ষয় কি শুধুই হাওরবাসীর। বাংলাদেশের কেন নয়? হাওরের ধান আর মাছ তো কেবল হাওরবাসীর নয়- সারা বাংলাদেশের। তাহলের হাওরাঞ্চলের দুর্যোগ মোকবিলায় সবার এগিয়ে আসা উচিত নয়কি?

এস.এম. মুকুল: অতিবৃষ্টির কারণে পানিতে ডুবে গেল কৃষকের প্রাণ-হাওরের ধান। কৃষকের মাথায় হাত উঠেছে। ঋণ পরিশোধ আর সারাবছরের খোড়াকির চিন্তায় কপালে ভাজ পড়েছে। ডুবে যাওয়া ফসলের জমিতে বৃদ্ধ কৃষকের আহাজারি আর বিলাপের ভিডিওচিত্র ভাইরাল হয়েছে। এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণের একটা গাণিতিক হিসাব হয়তোবা পাওয়া যাবে- কিন্তু কৃষকের ভাগ্যের দুর্দশার ভাগ নিবে কে? কৃষকের মাথায় চেপে বসল ঋণ পরিশোধ এবং সুদের চাপ। দেখা দিবে গবাদিপশুর খাদ্য সঙ্কট। যদিও মানুষেরই খাবারের অভাব, অর্থের অভাব, কাজের সঙ্কট দেখা দিবে। ভেবে দেখুন, যাদের গোলা থেকে ধান বিক্রি করে আয়েশ করার কথা সেখানে দুই কোটি হাওরবাসী জনগোষ্ঠির সিংগভাগ মানুষ পড়ে গেল সারাবছরের খাদ্য সঙ্কটে। এখন চিকিৎসা, শিক্ষা, পোশাক-আশাক, বিয়ে-শাদি নিয়ে শুধুই দূরাশা-দুর্ভাবনা।
হাওরের জনগণের বেঁচে থাকাটাই যেখানে সংগ্রাম সেখানে ফসলহানির ভয়াবহ সঙ্কট কাটানো- মরার উপর খরার ঘাঁ ছাড়া আর কিছুই নয়। ভাগ্য বিপর্যয় ঘটলে বুঝি এমনই হয়। ২০১৭ সালে অকাল বন্যায় ফসল ডুবির বিপর্যয়ের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। তখন পুরো হাওরাঞ্চলের ফসল ডুবে যাওয়ায় পচা ধানের গন্ধ আর গরমে অ্যামোনিয়া গ্যাস সৃষ্টি হলে পানির অক্সিজেন কমে গিয়ে মাছের মড়ক শুরু হয়েছিলো। সেই বিষাক্রান্ত মরা মাছ খেয়ে মড়ক শুরু হয়েছিলো হাঁসের। সেই দুর্যেগের প্রায় ১০ বছর পরও কেন আমরা হাওরের সমস্যাগুলোর স্থায়ী কোনো সমাধান করতে পারলাম সেটাই আসল প্রশ্ন। তাহলে হাওর নিয়ে আমরা কী এমন কাজ করছি! হাওরের এমন মহাপরিকল্পনা দিয়ে আমাদের কি লাভ!
খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পিছনে হাওরবাসীর অসামান্য অবদান অনস্বীকার্য। রাতা, টেফি, গচি’র মতো সুস্বাদু বিরল প্রজাতির দেশীয় ধান ফলায় হাওরের কৃষকরা। মহাশোল, আইড়, পাবদা, গজার, কালি বাউশসহ বিলুপ্ত প্রায় দেশীয় প্রজাতির অনেক জাতের মাছ এখনো হাওরে পাওয়া যায়। অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই হাওর বাংলাদেশের প্রাকৃতিক জলাধারের মধ্যে অন্যতম। সারাদেশের মধ্যে প্রাকৃতিক পরিবেশে চাষাবাদ ও জীবনযাপন এই হাওরাঞ্চলে এখনো লক্ষ্যকরা যায়।
অপরদিকে হাওরকে বলঅ হচ্ছে বাংলার প্রাকৃতিক মৎস্যখনি এবং আগামী দিনের খাদ্য ভান্ডার। বিশ্বখ্যাত রামসার সাইট টাঙ্গুয়া, হাকালুকিসহ এই হাওরাঞ্চলে দেশীয় ও অতিথি পাখির সবচেয়ে নিরাপদ অভয়াশ্রম। এই হাওরাঞ্চলের মাটি ও পানি নিয়ে বিস্তর গবেষণা করা প্রয়োজন। হাওরের মাটির নিচে অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে সার্বিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় হাওরাঞ্চলের অবদান ও ভুমিকা অনবদ্য। এই হাওরাঞ্চলের কৃষকরা যদি ১০ বছর নিরাপদে ফসল ঘরে তুলতে পারে তাহলে মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ থেকে উন্নত ও স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়তে খুব বেশি সময় লাগবে না। জনশ্রুতি আছে- শুধুমাত্র শনির হাওরের উৎপাদিত ধানে সারা বাংলাদেশের ৬ দিনের খাদ্য চাহিদা পূরণ হয়। মাননীয় খাদ্যমন্ত্রীকে বলতে ইচ্ছা করে – হাওরবাসীরা এই ধান ঘরে তুলতে পারলে আমাদের অর্থনীতি আরো কতনা শক্তিশালী হতো ভেবে দেখুন। মাননীয় মন্ত্রী বাংলার কৃষকের স্যালুট জানান- বিশেষত হাওরের কৃষকদের। কেননা তাদের শ্রম ও মেধার গুণেই আপনার মতো খাদ্যমন্ত্রীদের সফলতা আসে।
কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি, হাওর এলাকা যদি ভারতের মতো বাংলাদেশের একটি অঙ্গরাজ্য হতো আর সেই রাজ্যে যদি মমতা ব্যানার্জির মতো ক্ষমতাধর শাসক থাকতো তাহলে নিশ্চয়ই হাওরের ফসল ধান আর মাছ সারাবাংলায় আর সরবরাহ করতে দিতো না। কারণ হাওরের ধান আর মাছ দিয়ে হাওর সমৃদ্ধ হতে বেশিদিন লাগার কথা নয়। হাওরাঞ্চলের সুনামগঞ্জের জনপ্রিয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল সাহেব বেশ জোড়ালোভাবে হাওরের সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছেন। ঠিক একইভাবে যদি হাওরাঞ্চলের সবকটি আসনের সংসদ সদস্যরা একযোগে হাওরের সমস্যা সমাধানে স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসনকে নিয়ে কাজ করতেন তাহলে প্রতিবছর হাওরের দুর্যোগ-দুর্ভোগ নিয়ে এত দুর্ভাবনার কোনো কারণ ছিলোনা।
তাই হাওরাঞ্চলের সকল সংসদ সদস্যদের প্রতি দাবি জানাচ্ছি আপনারা সার্বিকভাবে হাওরাঞ্চলের পরিবেশবান্ধব সামগ্রিক উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহ, স্থানীয় প্রশাসন, সকল স্তরের জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, লেখক, কৃষি গবেষক ও কল্যাণকামী ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে একযোগে কাজ করুন। কারণ হাওরাঞ্চলের সমস্যাগুলো একসুঁতোয় গাঁথা। আরেকটি দাবি জানাচ্ছি একটি ‘হাওর বিষয় মন্ত্রণালয়’ করার বিষয়ে সংসদে আলাপ তুলুন।
মনে রাখতে হবে, হাওরবেষ্টিত ৬ জেলা সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ এলাকার অধিকাংশ মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীল। এক ফসলি বোরো ফসল এসব জেলার কৃষকদের একমাত্র ভরসা। এই এক ফসলি নির্ভরতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এখন ফসল হারানোর কারণে কৃষকদের ঘরে খাবার নেই। হাতে টাকাকড়ি কিছুই নেই। কীভাবে তারা বাঁচবেন সে দুর্ভাবনায়, দুঃশ্চিন্তায় নিথর মনপ্রাণ হাওরবাসীর। প্রশ্ন হলো- এ বিপর্ষয় কি শুধুই হাওরবাসীর। বাংলাদেশের কেন নয়? হাওরের ধান আর মাছ তো শুধুই হাওরবাসীর নয়- সারা বাংলাদেশের। তাহলের হাওরাঞ্চলের দুর্যোগ মোকবিলায় সবার এগিয়ে আসা উচিত নয়কি?
বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পিছনে হাওরবাসীর অসামান্য অবদান রয়েছে। প্রায় ত্রিশ লাখ টন ধান উৎপাদন হয় হাওরাঞ্চলে। সারাদেশে উৎপাদিত মাছের ২৫-৩০ শতাংশ আসে হাওরাঞ্চল থেকে। বিরল প্রজাতির দেশীয় ধান ও মাছ ছাড়ায় জলজ প্রাণীর অস্থিত্ব রয়েছে এই হাওরে। বাংলাদেশে সার্বিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় হাওরাঞ্চলের অনবদ্য অবদান ও ভুমিকার জন্য আগামী দিনের খাদ্য ও মৎস্য ভান্ডার হিসেবে হাওরাঞ্চলকে স্বীকৃতি দিন।
তারপরও আমার মতো লেখককে বারবারই কেন লিখতে হয় ‘চীনের দুঃখ হোয়ংহু আর হাওরবাসীর দুঃখ বাঁধ’। বলতে দ্বিধা নেই উন্নয়ন আর সংস্কারের নামে হাওর এলাকার বাঁধ এখন যেন চোরাবালির ফাঁদ। তাই বাঁধগুলোকে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের নেতৃত্বে স্থায়ীভাবে নির্মাণের ব্যবস্থা করা জরুরি। স্থানীয়দের ধারণা, হাওরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী, নালা, খাল, বিলগুলো খনন এবং অকাল বন্যারোধি বাঁধগুলো স্থায়ীভাবে নির্মাণ করলে হাওরের ৮০% সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু এখন তারও আগে দরকার দুর্যোগ মোকাবিলায় এক বছরের জন্য ‘হাওরের দুর্যোগ উত্তরণ কর্মসূচি’ঘোষণা করা। এই কর্মসূচির আওতায় হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারগুলোকে ত্রাণ হিসেবে পরিবার প্রতি চাল ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম শুরু করা। বর্ষা শুরু হচ্ছে- রেশন বা ত্রাণ নিতে দূরবর্তী স্থানে যাতায়াত খরচ অনেক পড়বে তাই বিজিবি’র মাধ্যমে বর্ষায় ট্রলারে করে গ্রামে গ্রামে বা নিকটবর্তী বাজারগুলোতে এই রেশন বিতরণ করা যেতে পারে।
আমাদের মনে থাকার কথা, সিডরের বিপর্যয়ে সময় মোবাইল কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে দেশের সর্বস্তরের জনগণ দুর্যোগ এলাকায় সহায়তা দিয়েছে। সরকার মোবাইল এসএমএস ও বিকাশভিত্তিক তেমন একটি উদ্যোগ নিতে পারে কিনা ভেবে দেখা দরকার। চলতি বছরের জুন মাস থেকে আগামী বছরের চৈত্র মাস পর্যন্ত এক বছর এই দুর্যোগ মোকাবেলা কার্যক্রম চালাতে হবে। আগামী বছরের অগ্রহায়ন-পৌষ মাসে হাওরে বীজ বোনার জন্য বীজ সহায়তা ও কৃষির খরচ মেটাতে ব্যাংকঋণ সহায়তা দিতে হবে। হাওরের কৃষকদের কৃষি ও এনজিওদের ঋণ মওকুফ এবং নতুনভাবে কৃষি ঋণ প্রদান করতে হবে। সেখানে শিক্ষা ও চিকিৎসা সহায়তা বাড়াতে হবে।
আমার বিশ্বাস, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছায় হাওরবাসীর অকালবন্যায় ফসলহানির অনিশ্চয়তাও ঘোঁচানো সম্ভব হবে। সেজন্য ৯০-১২০ দিনের মধ্যে ঘরে তোলা সম্ভব এমন ধানের চাষাবাদকে হাওরে জনপ্রিয় করতে হবে।
১০ বছরের জন্য হাওর বহুমাত্রিক উত্তন্নয়ণ কর্মসূচি’ :
* সুনামগঞ্জ জেলাকে কে হাওরের সেন্টার ঘোষণা করা।
* সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজার জেলাকে হাওর ইকোনোমিক জোন ঘোষণা করা।
* হাওরের উপযোগী শিল্প স্থাপনের ব্যবসায়ীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া।
* একটি হাওর মন্ত্রণালয়’ গঠন করা এবং হাওর বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা ।
* প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ে হাওরকে পাঠ্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা।
* হাওর সাংস্কৃতিক গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা, হাওর উন্নয়ন বোর্ড-এর জনবল বৃদ্ধি করা, সুনামগঞ্জে হাওর উন্নয়ন বোর্ডের লিয়াজো ও মনিটরিং কেন্দ্র স্থাপন করা।
* হাওরে ইকু ট্যুরিজমকে জনপ্রিয়করণে উদ্যোগ নেয়া, সমন্বিত ব্যবস্থা করা।
* হাওরাঞ্চলে আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করা এবং সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিকে শিক্ষক ও চিকিৎসকদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা করা। শিক্ষক ও চিকিৎসকদের এলাকায় অবস্থানের জন্য বছরে একটি বাড়তি উৎসাহ বোনাস দেয়া।
* হাওরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিকের জন্য নিজস্ব মেশিন নৌকার ব্যবস্থা করা, যাতে বর্ষায় শিক্ষার্থীরা সহজে স্কুলে যেতে পারে এবং রোগীরা সহজে চিকিৎসা সেবা পায়।
* হাওরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য ক্লিনিক একসাথে স্থাপন করা যেতে পারে। এতে চিকিৎসক ও শিক্ষকদের আবাসিক ব্যবস্থার খরচ কমবে।
* কৃষিজ উৎপাদন বহুমূখীকরণ, সমন্বিত কৃষি, ফসলের নিবিড়তা বাড়ালে সত্যিই হাওর হয়ে উঠবে আগামি দিনের খাদ্য ভান্ডার। হাওরে ধান রোপন ও কর্তন, মাড়াই কাজে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি যন্ত্রের ব্যবহার করলে সুফল আসবে। শুকনো মৌসুমে হাওরের পতিত জমিতে হাওরের মাটিতে ফলন উপযোগি সরিষা, মাসকলাই, মশুরকলাই, ভুট্টা, গম, শীতকালীন সবজি উৎপাদনে উৎসাহিত করা। বর্ষায় আখ চাষ, ভাসমান সবজি চাষ, কুটির শিল্প, গরু-ছাগল (ব্ল্যাকবেঙ্গল)-মহিষ পালন, হাস ও মুরগির খামার প্রভৃতি প্রকল্প বাস্তবায়ন উদ্যোগ নিলে হাওরের প্রকৃত ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে।
* মেঘালয় থেকে আগত ঢলের পানি যে স্থানটিতে প্রথমে এসে পড়ে সেখানটায় মাটি খনন করে জলাধার বানাতে হবে। তাহলে প্রথমেই পানির ঢল এসে সেখানে জমা হবে এবং পানির প্রবাহ চাপ কমবে। নদীগুলো খনন হলে পানি নদীতে প্রবাহিত হতে হতে ফসল ঘরে উঠে আসবে।
* হাওর উন্নয়ন বোর্ডকে প্রশাসনিক, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে শক্তিশালী করে তোলতে হবে। হাওর উন্নয়ন বোর্ডের জনবল বাড়িয়ে মনিটরিং, ডাটা কালেকশন, পরিদর্শন, প্রচারণা, প্রকাশনা, গবেষণাসহ কার্যক্রমের পরিধি বৃদ্ধি করা। হাওর বিষয়ক রিপোর্টিং, প্রকাশনা ও লেখালেখিকে উৎসাহিত করার জন্যে প্রতি বছর সাংবাদিক ও লেখক সন্মাননা বা হাওর ক্রিয়েটিভ এক্টিভিটিজ এওয়ার্ড প্রদান করা। বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড-এর ওয়েব সাইটটি নিয়মিত বাংলায় আপডেট করা। হাওরের সার্বিক উন্নয়ন, সমস্যা, কার্যক্রম, কর্মসূচি, উদ্যোগ, আয়োজন সর্বোপরি হাওরাঞ্চলের সার্বিক তথ্য ও সংবাদ নিয়ে একটি মাসিক হাওর বার্তা প্রকাশনা করা। বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড-এর ফেসবুক পেজ চালু করা এবং এতে সকল ধরণের সংবাদ লেখালেখি, ছবি, ভিডিও চিত্র ইত্যাদি প্রচার করা।
* হাওরকে প্রাকৃতি মৎস্যভান্ডার ঘোষনা করা। বর্ষায় হাওরের পানিতে দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা ব্যাপকভাবে অবমুক্ত করতে হবে। নির্দিষ্ট স্থানে ঘের করে এই পোনা বড় হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে পরে তা মুক্ত জলাশয়ে অবমুক্ত করা যেতে পারে।
* হাওর ট্যুরিজমকে জনপ্রিয়করণে ব্যাপক প্রচার ও প্রকাশনা দরকার। পর্যটন কেন্দ্র গড়ে না ওঠায় হাওরে ঘুরতে আসা পর্যটকদের পড়তে হয় নানামুখী বিড়ম্বনার। হাওরের পর্যটন খাতকে সরকার গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করলে দুই ঋতুতেই (বৃহদার্থে) বিরাট অর্থকরী ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে হাওরাঞ্চল। খালিয়াজুড়ি, মোহনগঞ্জ, তেতুঁলিয়া, কিশোরগঞ্জ, নিকলী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুনামগঞ্জ, তাহেরপুর, মধ্যনগর, ভোলাগঞ্জ, টেকেরহাট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, জামালগঞ্জ এসব জায়গায় বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের মাধ্যমে পর্যটকদের থাকা, খাওয়া আর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা দরকার। এই ব্যবস্থাগুলো নিশ্চিত হলে হাওরাঞ্চলের পর্যটন ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাবে। পর্যটন খাতে অনেক আয় হবে। ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।
* বর্ষাকালের আফাল বা ঢেউয়ের তা-ব থেকে বাড়ীঘর রক্ষার জন্য করচ-হিজলের ব্যারিকেড তৈরি করতে হবে। উš§ুক্ত উচুস্থানে হিজল, করচ ইত্যাদি গাছ লাগিয়ে জঙ্গল তৈরি করে জ্বালানি কাঠের চাহিদা মিটানো যেতে পারে। জঙ্গলে বর্ষায় মাছের উত্তম জায়গা হবে। পাখিদের অভয়াশ্রম তৈরি হবে।
* হাওরের মাঝখান দিয়ে রাস্তা হওয়ার ফলে যোগাযোগ উন্নত হলেও হাওরের পানি, পলি ও মৎস্য অবাদে বিচরণ করতে পারছে না। এজন্য রাস্তায় ঘন ঘন কলভার্ট বসানো দরকার। এতে পলিবাহিত মাটির উর্বরতা সবদিকে ছড়াবে। মাছের বিচরণ ক্ষেত্র বাড়বে।
* সহজ শর্তে বা ঋণ দিয়ে সৌর বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে হাওরাঞ্চলের বিদ্যুত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
* হাওরের করচের তেলে বায়োডিজেল উৎপাদন হতে পারে যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ভারতেও এ তেল কেরোসিনের পরিবর্তে কুপি জ্বালানো, রান্না-বান্না, পাম্প মেশিন চালানো, পাওয়ার ট্রিলার ও ট্রাক্টর চালানো; বাস, ট্রাক ও জেনারেটর চালানো ইত্যাদি কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে। করচের তেল জ্বালানি, লুব্রিক্যান্ট, সাবান কারখানা, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পেইন্টিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়। করচের তেল এবং শুকনো পাতা পোকামাকড় দমনের জন্য ব্যবহৃত হয়। করচের খইল পোল্ট্রি ফিড হিসেবে ব্যবহার হয়, মাটিতে প্রয়োগ করলে মাটির উর্বরতা বাড়ে এবং নেমাটোডের বিরুদ্ধে কাজ করে, বায়ো-গ্যাস উৎপাদনের জন্য খইল গোবরের চেয়ে উত্তম উপাদান বলে অনেকের অভিমত।
* হাওরের কালোমাটি সাশ্রয়ী, সহজলভ্য ও কাঠসহ অন্যান্য জ্বালানীর চেয়ে দীর্ঘক্ষণ জ্বলার কারণে এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
লেখক : হাওর বিষয়ক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট, হাওর : অদেখা ভুবন-অসীম সম্ভাবনা গ্রন্থর লেখক
ই-মেইল: writetomukul36@gmail.com ফোনালাপ : ০১৭১২৩৪২৮৯৪, ০১৫৫২৩৫৩৮৯২



