
মো. খোরশেদ আলম জুয়েল: বাংলাদেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় পোল্ট্রি খাতের গুরুত্ব দ্রুত বাড়লেও উৎপাদনের বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নানা ঝুঁকি। অতিরিক্ত সরবরাহ, বাজারদরের অস্থিরতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, রোগবালাই, দুর্বল বায়োসিকিউরিটি, জলবায়ুজনিত চাপ, আমদানিনির্ভর কাঁচামাল এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে দেশের পোল্ট্রি শিল্প এখন একটি জটিল ঝুঁকির কাঠামোর মধ্যে রয়েছে।
গত ৩ অক্টোবর ওয়াপসা-বিবি আয়োজিত সেমিনারে “Bangladesh Poultry Economics: Costs, Productivity, Profits, Risks, Resilience, and Baseline” শীর্ষক এক উপস্থাপনায় ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখা’র (WPSA-BB) সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ খাতটির বর্তমান অর্থনীতি, উৎপাদন, ব্যয়, মুনাফা ও ঝুঁকির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। উপস্থাপনার তথ্য অনুযায়ী, সামনে পোল্ট্রি খাতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়; বরং উৎপাদন ও কার্যকর বাজারচাহিদার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।
তাঁর উপস্থাপিত প্রতিবেদনে জানা যায়, দেশে বর্তমানে মোট পোল্ট্রি পাখির সংখ্যা প্রায় ৪০ কোটি ৬৬ লাখ। এর মধ্যে মুরগি প্রায় ৩৩ কোটি ৬১ লাখ এবং হাঁস ৭ কোটি ৬ লাখ। বছরে ডিম উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৪৪১ কোটি। একই সঙ্গে গত দুই দশকে মানুষের খাদ্যতালিকায় পোল্ট্রি মাংস ও ডিমের গুরুত্বও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০৫ সালে জনপ্রতি বছরে পোল্ট্রি মাংসের ভোগ ছিল ২ দশমিক ৪৮ কেজি, যা ২০২২ সালে বেড়ে ৯ দশমিক ৫৫ কেজিতে দাঁড়ায়। ডিমের ভোগও একই সময়ে ১ দশমিক ৯০ কেজি থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৬৫ কেজিতে পৌঁছেছে।
পোল্ট্রি খাতের এই সম্প্রসারণের সঙ্গে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও যুক্ত হয়েছে। উপস্থাপনায় দেশে এক লাখের বেশি বাণিজ্যিক খামার এবং ৩৫০ বিলিয়ন টাকার বেশি বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এ খাতের সংকট শুধু খামারি বা ব্যবসায়ীদের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং ভোক্তার খাদ্যনিরাপত্তাও সরাসরি যুক্ত।
তবে উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে বাজারের সমন্বয় না থাকায় সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হচ্ছে ডিওসি ও পোল্ট্রি পণ্যের দামে। উপস্থাপনার হিসাবে, ২০২৩ সালের প্রথম প্রান্তিকে প্রতি সপ্তাহে ব্রয়লার ডিওসি সরবরাহ ছিল প্রায় ১৭ লাখ ১১ হাজার। ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে তা বেড়ে প্রায় ২৬ লাখ ৬৫ হাজারে দাঁড়ায়—প্রায় ৬১ শতাংশ বৃদ্ধি।
কিন্তু সরবরাহ বাড়লেও ডিওসির দাম উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে একটি ব্রয়লার ডিওসির বিক্রয়মূল্য ছিল প্রায় ১৬ টাকা ৭০ পয়সা, যেখানে উৎপাদন ব্যয় ছিল প্রায় ৪৪ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি ডিওসিতে প্রায় ২৭ টাকা ৩০ পয়সার ব্যবধান তৈরি হয়। তৃতীয় প্রান্তিকেও লোকসানের চাপ অব্যাহত ছিল। লেয়ার ডিওসির ক্ষেত্রেও সরবরাহ বৃদ্ধির বিপরীতে বিক্রয়মূল্য কমার প্রবণতা দেখা গেছে।
এই অস্থিরতার প্রভাব খামার পর্যায়েও পড়ছে। উপস্থাপনায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ব্রয়লারের খামারদর নেমে প্রায় ১১৯ টাকা ৩০ পয়সায় দাঁড়িয়েছিল, যেখানে উৎপাদন ব্যয় ছিল প্রায় ১৩৪ টাকা ৩০ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে প্রায় ১৫ টাকা লোকসানের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
ডিমের বাজারেও একই ধরনের চাপ রয়েছে। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে খামার পর্যায়ে ডিমের দাম প্রায় ১৮ শতাংশ কমলেও খামারদর ও খুচরা দামের ব্যবধান ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ খামারি পর্যায়ে মূল্য কমলেও সেই সুবিধা একই হারে ভোক্তার কাছে পৌঁছায়নি।
উৎপাদন ব্যয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ফিডের। উপস্থাপনার হিসাবে, খামারের মোট উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ফিডে ব্যয় হয়। আবার ফিডের কাঁচামালের প্রায় অর্ধেক আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়হারের পরিবর্তন সরাসরি পোল্ট্রি উৎপাদন ব্যয়ে প্রভাব ফেলে। ডিম উৎপাদনেও ফিডের অংশ প্রায় তিন-চতুর্থাংশ—সাদা ডিমে ৭৪ দশমিক ১ শতাংশ এবং বাদামি ডিমে ৭৫ দশমিক ১ শতাংশ।
অন্যদিকে রোগ ও বায়োসিকিউরিটিও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে। এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, ইনফেকশাস ব্রংকাইটিস, গামবোরো, মারেকস ডিজিজ এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকির কথা উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়েছে। উচ্চ পাখির ঘনত্ব, দুর্বল বায়োসিকিউরিটি এবং কার্যকর বাফার জোনের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বাজারদর কমে গেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘ সময় লোকসানে থাকা খামারি দ্রুত নতুন ব্যাচ তুলতে গিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জীবাণুনাশক ব্যবহার বা প্রয়োজনীয় ডাউনটাইম কমিয়ে দিতে পারেন। এতে রোগের চাপ বাড়তে পারে এবং পরবর্তী উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনও নতুন চাপ তৈরি করছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রায় পাখির তাপজনিত চাপ ও মৃত্যুহার বাড়তে পারে। খোলা বা অপর্যাপ্তভাবে ইনসুলেটেড শেড, পানির গুণগত মানের অবনতি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়া এবং লিটার ও মৃত পাখি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা খামারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
আরেকটি বড় সমস্যা সরবরাহ চেইন। জীবন্ত পাখি পরিবহনে অপরিচ্ছন্ন যানবাহন, দীর্ঘ সময় খাঁচায় রাখা, বিভিন্ন উৎসের পাখি একত্র করা এবং বাজার এলাকায় লাইভ বার্ড স্লটারিং বায়োসিকিউরিটি ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিপরীতে আধুনিক প্রসেসিং ও কোল্ড চেইন এখনও সীমিত। উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, মোট পোল্ট্রি উৎপাদনের মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ প্রসেসিংয়ের আওতায় আসে।
নীতিগত সমন্বয়ের ঘাটতিও খাতটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতার অভাব, বাস্তবায়নের দুর্বলতা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং AIT, VAT ও শুল্কের পরিবর্তন ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে কার্যকর পোল্ট্রি ইন্স্যুরেন্স ও মূল্য স্থিতিশীলতা ব্যবস্থার অভাব বড় বাজারঝুঁকির সময় খামারিদের সুরক্ষা সীমিত করে।
এই পরিস্থিতিতে পোল্ট্রি খাতের সামনে সমাধানের পথ হিসেবে উঠে আসছে চারটি বিষয়—স্থিতিশীলতা, সাশ্রয়ী উৎপাদন, নির্ভরযোগ্যতা ও টেকসইতা। চাহিদাভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনা, ফিড ব্যয় কমানো, শক্তিশালী বায়োসিকিউরিটি, ক্ষুদ্র খামারিদের অবকাঠামো ও দক্ষতা উন্নয়ন, কোল্ড চেইন সম্প্রসারণ, ট্রেসেবিলিটি এবং লাইভ বার্ড মার্কেট থেকে ধীরে ধীরে প্রসেসড পোল্ট্রি বাজারে রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের পোল্ট্রি খাত ইতোমধ্যে উৎপাদন ও বিনিয়োগের দিক থেকে একটি বড় ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন সেই ভিত্তিকে টেকসই করতে হলে উৎপাদনের পরিমাণের পাশাপাশি বাজারের ভারসাম্য, উৎপাদন ব্যয়, রোগঝুঁকি এবং নীতিগত স্থিতিশীলতাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ পোল্ট্রি খাতের ঝুঁকি শুধু একটি শিল্পের ঝুঁকি নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষক, উদ্যোক্তা, কর্মসংস্থান, ভোক্তা এবং দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা।



