বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনা, কমবে খামারের ব্যয় ও কার্বন নিঃসরণ

মো. খোরশেদ আলম জুয়েল: দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় পোল্ট্রি খামারের বিশাল ছাদকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগানোর মাধ্যমে প্রায় ৪,০০০ থেকে ৪,৫০০ মেগাওয়াটপিক (MWp) সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে একদিকে জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে পোল্ট্রি খামারের বিদ্যুৎ ব্যয় কমানো, উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর পথও খুলবে।
গত ৩ অক্টোবর ঢাকার র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ ব্রাঞ্চ (WPSA-BB) আয়োজিত International Technical Seminar 2026-এ এ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (BPICC) সভাপতি মসিউর রহমান। ‘Climate-Smart Poultry Farming’ বিষয়ক উপস্থাপনায় তিনি কার্বন নিঃসরণ কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার এবং পোল্ট্রি খাতকে আরও টেকসই ও প্রযুক্তিনির্ভর করার একটি সমন্বিত ধারণা তুলে ধরেন। সেমিনারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল “Resilient Poultry Production for Global Competitiveness.”
মসিউর রহমানের উপস্থাপনার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে আনুমানিক ২৫ মিলিয়ন বর্গমিটার পোল্ট্রি শেডের ছাদ রয়েছে। এর প্রায় ৭০ শতাংশকে বাস্তবসম্মতভাবে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য ব্যবহার করা গেলে উচ্চদক্ষতার সৌরপ্যানেল দিয়ে প্রতি বর্গমিটারে প্রায় ০.২৫ কিলোওয়াটপিক (kWp) সক্ষমতা স্থাপন করা সম্ভব। সেই হিসাবে দেশের পোল্ট্রি শেডগুলোর ছাদ থেকে মোট প্রায় ৪,০০০–৪,৫০০ MWp সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই সম্ভাবনার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয় দেশের সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দিকে তাকালে। বিদ্যুৎ বিভাগের ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩২,৬৮৮ মেগাওয়াট এবং এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১৭,২০১ মেগাওয়াট। (বিদ্যুৎ বিভাগ) আবার আগস্টে গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ সংকটের মধ্যে দেশে একপর্যায়ে ২,২৫৯ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে এবং একই সময়ে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮,০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। (The Financial Express)
অর্থাৎ পোল্ট্রি খামারের ছাদে প্রস্তাবিত ৪,০০০–৪,৫০০ MWp সৌরক্ষমতা দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য একটি উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত নবায়নযোগ্য উৎস হয়ে উঠতে পারে। তবে এই সক্ষমতাকে সরাসরি ৪,০০০–৪,৫০০ মেগাওয়াট নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না; সৌরবিদ্যুৎ দিনের আলো ও সিস্টেমের সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। তবু দিনের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে এটি গ্রিড ও শিল্প-খাতের ওপর চাপ কমাতে এবং জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ সম্ভাবনা জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিকল্পনার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর লক্ষ্যে ৫,৫০০ মেগাওয়াট রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই পরিকল্পনায় ৪,৫০০ মেগাওয়াট গ্রাউন্ড-মাউন্টেড সৌরবিদ্যুৎসহ অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎসের লক্ষ্যমাত্রাও রয়েছে। (BSS)
এই হিসাবে শুধু পোল্ট্রি শেডের ছাদ থেকে সম্ভাব্য ৪,০০০–৪,৫০০ MWp সৌরক্ষমতা জাতীয় ৫,৫০০ মেগাওয়াট রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৭৩–৮২ শতাংশের সমান। ফলে পোল্ট্রি খাতকে রুফটপ সোলারের একটি বড় সম্ভাবনাময় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হলে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের গতি বাড়তে পারে।
পোল্ট্রি শিল্পের জন্য এর সরাসরি অর্থনৈতিক সুবিধাও রয়েছে। খামারের ছাদে সৌরপ্যানেল স্থাপন করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ খামারের নিজস্ব প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করা গেলে গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা এবং বিদ্যুৎ বিল কমানো সম্ভব। বিশেষ করে পোল্ট্রি খামারে ভেন্টিলেশন, কুলিং, আলো, পানি সরবরাহ ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। ফলে সৌরবিদ্যুৎ খামারের পরিচালন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতার ঝুঁকিও কিছুটা কমাতে পারে।
উপস্থাপনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়—সৌরপ্যানেল শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে না, শেডের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হতে পারে। ছাদের ওপর সৌরপ্যানেল ছায়া তৈরি করায় শেডের তাপমাত্রা প্রায় ২–৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমাতে সহায়তা করতে পারে। এর ফলে গরমের সময়ে ভেন্টিলেশন ও কুলিং ব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণও কমতে পারে।
অন্যদিকে পোল্ট্রি শিল্পে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লে কার্বন নিঃসরণ কমানোর সুযোগও তৈরি হবে। উপস্থাপনায় বলা হয়, বাংলাদেশে বছরে গড়ে প্রায় ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন পোল্ট্রি ম্যানিউর বা মুরগির বিষ্ঠা উৎপন্ন হয়, যার সঙ্গে বছরে প্রায় ১৩ মিলিয়ন টন CO₂ নিঃসরণের সম্পর্ক রয়েছে। উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই নিঃসরণ প্রায় ২০–৩০ শতাংশ কমানোর সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরা হয়।
সৌরবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস, কম্পোস্টিং ও রেন্ডারিং প্রযুক্তিকে একই ব্যবস্থার আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ খামারে শুধু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, মুরগির বিষ্ঠা থেকে বায়োগ্যাস ও কম্পোস্ট, মৃত মুরগি থেকে রেন্ডারিংয়ের মাধ্যমে পোল্ট্রি মিল এবং ডেটাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানোর একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
এ ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থাকে ভবিষ্যতের ‘স্মার্ট পোল্ট্রি ফার্ম’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর পাঁচটি প্রধান ভিত্তি হলো—নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য থেকে মূল্য সৃষ্টি, উন্নত বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, অটোমেশন এবং ডেটাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। ছোট, মাঝারি ও বড়—সব ধরনের খামারের জন্য খামারের আকার ও সক্ষমতা অনুযায়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের পৃথক মডেলও উপস্থাপনায় তুলে ধরা হয়েছে।
ছোট খামারে বায়োগ্যাস, জ্বালানি-সাশ্রয়ী আলো ও ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যয় ও নিঃসরণ কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মাঝারি খামারে এর সঙ্গে কাঠামোবদ্ধ কম্পোস্টিং, নেট মিটারিং ও স্বয়ংক্রিয় ভেন্টিলেশন যুক্ত করা যেতে পারে। আর বড় খামারে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, কম্পোস্ট প্ল্যান্ট, সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি স্টোরেজ, রেন্ডারিং প্ল্যান্ট, কার্বন ক্রেডিট এবং স্বয়ংক্রিয় পরিবেশ ও রোগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে একই ইকোসিস্টেমে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ স্মার্ট ফার্ম মডেলে ১০০ শতাংশ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, কম্পোস্ট প্ল্যান্ট, রেন্ডারিং প্ল্যান্ট এবং স্বয়ংক্রিয় ভেন্টিলেশন ব্যবস্থার সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো বর্জ্যকে বোঝা হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর এবং খামারের প্রতিটি সম্ভাব্য সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
এর ফলে পোল্ট্রি খাতের অর্থনীতিতে বহুমুখী পরিবর্তন আসতে পারে। বিদ্যুৎ ব্যয় কমার পাশাপাশি বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস, জৈবসার ও পোল্ট্রি মিল উৎপাদন করে অতিরিক্ত আয় করা সম্ভব। একই সঙ্গে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ যখন একদিকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ সংকট এবং জ্বালানি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলা করছে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে এগোচ্ছে, তখন পোল্ট্রি শেডের ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করার ধারণাটি নতুন একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। দেশের বিভিন্ন খামারে ছড়িয়ে থাকা বিশাল ছাদভূমি এ ক্ষেত্রে নতুন জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের অবকাঠামো হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।
ফলে পোল্ট্রি শিল্পের ছাদ ভবিষ্যতে শুধু মুরগি পালনের অবকাঠামোর অংশ নয়, জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তারও একটি সম্ভাবনাময় সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। ৪,০০০–৪,৫০০ MWp সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারলে পোল্ট্রি শিল্প একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং বর্জ্য থেকে অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টির একটি সমন্বিত মডেলে পরিণত হতে পারে।



