
ড. মো. শরীফুল ইসলাম : বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জীবিকায় মৎস্য খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। নদীমাতৃক এই দেশে প্রাকৃতিক জলাশয়—নদী, খাল, বিল ও হাওর—একসময় ছিল মাছের প্রধান উৎস। কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, ভরাট, দখল ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এসব জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে মৎস্য উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর।
এ প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর উদ্যোগে শুরু হওয়া ‘খাল কাটা কর্মসূচি’ নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এটি কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং একটি পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
নদী-খাল-প্লাবনভূমি: একটি একক বাস্তুতন্ত্র
খাল কাটা কর্মসূচি আসলে শুধু মাটি কাটার কাজ নয়—এটি একটি হাইড্রোলজিক্যাল রিকানেকশন বা জলপ্রবাহ পুনঃসংযোগের প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদের মূল রহস্য লুকিয়ে আছে নদী, খাল ও প্লাবনভূমি (floodplain)- এই তিনের সমন্বয়ে। নদী হলো মূল ধমনী—যেখানে পানি ও পুষ্টি প্রবাহিত হয়, খাল হলো শাখা-প্রশাখা—যা সেই পানিকে ছড়িয়ে দেয় গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে এবং প্লাবনভূমি হলো প্রজনন ক্ষেত্র—যেখানে মাছ জন্মায়, বেড়ে ওঠে এবং জলজ খাদ্যশৃঙ্খল পুনর্গঠিত হয়। ফলে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মৎস্য উৎপাদন ব্যবস্থা তৈরি হয়।
ইতিহাসের ধারায় খাল, বর্তমানের স্বপ্নে পুনর্জাগরণ
স্বাধীনতার পরপরই রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন—বাংলাদেশের উন্নয়নের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে তার প্রাকৃতিক জলব্যবস্থার পুনর্জাগরণে। তাঁর সময়েই শুরু হয়েছিল খাল খনন ও পুনঃখননের এক বিস্তৃত কর্মসূচি, যার লক্ষ্য ছিল হারিয়ে যাওয়া জলপথ পুনরুদ্ধার, কৃষি ও মৎস্য খাতকে শক্তিশালী করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আনা। জিয়াউর রহমান-এর সময়ের খাল খনন কর্মসূচি এই প্রাকৃতিক সংযোগকে শক্তিশালী করেছিল। ফলে—প্লাবনভূমিতে মাছের প্রজনন বেড়েছিল, কৃষিজমিতে সেচব্যবস্থা উন্নত হয়েছিল, গ্রামীণ অর্থনীতি নতুন গতি পেয়েছিল। এটি ছিল একটি ইকোসিস্টেম-ভিত্তিক উন্নয়ন চিন্তা, যা আজকের ভাষায় “nature-based solution” হিসেবে পরিচিত। নির্বাচনী অঙ্গীকারের ধারাবাহিকতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর উদ্যোগে শুরু হওয়া ‘খাল কাটা কর্মসূচি’ মূলত সেই পুরোনো দর্শনেরই আধুনিক রূপ—যেখানে উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামো নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ পুনর্গঠন।
মৎস্য খাতে প্রভাব: সংখ্যার ভাষায় সম্ভাবনার বিস্তার
বাংলাদেশের মৎস্য খাত শুধু একটি উপখাত নয়—এটি একটি অর্থনৈতিক শক্তি, একটি পুষ্টির উৎস এবং কোটি মানুষের জীবিকার ভিত্তি। আর এই খাতের প্রাণভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে নদী-খাল-প্লাবনভূমির ওপর।
বর্তমানে দেশে মোট মাছ উৎপাদন প্রায় ৫.০১ মিলিয়ন মেট্রিক টন—যা বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থানকে শীর্ষ উৎপাদকদের কাতারে নিয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রায় ৮৫% আসে অভ্যন্তরীণ (inland) জলাশয় থেকে, যেখানে নদী, খাল ও প্লাবনভূমির অবদান সবচেয়ে বেশি। এখানেই খাল কাটা কর্মসূচির গুরুত্ব—কারণ এই কর্মসূচি সরাসরি সেই প্রাকৃতিক উৎপাদন ব্যবস্থাকেই পুনর্জীবিত করে।
পরিসংখ্যান বলছে, শুধু প্লাবনভূমি থেকেই প্রায় ১৭% মাছ উৎপাদন হয়। কিন্তু খাল ভরাট হয়ে গেলে এই সংযোগ ভেঙে পড়ে—ফলে উৎপাদন সরাসরি কমে যায়। অতএব, খাল পুনঃখনন মানেই এই উৎপাদন চক্রকে আবার সচল করা।
বাংলাদেশের মৎস্য খাত—জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ২.৫%–৪.৪% অবদান রাখে, কৃষি জিডিপির ২২% এরও বেশি অংশ জোগান দেয় এবং প্রায় ২ কোটি মানুষের জীবিকা এই খাতের সঙ্গে জড়িত। অর্থাৎ, খাল কাটা কর্মসূচির মাধ্যমে যদি প্রাকৃতিক মাছ উৎপাদন মাত্র ১০–১৫% বৃদ্ধি পায়, তাহলে জাতীয় আয় বৃদ্ধি পাবে, গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়বে এবং দারিদ্র্য হ্রাস পাবে যা পুরো অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রাকৃতিক বনাম কৃত্রিম উৎপাদন: খালের কৌশলগত ভূমিকা
বর্তমানে বাংলাদেশের মৎস্য খাত ক্রমেই কৃত্রিম চাষের দিকে ঝুঁকছে—যেখানে অভ্যন্তরীণ চাষ (aquaculture) প্রায় ৫৫–৫৭% উৎপাদন জোগান দেয় । কিন্তু প্রাকৃতিক উৎস (capture fisheries)—বিশেষ করে নদী ও প্লাবনভূমি—এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ—এটি কম খরচে উৎপাদন দেয়, দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ করে এবং পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ছোট মাছ সরবরাহ করে। বাংলাদেশে মানুষের প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৭০–৭৫% আসে মাছ থেকে । বিশেষ করে ছোট দেশীয় মাছ (SIS), যা পুষ্টিগুণে ভরপুর, সেগুলোর প্রাপ্যতা বাড়ে—যা গ্রামীণ পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খাল পুনঃখননের মাধ্যমে এই প্রাকৃতিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা সম্ভব—যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে।
জীববৈচিত্র্যের পুনরুত্থান: হারানো প্রজাতির ফিরে আসা
বাংলাদেশে একসময় প্রায় ২৬০+ প্রজাতির স্বাদু পানির মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণা বলছে, আবাসস্থল ধ্বংস, পানি প্রবাহের ব্যাঘাত এবং খাল-নদীর বিচ্ছিন্নতার কারণে প্রায় ৩০–৪০% প্রজাতি এখন হুমকির মুখে। খাল পুনঃখননের ফলে—মাছের মাইগ্রেশন রুট (migration route) পুনরুদ্ধার হবে, নদী থেকে প্লাবনভূমিতে মাছের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত হবে এবং ডিম ছাড়ার (spawning) প্রাকৃতিক ক্ষেত্র ফিরে আসবে। ফলে শিং, মাগুর, কৈ, টেংরা, পাবদা—এমন দেশীয় প্রজাতিগুলোর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করবে। গবেষণায় দেখা গেছে, সংযুক্ত প্লাবনভূমিতে মাছের উৎপাদন বিচ্ছিন্ন জলাশয়ের তুলনায় ২–৩ গুণ বেশি হতে পারে।
বিশেষ করে ছোট মাছ Small Indigenous Species (SIS)—যেমন মলা, ঢেলা, পুঁটি—যেগুলো পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ, সেগুলোর পুনরুত্থান ঘটবে সবচেয়ে দ্রুত। মৎস্য অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়িত প্রকল্পভিত্তিক অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, যদি নদী-খাল-প্লাবনভূমির সংযোগ আরও উন্নত করা যায়, তাহলে—প্রাকৃতিক মাছ উৎপাদন ১০–২০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রপ্তানি ও বৈদেশিক আয়ে অবদান
বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৯১ হাজার মেট্রিক টন মাছ ও মৎস্যপণ্য রপ্তানি করে, যার মূল্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটির বেশি টাকা। খাল-নির্ভর প্রাকৃতিক উৎপাদন বাড়লে—কাঁচামালের সরবরাহ বাড়বে, প্রক্রিয়াজাত শিল্প সম্প্রসারিত হবে এবং বৈদেশিক আয়ও বৃদ্ধি পাবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে নীরব লড়াই
জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর দূরের কোনো হুমকি নয়—এটি বাস্তবতা। অতিরিক্ত বৃষ্টি, দীর্ঘ খরা, জলাবদ্ধতা—সবকিছুই আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলছে। এই প্রেক্ষাপটে খাল পুনঃখনন একটি কার্যকর অভিযোজন কৌশল। খালগুলো পানি সংরক্ষণ ও নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ তৈরি করে। ফলে বন্যার পানি দ্রুত নেমে যেতে পারে, আবার খরার সময় সেই পানি ব্যবহার করা যায়। এটি যেন প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই নয়, বরং তার সঙ্গে সমন্বয়ের এক বুদ্ধিদীপ্ত উপায়।
চ্যালেঞ্জ আছে, দায়িত্বও আছে তবে শুধু খাল কাটলেই হবে না—এটি টিকিয়ে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস আমাদের একটি সতর্কবার্তাও দেয়।
জিয়াউর রহমান-এর সময়ের উদ্যোগ সফল হলেও, পরবর্তীতে তা টেকসইভাবে ধরে রাখা যায়নি। কারণগুলো স্পষ্ট—রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, দখল ও দূষণ এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ঘাটতি। আজকের উদ্যোগকে সফল করতে হলে অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে। খাল দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন—এসব যদি চলতেই থাকে, তবে পুনঃখননের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তাই প্রয়োজন—স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ও পরিবেশগত মূল্যায়ন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং কঠোর আইন প্রয়োগ। সবচেয়ে বড় কথা, এই খালগুলোকে “প্রকল্প” হিসেবে নয়, “সম্পদ” হিসেবে দেখতে হবে।
শেষ কথা
একটি খাল, হাজার সম্ভাবনা‘খাল কাটা কর্মসূচি’ শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের জলজ সম্পদ, পরিবেশ এবং মানুষের জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি সমন্বিত উদ্যোগ—এটি একটি বাস্তুতন্ত্র, একটি অর্থনীতি, একটি সংস্কৃতি।খাল কাটা কর্মসূচি সেই হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনাগুলোকে আবার জাগিয়ে তোলার একটি সাহসী উদ্যোগ। যদি এই উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি শুধু মৎস্য খাত নয়—পুরো গ্রামীণ বাংলাদেশের চেহারা বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশের উন্নয়নের অভিযাত্রায় এই কর্মসূচি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিতে পারে—যদি আমরা সবাই মিলে এর সঠিক বাস্তবায়নে সচেষ্ট হই।
লেখক: সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিষ্ট (ফিশারিজ), সার্ক কৃষি কেন্দ্র, ফার্মগেট, ঢাকা, বাংলাদেশ।
ইমেইল: bausharif@gmail.com, sps_fisheries@sac.org.bd



