
এস এম মুকুল : হাওরাঞ্চলে অকাল বন্যার কারণে ফসলহানির ঝুঁকি মোকাবিলায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এসেড হবিগঞ্জ (ASED HABIGONJ) এর উদ্যোগে জাপানের শেয়ার দ্যা প্ল্যানেট এসোসিয়েশন এবং জাপান ফান্ড ফর গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট (জেএফজিই) এর অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এনরিচ (ENRICH) প্রকল্প -এর আওতায় সুনামগঞ্জ জেলাধীন শান্তিগঞ্জ উপজেলার হাওরাঞ্চলে উন্নত ধান জাতের প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো স্থানীয় কৃষকদের কাছে বাস্তবভিত্তিকভাবে উন্নত ধানের জাতের কার্যকারিতা প্রদর্শন করা এবং তাদেরকে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা। অনুসন্ধানে জানা যায়, এই প্রদর্শনী প্লটগুলোতে ধানের ফলন বৃদ্ধি দেখে স্থানীয় কৃষকেরা বেশ উৎসাহিত হচ্ছেন। অনেক কৃষক প্রতিদিন এসব প্লট পরিদর্শন করছেন এবং ধানের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করছেন। এতে তাদের মধ্যে নতুন ধানের জাত চাষের আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক জোন এবং কৃষি উৎপাদনশীল অঞ্চল। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল ধান উৎপাদনের জন্য অতি সুপরিচিতি রয়েছে। কিন্তু এই অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের প্রাাকৃতিক ঝুঁকির মুখোমুখি হয়ে আসছে। আগাম বন্যা, খরা, শিলাবৃষ্টি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে প্রায়শই কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত ফসল ঘরে তুলতে পারেন না। যার কারণে প্রায় বছরই কৃষকেরা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হন। ফলে কৃষকের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা যেমন বিঘিœত হয়, তেমনি খাদ্য নিরাপত্তাও অনেক সময় হুমকির মুখে পড়ে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শান্তিগঞ্জ উপজেলার পূর্ব পাগলা ও পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের কৃষকেরা প্রতি বছর বোরো মৌসুমে ধান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু হাওর অঞ্চলের একটি বড় সমস্যা হলো আগাম পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যা। অনেক সময় ধান পুরোপুরি পাকার আগেই অকাল বন্যার পানিতে তলিয়েফসল নষ্ট হয়ে যায়। এতে কৃষকের বছরের সব পরিশ্রম এবং বিনিয়োগ এক মুহূর্তে হারিয়ে যায়। ধার-দেনা ও সুদের টাকায় ধান চাষ করে ফসল ঘরে তোলতে না পারায় কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হন। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বন্যাসহনশীল, স্বল্প জীবনকালীন এবং উচ্চ ফলনশীল ধান জাতের চাষ সম্প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এপ্রসঙ্গে জানতে চাইলে এসেড হবিগঞ্জ-এর প্রধান নির্বাহী জাফর ইকবাল চৌধুরি জানান- এই প্রকল্পের আওতায় পূর্ব পাগলা ও পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে মোট ৮ জন কৃষকের ৮টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি প্রদর্শনী প্লটের জমির পরিমাণ প্রায় ২৮ শতাংশ বা ১ বিঘা। এসব জমিতে উন্নত মানের বন্যাসহনশীল ও স্বল্প জীবনকালীন ধান জাত যেমন ব্রি ধান-৬৭, ব্রি ধান-৯২ এবং ব্রি ধান-১০৮ চাষ করা হয়েছে। প্রদর্শনী প্লটে অংশগ্রহণকারী কৃষকদের মধ্যে রয়েছেন মাহমুদপুর গ্রামের ছাদিক মিয়া, যিনি ১ বিঘা জমিতে ব্রি ধান-৯২ চাষ করেছেন। দামোদরতপী গ্রামের বেনু রঞ্জন দাস তার জমিতে ব্রি ধান-৬৭ চাষ করছেন। একই ইউনিয়নের পিঠাপই গ্রামের মতিউর রহমান এবং খুদিরাই গ্রামের আব্দুস সবুর উভয়েই তাদের জমিতে ব্রি ধান-৯২ চাষ করেছেন। পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের শত্রুমর্দন গ্রামের মনীন্দ্র সূত্রধর তার প্রদর্শনী প্লটে ব্রি ধান-৯২ চাষ করেছেন। ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের জাবদ নুর তার জমিতে ব্রি ধান-৬৭ চাষ করছেন। হোসেনপুর গ্রামের আবু মিয়া তার জমিতে ব্রি ধান-৯২ চাষ করেছেন। এছাড়া নিদনপুর গ্রামের রোশন আলী তার প্রদর্শনী প্লটে ব্রি ধান-১০৮ চাষ করছেন।
তিনি আরো জানান, এই প্রদর্শনী প্লটগুলো শুধু একটি কৃষি কার্যক্রম নয়; বরং আগামি দিনের কৃষিকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা এবং স্বপ্লসময়ে অধিক ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে এটি একটি পরীক্ষামূলক, শিক্ষণীয় ও গবেষণাধর্মী ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে। কারণ স্থানীয় কৃষকেরা যখন নিজেদের চোখে উন্নত ধানের জাতের ফলন, বৃদ্ধি এবং রোগবালাই প্রতিরোধ ক্ষমতা দেখতে পান, তখন তারা সহজেই নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
প্রদর্শনী প্লটগুলো স্থাপনের আগে কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। সেখানে জমি প্রস্তুতকরণ, উন্নত মানের বীজ নির্বাচন, চারা উৎপাদন, নির্ধারিত দূরত্বে চারা রোপণ, সুষম সার ব্যবস্থাপনা এবং রোগবালাই দমন পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এর ফলে কৃষকেরা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ধান চাষ সম্পর্কে ধারণা লাভ করছেন। প্রকল্পের মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা নিয়মিতভাবে এসব প্রদর্শনী প্লট পরিদর্শন করছেন। তারা কৃষকদেরকে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দিচ্ছেন এবং সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করছেন। এতে কৃষকেরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারছেন।
স্বপ্লকালিন নতুন জাতের ধান চাষের সম্ভাবনা বিষয়ে জানসতে চাইলে জাফর ইকবাল চৌধুরি বলেনÑ ব্রি ধান-৬৭ একটি স্বল্প জীবনকালীন ধান জাত, যা সাধারণত প্রাায় ১৪৫ থেকে ১৫০ দিনের মধ্যে পরিপক্ব হয়। এই জাতের ধান দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং আগাম বন্যার ঝুঁকি থেকে কৃষকদের অনেকটা নিরাপত্তা দেয়। ফলে কৃষকেরা বন্যা আসার আগেই ধান কাটতে সক্ষম হন। অন্যদিকে ব্রি ধান-৯২ একটি উন্নতমানের উচ্চ ফলনশীল ধান জাত, যার জীবনকাল সাধারণত ১৫৬ থেকে ১৬০ দিন। এই ধান জাতের শিষ তুলনামূলকভাবে বড় এবং দানার সংখ্যা বেশি হওয়ায় ফলনও বেশি পাওয়া যায়। এছাড়া এই জাত পরিবেশগত প্রতিকূলতার মধ্যেও (সাধারণ খরা) ভালো ফলন দিতে সক্ষম। আরেকটি সম্ভাবনাময় ধান জাত হলো ব্রি ধান-১০৮, যার জীবনকাল প্রায় ১৪৯ থেকে ১৫১ দিন। এই ধান জাতের গাছ শক্ত হওয়ায় সহজে হেলে পড়েনা এবং রোগবালাইয়ের আক্রমণও তুলনামূলকভাবে কম হয়। ফলে কৃষকেরা নিরাপদে ভালো ফলন পেতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে প্রদর্শনী প্লটে অংশগ্রহণকারী একজন কৃষক জানান, আগে তারা মূলত প্রচলিত ধান জাতের ওপর নির্ভর করতেন। কিন্তু সেই ধান অনেক সময় আগাম বন্যার কারণে নষ্ট হয়ে যেত। এখন নতুন ধানের জাত চাষ করে তারা একারণে আশাবাদী হচ্ছেন- যে সময়মতো ধান কাটতে পারবেন এবং ভালো ফলন পাবেন।
আরেকজন কৃষক বলেন, প্রকল্পের মাধ্যমে তারা অনেক নতুন বিষয় শিখতে পেরেছেন। সঠিক সময়ে চারা রোপণ, সুষম সার প্রয়োগ এবং জমির যতœ নেওয়ার ফলে ধানের গাছ সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে। এতে তারা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এ ধরনের ধান চাষ করতে আগ্রহী হচ্ছেন।
এসেড হবিগঞ্জের কর্মকর্তারা জানান, হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য বন্যাসহনশীল ও স্বল্প জীবনকালীন ধান জাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই অঞ্চলে ধান চাষের সময়সীমা তুলনামূলকভাবে কম। তাই এমন ধান জাত প্রয়োজন, যা দ্রুত পরিপক্ব হবে এবং আগাম বন্যার আগেই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হবে। এনরিচ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের শুধু বীজ প্রদানই করা হয়নি; বরং তাদেরকে নিয়মিত প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং মাঠ পর্যায়ের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে কৃষকেরা ধীরে ধীরে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রদর্শনী প্লটগুলো পুরো এলাকার কৃষকদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে। স্থানীয় কৃষকেরা এসব প্লট দেখে সহজেই বুঝতে পারছেন উন্নত ধান জাতের সম্ভাবনা কতটা বেশি। ফলে আগামী মৌসুমে আরও অনেক কৃষক এ ধরনের ধান চাষে আগ্রহী হবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।
বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যার ঝুঁকি আরও বেশি। তাই কৃষকদের অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে উন্নত ও সহনশীল ফসলের জাত ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি।
এই ৮টি প্রদর্শনী প্লট সেই অভিযোজন প্রচেষ্টার একটি বাস্তব উদাহরণ। এখানে কৃষকেরা শুধু নতুন ধানের জাত সম্পর্কে জানছেন না, বরং নিজেরাই তা চাষ করে বাস্তব ফলাফল দেখতে পাচ্ছেন। এতে তাদের মধ্যে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের মানসিকতাও তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতে যদি এ ধরনের উদ্যোগ আরও বিস্তৃতভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা আগাম বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা করে নিরাপদে ফসল উৎপাদন করতে পারবেন। এতে কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটবে।



