
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের পুরো অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে ডিজিটাল অটোমেশনের আওতায় আনা হবে। একইসঙ্গে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড’ উদ্যোগের মাধ্যমে সব ধরনের নাগরিক সেবা এক প্ল্যাটফর্মে আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও-এ দৈনিক প্রথম আলোর আয়োজনে ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো, বন্দর থেকে পণ্য পরিবহন পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের অতিরিক্ত চার্জ হ্রাস এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। ব্যবসা বা প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আগে যেখানে অসংখ্য অনুমোদনের প্রয়োজন হতো, তা কমিয়ে মাত্র ১৩টিতে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প গ্রহণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিদিন মনিটরিং এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক করা হবে।
তিনি বলেন, অলিগার্কি বা কিছু লোকের নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি ও পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র (Welfare State) ও মানবিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে সরকার সর্বাত্মক সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণ বর্তমান সরকারের মূল দর্শন। দীর্ঘদিন ধরে বাজেটের বাইরে থাকা গ্রামীণ কামার, কুমার, তাঁতিসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, আগামী বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতি বা ক্রিয়েটিভ ইকোনমির জন্য বিশেষ ফান্ড ও প্রকল্প থাকবে। থিয়েটার, সংস্কৃতি, সংগীত, পেইন্টিং এবং আর্টিফিশিয়াল জুয়েলারি খাতকে অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে ‘থিয়েটার ডিস্ট্রিক্ট’ গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র ও সংগীতকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে দেশের ‘সফট পাওয়ার’ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের বিকল্প হিসেবে পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করার কথাও জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার, ফান্ড ম্যানেজার এবং আইএফসি থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর জন্য পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক করার বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।
কর ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, কর ফাঁকি রোধে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও বড় তামাক কোম্পানিগুলোর প্রকৃত বাজার অংশীদারিত্ব যাচাই করে ন্যায্য কর আদায় করা হবে। ছোট ব্যবসায়ী ও রেস্টুরেন্ট মালিকদের হয়রানি কমাতে বছরে একটি সহজ ‘ফ্ল্যাট রেট’ কর ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানো নয়, বরং সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে তা নিশ্চিত করা। আগামী দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশ একটি প্রকৃত কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন হোসেন জিল্লুর রহমান, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সেলিম জাহান, সিমিন রহমান, মাহবুব উর রহমান, মাসরুর রিয়াজ, মোহাম্মদ হাতেমসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা।



