
আসাদুল্লাহ (ফরিদপুর) : কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও সম্প্রসারণে এগিয়ে যাচ্ছেন রাজবাড়ীর কৃষকরা। ধান রোপণে শ্রমিক সংকট, সময় ও উৎপাদন খরচ কমাতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় বাড়ছে রাইস ট্রান্সপ্লান্টার বা ধান রোপণযন্ত্রের ব্যবহার। এরই ধারাবাহিকতায় রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে ধান চাষাবাদ প্রযুক্তি বিষয়ে কৃষক মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) বালিয়াকান্দি উপজেলার শালমারায় ‘CGIAR Scaling for Impact (S4I)’ কর্মসূচির আওতায় এ মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্র (সিমিট), যশোর অঞ্চলের আয়োজনে এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বালিয়াকান্দি, রাজবাড়ীর সহযোগিতায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্থানীয় কৃষক-কৃষাণী, কৃষি কর্মকর্তা, সিমিটের কর্মকর্তা ও কৃষি যন্ত্রপাতি সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রাজবাড়ীর ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ রোকনুজামান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ খয়ের উদ্দিন মোল্লা। স্বাগত বক্তব্য দেন সিমিট বাংলাদেশের আঞ্চলিক সমন্বয়ক মোহাম্মদ জাকারিয়া হাসান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মোহাম্মদ খয়ের উদ্দিন মোল্লা বলেন, কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির সম্প্রসারণে রাজবাড়ীর কৃষকরা এগিয়ে যাচ্ছেন। ধান রোপণে শ্রমিক সংকট, সময় ও উৎপাদন খরচ কমাতে দিন দিন রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের ব্যবহার বাড়ছে। চলতি আমন মৌসুমে রাজবাড়ী জেলায় ১৬টি রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৩৬৩ একর জমিতে ধানের চারা রোপণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের ব্যবহার কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে আরও গতিশীল করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় সিমিট ও CGIAR-এর ‘Scaling for Impact’ কর্মসূচির আওতায় এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, চারা উৎপাদন উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রাইস ট্রান্সপ্লান্টার চালক ও কৃষি যন্ত্রপাতি মেরামতকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে হাতে ধানের চারা রোপণে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক, সময় ও অর্থের প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে অল্প সময়ে অধিক জমিতে চারা রোপণ করা সম্ভব। কৃষি বিভাগ এ প্রযুক্তি সম্প্রসারণে সব সময় কৃষকদের পাশে রয়েছে।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিমিট বাংলাদেশের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপক ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপক (ইন্টারন্যাশনাল ম্যানেজার) পিভিএল ভারতী। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পার্টনার প্রকল্পের সিনিয়র মনিটরিং অফিসার মো. হাফিজ হাসান, বালিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি অফিসার রতন কুমার ঘোষ, পাংশা উপজেলা কৃষি অফিসার মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন এবং আবেদীন ইকুইপমেন্টের জোনাল ম্যানেজার মো. শিহাবুল ইসলাম।
মাঠ দিবসে স্থানীয় কৃষকরা রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ব্যবহারের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তারা জানান, আগে ২২ শতাংশ জমিতে ধানের চারা রোপণের জন্য তিনজন শ্রমিকের প্রয়োজন হতো। প্রতি শ্রমিককে ৫০০ টাকা মজুরি ও ২০০ টাকা খাবার খরচ দিতে হতো। ফলে মোট ব্যয় হতো ২ হাজার ৪০০ টাকা। বর্তমানে একই পরিমাণ জমিতে রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে মাত্র ৮০০ টাকায় ধানের চারা রোপণ করা যাচ্ছে। এতে রোপণ ব্যয় প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। পাশাপাশি সময় ও শ্রম—দুটিই সাশ্রয় হচ্ছে।
মাঠ দিবসে স্থানীয় নারী উদ্যোক্তা রাজিয়া বেগমও তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমন মৌসুমে শ্রমিক সংকট ও উচ্চ মজুরি দীর্ঘদিন ধরে কৃষকদের জন্য বড় সমস্যা ছিল। বর্তমানে তিনি রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে প্রতি ২২ শতাংশ জমিতে ৮০০ টাকায় ধান রোপণ সেবা দিচ্ছেন। এ সেবা থেকে বিভিন্ন খরচ বাদ দেওয়ার পর প্রায় অর্ধেক অর্থ তাঁর লাভ হিসেবে থাকছে। এতে কৃষকদের সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা দেওয়ার পাশাপাশি নিজের জন্যও একটি লাভজনক আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আয়োজকরা জানান, কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে শ্রম ও উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি কৃষকদের মধ্যে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোই এ ধরনের উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। মাঠ পর্যায়ে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা সম্পর্কে কৃষকদের ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কৃষি যন্ত্রপাতি সেবা উদ্যোক্তা তৈরিতেও এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অনুষ্ঠানে সিমিটের কর্মকর্তাসহ উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা এবং স্থানীয় প্রায় ১০০ জন কৃষক-কৃষাণী উপস্থিত ছিলেন।



