
গাজীপুর সংবাদদাতা : দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ত ও জলাবদ্ধ জমিতে ধানের উৎপাদন বাড়াতে তিনটি নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন ও অবমুক্ত করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। নতুন উদ্ভাবিত জাতগুলো হলো ব্রি ধান-১১৬, ব্রি ধান-১১৭ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান-১০। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে প্রতিকূল পরিবেশে ধান উৎপাদন বৃদ্ধিতে এসব জাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শনিবার (২৭ জুন) গাজীপুরে ব্রি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন অগ্রগতি ২০২৫-২৬ এবং কর্মপরিকল্পনা ২০২৬-২৭’ শীর্ষক কর্মশালায় এ তথ্য তুলে ধরা হয়। কর্মশালাটি আয়োজন করা হয় ব্রি বাস্তবায়নাধীন ‘নতুন ০৬টি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণাগার উন্নয়ন (এলএসটিডি)’ প্রকল্পের আওতায়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও ব্রির মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) আফসারী খানমের সভাপতিত্বে কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) ড. রাশিদা ফেরদৌস, এনডিসি। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) মির্জা আশফাকুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন ব্রির পরিচালক (গবেষণা) ড. মো. রফিকুল ইসলাম এবং পরিচালক (প্রশাসন ও সাধারণ পরিচর্যা) ড. আমিনুল ইসলাম।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এলএসটিডি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এবং ব্রির ফার্ম মেশিনারি অ্যান্ড পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার ড. মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি তুলে ধরার পাশাপাশি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করেন।
তিনি জানান, এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় উদ্ভাবিত নতুন তিনটি ধানের জাত দেশের উপকূলীয় ও জলাবদ্ধ এলাকায় ধানের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কার্যকর অবদান রাখবে। একই সঙ্গে কৃষকের আয় বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও এসব জাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
প্রকল্প পরিচালক আরও জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকল্পের আওতায় নতুন করে ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পভুক্ত প্রযুক্তি গ্রামগুলোতে প্রদর্শনী প্লট স্থাপন, কৃষক প্রশিক্ষণ, আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার এবং গবেষণা-সম্প্রসারণ সংযোগ জোরদারের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আউশ, আমন ও বোরো মৌসুমে এসব প্রযুক্তি গ্রামে রাইস গার্ডেন স্থাপনের মাধ্যমে কৃষক ও গবেষকদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণে কৃষকদের আরও উৎসাহিত করছে।
মূল প্রবন্ধের ওপর অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত আলোচনা অধিবেশন পরিচালনা করেন ব্রির মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) আফসারী খানম। আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা প্রকল্পের অর্জন, চলমান কার্যক্রম, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকার নিয়ে মতবিনিময় করেন। একই সঙ্গে প্রকল্পের কার্যক্রম সময়মতো ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের কৌশল নিয়েও আলোচনা করা হয়।
কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য দেন প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক এবং ব্রির হাইব্রিড রাইস বিভাগের সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার ড. আফছানা আনছারী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) ড. রাশিদা ফেরদৌস, এনডিসি বলেন, এলএসটিডি প্রকল্পের মাধ্যমে অর্জিত স্থানভিত্তিক গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও প্রযুক্তি কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে ধানের লাভজনক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, প্রকল্পের অর্জন ভবিষ্যতের গবেষণা পরিকল্পনা, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং কৃষি উন্নয়ন নীতি প্রণয়নেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তিনি প্রকল্পের কার্যক্রম আরও গতিশীল ও ফলপ্রসূ করার আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে ব্রির মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) আফসারী খানম এলএসটিডি প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ও অগ্রগতির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, প্রকল্পটির মাধ্যমে স্থানীয় জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ, গবেষণা কার্যক্রম জোরদার এবং কৃষকদের মাঝে আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কার্যক্রম সম্পন্ন এবং প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য সফলভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কর্মশালায় ব্রির প্রধান কার্যালয়, আঞ্চলিক কার্যালয় ও স্যাটেলাইট স্টেশনের বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জাতীয় কৃষি গবেষণা ব্যবস্থার (নার্স) আওতাভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী, কৃষক প্রতিনিধি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
উল্লেখ্য, এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় প্রতিষ্ঠিত আঞ্চলিক কার্যালয় ও স্যাটেলাইট স্টেশনগুলো স্থানীয় পরিবেশ, মাটি ও জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো গবেষণা অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং দেশের বিভিন্ন কৃষি-প্রতিবেশগত অঞ্চলের উপযোগী স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে ব্রির গবেষণা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা। প্রকল্পটির মেয়াদ জুলাই ২০২৩ থেকে জুন ২০২৮ পর্যন্ত।



