
নিজস্ব প্রতিবেদক: উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকায় ধান উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও লবণসহনশীল নতুন জাত ‘ব্রি ধান১১৯’। আধুনিক প্রজনন কৌশল ব্যবহার করে মাত্র ৭.৫ বছরে উদ্ভাবিত এ জাতটি রোপা আমন ও বোরো—দুই মৌসুমেই চাষের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে লবণাক্ত উপকূলীয় এলাকার পতিত বা কম উৎপাদনশীল জমিকে ধান চাষের আওতায় আনার ক্ষেত্রে জাতটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গত ২৮ অক্টোবর ২০২৬ জাতীয় বীজ বোর্ডের (NSB) ১১৬তম সভায় রোপা আমন মৌসুমে চাষের জন্য ‘ব্রি ধান১১৯’-এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। ব্রির উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের গবেষকরা লোকেশন স্পেসিফিক টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট (এলএসটিডি) প্রকল্পের অর্থায়নে জাতটি উদ্ভাবন করেন।
জাতটি উদ্ভাবনের নেতৃত্ব দিয়েছেন ব্রির উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ এখলাসুর রহমান। সহ-উদ্ভাবক হিসেবে ছিলেন জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হাসিনা খাতুন, জ্যেষ্ঠ উদ্ভিদ প্রজননবিদ নুসরাত জাহান, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আরমিন আক্তার সেতু এবং বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (CRCIL) রিবেট ফারজানা দিশা।
জাতটির কৌলিক সারি IET13113-4R-63, যা IR-6 ও IR-SAL-73-32-এর সংকরায়ণের মাধ্যমে তৈরি। উদ্ভাবন প্রক্রিয়ায় Targeted Crossing Design, Modified Field RGA Method, Trait Panel SNP Detection এবং Hotspot-Based Strategic Forward Breeding-এর সমন্বিত প্রয়োগ করা হয়েছে। আধুনিক এসব প্রজনন প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় প্রায় চার বছর কম সময়ে জাতটি উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছে।
উপযুক্ত পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনায় ‘ব্রি ধান১১৯’-এর গড় ফলন প্রায় ৫.৭ টন প্রতি হেক্টর। পরিবেশ ও লবণাক্ততার মাত্রাভেদে ফলন ৪.৮ থেকে সর্বোচ্চ ৭.৬ টন পর্যন্ত হতে পারে। তুলনামূলকভাবে ‘ব্রি ধান৭৩’-এর চেয়ে জাতটির গড় ফলন প্রায় ১ টন বেশি। ফলে লবণাক্ত এলাকার পাশাপাশি অনুকূল লবণাক্ততামুক্ত পরিবেশেও জাতটি কৃষকের জন্য লাভজনক উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
জাতটির জীবনকাল প্রায় ১১৫ দিন এবং গাছের গড় উচ্চতা ১১৩ সেন্টিমিটার। শক্ত কাণ্ডের কারণে গাছ সহজে হেলে পড়ে না। শীষ থেকে ধান ঝরে পড়ার প্রবণতাও কম। প্রতি শীষে গড়ে প্রায় ২১৫টি পূর্ণ দানা থাকে, যা ‘ব্রি ধান৭৩’-এর তুলনায় প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি বেশি। দানার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে Gn1a জিনের উপস্থিতি সম্পর্কিত বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
ধানের দানা মাঝারি-লম্বা, চিকন ও সাদা। এক হাজার দানার ওজন ১৬.৮ গ্রাম। দানার দৈর্ঘ্য ৫.৯ মিলিমিটার এবং প্রস্থ ১.৮ মিলিমিটার। অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৫.৯ শতাংশ। রান্নার পর ভাত ঝরঝরে ও অ-আঠালো হওয়ায় চিকন চালের চাহিদাসম্পন্ন ভোক্তাদের কাছেও জাতটি গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
লবণসহনশীলতাই জাতটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি। চারা অবস্থায় ‘ব্রি ধান১১৯’ ১২ dS/m পর্যন্ত লবণাক্ততা তিন সপ্তাহ সহ্য করতে পারে। আবার উদ্ভিদের বৃদ্ধি থেকে প্রজনন পর্যায়ের সংবেদনশীল সময়েও ৮ থেকে ১০ dS/m লবণাক্ততার মধ্যে ফলন দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। কক্সবাজারের পরিবর্তনশীল লবণাক্ততা পরিস্থিতি এবং সাতক্ষীরার লবণাক্ত ও লবণাক্ততামুক্ত এলাকায় জাতটির মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় কৃষকের অংশগ্রহণে পরিচালিত পরীক্ষায়ও এর ফলন ও অভিযোজনক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে।
ব্রির গবেষকরা বলছেন, জাতটির স্বল্প জীবনকাল উপকূলীয় কৃষিতে ফসল বিন্যাসেও নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। রোপা আমন কাটার পর মধ্যম উঁচু থেকে উঁচু জমিতে সূর্যমুখী ও লবণসহনশীল সরিষার মতো ফসল চাষ করা সম্ভব হতে পারে। এতে একই জমিতে বছরে অতিরিক্ত একটি ফসল যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি ফসলের বৈচিত্র্য ও কৃষকের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। আবার বোরোর পর ধৈঞ্চা চাষ করে সবুজ সার হিসেবে ব্যবহার করলে মাটির জৈব পদার্থ ও উর্বরতা বাড়ানো সম্ভব।
বোরো মৌসুমেও জাতটির সম্ভাবনা যাচাই করা হয়েছে। বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির তত্ত্বাবধানে লবণাক্ত ও লবণাক্ততামুক্ত এলাকায় ২০টি স্থানে পরীক্ষা পরিচালনা করা হয়। ইতোমধ্যে PVT সম্পন্ন হয়েছে এবং বোরো মৌসুমে চাষের জন্য জাতীয় কারিগরি কমিটি সুপারিশ করেছে। জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন পাওয়া গেলে একই জাত রোপা আমন ও বোরো—দুই মৌসুমেই চাষ করা সম্ভব হবে। এতে উপকূলীয় এলাকায় ফসলের নিবিড়তা বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের আয় বৃদ্ধির সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে।
রোপা আমনে জাতটি চাষের জন্য ১ থেকে ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে বীজ বপন এবং ২৫ থেকে ৩০ দিন বয়সী চারা রোপণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রতি গোছায় ২ থেকে ৩টি চারা এবং সারি থেকে সারি ২০ সেন্টিমিটার ও গোছা থেকে গোছা ১৫ সেন্টিমিটার দূরত্ব রাখতে হবে। প্রতি হেক্টরে ইউরিয়া ২৩৪ কেজি, টিএসপি ৮৭ কেজি, এমওপি ১১৭ কেজি, জিপসাম ৭৮ কেজি ও জিংক সালফেট ১২ কেজি প্রয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।
ব্রির মহাপরিচালক ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ব্রি ধান১১৯’ আধুনিক উদ্ভিদ প্রজনন দক্ষতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। লবণাক্ত উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের জন্য জাতটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। এর মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন ও আয় বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।
ব্রির উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান ড. খোন্দকার মো. ইফতেখারুদ্দৌলা বলেন, মাত্র ৭.৫ বছরে জাতটি উদ্ভাবন আধুনিক প্রজনন কৌশলের কার্যকারিতার প্রমাণ। লবণাক্ততার পাশাপাশি লবণাক্ততামুক্ত পরিবেশেও জাতটির ভালো ফলনের সক্ষমতা রয়েছে।
জাতটির প্রধান উদ্ভাবক ড. মোহাম্মদ এখলাসুর রহমান বলেন, দীর্ঘ গবেষণা, নির্বাচিত প্রজনন ও মাঠপর্যায়ের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে জাতটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। কৃষকের মাঠে জাতটির সুফল পৌঁছে দেওয়াই এখন প্রধান লক্ষ্য।
এলএসটিডি প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ব্রি ধান১১৯’-এর অনুমোদন প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে স্থানভিত্তিক জাত উদ্ভাবনের গুরুত্ব অনেক। এর আগে এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় ‘ব্রি ধান১১৬’, ‘ব্রি ধান১১৭’ ও ‘ব্রি হাইব্রিড ধান১০’সহ বিভিন্ন জাত উদ্ভাবন ও অবমুক্ত করা হয়েছে। ‘ব্রি ধান১১৯’ সেই ধারাবাহিকতারই নতুন সংযোজন।

