
মো. খোরশেদ আলম জুয়েল: কৃষিতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়িয়ে বছরে প্রায় ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা দেখছে ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (FIAB)। এ লক্ষ্যে কৃষকদের জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহিত করতে প্রতি কেজিতে ১০ টাকা করে ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব করেছে সংগঠনটি। FIAB-এর হিসাব অনুযায়ী, বছরে ১.৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন জৈব সার ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে সরকারের প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হবে। একই পরিমাণ রাসায়নিক সারে ভর্তুকি দিতে যেখানে প্রায় ৫ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা প্রয়োজন হতো, সেখানে জৈব সারে ভর্তুকির পরিমাণ হবে অনেক কম।
জৈব সার শিল্পের উন্নয়নে সরকারের নীতিগত সহায়তা, প্রণোদনা ও ভর্তুকি চেয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর কাছে দেওয়া এক আবেদনে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেছেন FIAB সভাপতি মসিউর রহমান। সংগঠনের পক্ষ থেকে মসিউর রহমান স্বাক্ষরিত দেওয়া ওই আবেদনে দেশের সার আমদানিনির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় জৈব সার ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
FIAB-এর আবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৬–৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন সারের চাহিদা রয়েছে। এর একটি বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সার আমদানিতে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়েছে। ফলে আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় উৎস থেকে বিকল্প সার উৎপাদন ও ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ানো জরুরি।
সংগঠনটির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দেশে জৈব সারের ব্যবহার বর্তমান ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশে উন্নীত করা গেলে বছরে প্রায় ১.২ মিলিয়ন মেট্রিক টন রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানো সম্ভব। এর ফলে বছরে আনুমানিক ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
FIAB বলছে, জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহ দিতে সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে কম হবে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সার ভর্তুকিতে ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের হিসাব ধরে সংগঠনটি বলেছে, গড়ে প্রতি মেট্রিক টন রাসায়নিক সারে প্রায় ২৮ হাজার ৮০০ টাকা বা প্রতি কেজিতে ২৮.৮ টাকা ভর্তুকি পড়ে।
এর বিপরীতে জৈব সার ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করতে প্রতি কেজিতে ১০ টাকা ভর্তুকির প্রস্তাব করেছে ফিআব। সংগঠনটির হিসাবে, বছরে ১.৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন জৈব সার ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলে এ খাতে মোট ভর্তুকির প্রয়োজন হবে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
ফিআব-এর হিসাবে, একই পরিমাণ রাসায়নিক সার ব্যবহারে ভর্তুকি দিতে সরকারের প্রায় ৫ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা প্রয়োজন হতো। অর্থাৎ জৈব সারে ভর্তুকি দিলে শুধু বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগই তৈরি হবে না, সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় হতে পারে।
জৈব সার শিল্পের বিকাশে সংগঠনটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য কর রেয়াত, ভর্তুকি ও বিনিয়োগ প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। পাশাপাশি কৃষকদের জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহিত করতে প্রতি কেজিতে ১০ টাকা ভর্তুকি এবং গবেষণা, মান নিয়ন্ত্রণ ও সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার দাবি জানানো হয়েছে।
সংগঠনটির মতে, দেশে কৃষিজ, গবাদিপশু, পোল্ট্রি ও পৌর জৈব বর্জ্যের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। যথাযথ নীতি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এসব বর্জ্যকে উচ্চমানের জৈব সারে রূপান্তর করা গেলে একদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ কমবে, অন্যদিকে গড়ে উঠতে পারে শক্তিশালী দেশীয় জৈব সার শিল্প।
ফিআব আরো মনে করে, জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে রাসায়নিক সারের ওপর কৃষির নির্ভরতা কমানো সম্ভব হলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি মাটির জৈবগুণ, উর্বরতা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে দেশে একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব কৃষি উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার পথও সুগম হবে।
আবেদনে বিষয়টি জাতীয় স্বার্থে বিবেচনা করে জৈব সার শিল্পের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা, প্রণোদনা ও দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন FIAB সভাপতি মসিউর রহমান।



