
নিজস্ব প্রতিবেদক: দুধে ভেজাল মেশানোকে জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি ও ঘৃণ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, ‘শিশুখাদ্য হিসেবে দুধের কোনো বিকল্প নেই। অথচ সেই দুধে ভেজাল মিশিয়ে শিশুদের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য এমন ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই বরদাশত করা যায় না।’
বুধবার (১৪ অক্টোবর) পাবনা জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে ভেজাল দুধ প্রতিরোধে দুগ্ধ খামারি, উৎপাদক, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এবং জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের দুগ্ধ উৎপাদন ও দুগ্ধজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে পাবনার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি এ জেলার দুধ উৎপাদন ও সরবরাহ প্রক্রিয়ায় ভেজালের সংবাদ উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গুটিকয়েক অসাধু ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের কারণে জনস্বাস্থ্য যেমন ঝুঁকিতে পড়ছে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জেলার দুগ্ধশিল্পের দীর্ঘদিনের সুনাম।
ভেজাল প্রতিরোধে কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে মন্ত্রী জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনকে মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ভেজাল দুধ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন তিনি।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নিরাপদ দুধ নিশ্চিত করা শুধু সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার দায়িত্ব নয়; খামারি, সরবরাহকারী, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ মানুষকেও এ বিষয়ে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই দুধে ভেজাল মেশানোর প্রবণতা বন্ধ করা সম্ভব।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান বলেন, দুধের গুণগত মান নিশ্চিত করতে পাবনার বিভিন্ন চিলিং সেন্টারে কর্মরত ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. জহিরুল ইসলাম জানান, সভার আগে তিনি পাবনার চাটমোহর ও আটঘরিয়া উপজেলায় যথাক্রমে প্রাণ গ্রুপ ও ফারুক চিলিং সেন্টার পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনকালে প্রাণ গ্রুপের চিলিং সেন্টার কর্তৃপক্ষ জানায়, গুণগত মান সন্তোষজনক না হওয়ায় ওই দিন পাঁচটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের আনা দুধ ফেরত দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান মহাপরিচালক।
তিনি বলেন, ভেজাল দুধ প্রতিরোধে উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের প্রতিটি পর্যায়ে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, পাবনা দেশের অন্যতম প্রধান দুগ্ধ উৎপাদনকারী জেলা। অল্পসংখ্যক অসাধু ব্যক্তির কারণে জেলার হাজার হাজার সৎ ও পরিশ্রমী খামারির সুনাম ক্ষুণ্ণ হতে দেওয়া যাবে না।
তিনি জানান, ভেজাল দুধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে দুধের গুণগত মান পরীক্ষা ও ভেজাল শনাক্তকরণে পাবনায় একটি স্থায়ী পরীক্ষাগার স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
মতবিনিময় সভায় বক্তারা বলেন, দুধ শিশু, গর্ভবতী নারী ও বয়স্কদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিকর খাদ্য। অথচ কিছু অসাধু ব্যক্তি দুধের পরিমাণ বাড়াতে, ঘনত্ব পরিবর্তন করতে কিংবা সংরক্ষণের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ক্ষতিকর ও অনুমোদনবিহীন উপাদান মেশাচ্ছে। এ ধরনের ভেজাল দুধ নিয়মিত গ্রহণের ফলে পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা এবং কিডনি ও লিভারের ক্ষতিসহ দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এ ঝুঁকি আরও উদ্বেগজনক।
সভায় জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, বিভিন্ন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পাবনা জেলা সভাপতি, চেম্বার অব কমার্সের প্রতিনিধি, পাবনা জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি, এনএসআইয়ের যুগ্ম পরিচালক, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং দুগ্ধ খামারি, সরবরাহকারী ও ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা দুধে ভেজাল প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি, সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।



