গবেষণায় বড় বড় পোল্ট্রি কোম্পানিগুলির অর্থ ব্যয় করা উচিত -অধ্যাপক ড. এমদাদুল হক চৌধুরী

আগামী ১৬-১৮ মার্চ রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হবে তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক পোলট্রি শো বা মেলা। পোলট্রি মেলা উপলক্ষ্যে আয়োজন করা হয়েছে দু’দিনব্যাপী টেকনিক্যাল সেমিনার; যার আহ্বায়ক বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক . এমদাদুল হক চৌধুরী। আসছে সেমিনার, গবেষণা, ব্রিডিং, সমস্যা, সমাধানসহ বাংলাদেশ পোলট্রি সেক্টরের সমসাময়িক বিষয় নিয়ে এগ্রিনিউজ২৪.কম -এর সাথে কথা বলেছেন ড. চৌধুরী। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন এগ্রিনিউজ২৪.কম সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী মো. খোরশেদ আলম জুয়েল। সুপ্রিয় পাঠকদের উদ্দেশ্যে সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ এখানে তুলে ধরা হলো-

এগ্রিনিউজ২৪.কম: আন্তর্জাতিক পোলট্রি শো আয়োজনের আগে দু’দিন ব্যাপী টেকনিক্যাল সেমিনারের আয়োজন সম্পর্কে জানতে চাই?

অধ্যাপক . এমদাদুল হক চৌধুরী: ওয়াপসা-বিবি বা WPSA-BB (World Poultry Science Association-Bangladesh Branch) প্রতি দু’বছরে একবার আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি সেমিনার এবং শো এর আয়োজন করে। চলতি বছরের ১৪ ও ১৫ মার্চ, ঢাকা রেডিসন ব্লু হোটেলে দু’দিনের সেমিনার এবং ১৬ থেকে ১৮ মার্চ তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি শো বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারের অনুষ্ঠিত হবে।

এগ্রিনিউজ২৪.কম: “Tasty & Healthy Protein for All” স্লোগানটিকে এ বছরের মূল প্রতিপাদ্য করার কারণ কি? এই স্লোগানের মাধ্যমে উৎপাদক ও ভোক্তাদের আপনারা কি বার্তা পৌঁছে দিতে চান?

অধ্যাপক . এমদাদুল হক চৌধুরী: প্রথমত খাবার খাই আমরা ক্ষুধা নিবারণের জন্য। কিন্তু এখানে টেস্টেরও  একটি বিরাট গুরুত্ব রয়েছে। এক সময় আমাদের খাবার ছিল না, তাই খাবার হলেই চলতো। এখন আমাদের খাবার আছে। তাই টেস্টের বিষয়টাও অগ্রাধিকার পাচ্ছে। দ্বিতীয়ত খাবার খাই আমরা শরীর গঠনের জন্য। প্রোটিন শরীর গঠনের অন্যতম উপাদান। প্রোটিন হতে হবে আবার স্বাস্থ্যসম্মত; যেমন- প্রোটিনে ক্ষতিকারক এলডিএল কম থাকবে, প্রয়োজনীয় এইচডিএল বেশি থাকবে, ক্ষতিকারক কোন কিছু থাকবে না। সেই বিবেচনায় মুরগির মাংস ও ডিম   একটি অন্যতম উৎস । সেটাকে আরো উৎকৃষ্ট করা যায় যদি আমরা উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধির মেনে চলি। এই কারণেই এবারের সেমিনারে এ বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

এগ্রিনিউজ২৪.কম: আমরা জানি টেস্টি পোল্ট্রি উৎপাদনের ক্ষেত্রে এফসিআর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাছাড়া ব্রয়লার পালনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত বয়সও গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে আপনাদের স্লোগান বাস্তবায়ন কতটা জরুরি এবং সেটি কিভাবে সম্ভব বলে আপনারা মনে করেন?

অধ্যাপক . এমদাদুল হক চৌধুরী: যে কোন খাদ্যের স্বাদ এবং নিরাপদ -এর ক্ষেত্রে ভোক্তা কখনো কম্প্রোমাইজ করেন না। তাই এর বিপরীতে যাওয়ার কোন সুযোগ নাই। যদি যাই তাহলে ভোক্তা বিকল্প রাস্তা খুঁজবে। এতে ভোক্তা এবং প্রডিউসার উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমি মনে করি এফসিআর ঠিক রেখেও নিরাপদ পোলট্রি উৎপাদন সম্ভব। বয়সের কথা বলছেন, এ বিষয়ে আমাদের পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রির লিডারদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ব্রয়লার মুরগি একটু বেশি বয়সে বাজারজাত করলে স্বাদ বাড়বে। এ বিষয়ে সঠিক জেনেটিক্স একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্লো গ্রোয়িং ব্রয়লার হতে পারে একটি বিকল্প উপায়। তবে, এ বিষয়ে আরো আলোচনার প্রয়োজন আছে। লাভের চেয়ে বিজ্ঞানকে সবার উপরে স্থান দিতে হবে। ভোক্তার পছন্দকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

এগ্রিনিউজ২৪.কম: অভিযোগ আছে কিছু খামারি, অসৎ ডিলার এবং কোম্পানির অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে ফিডের স্ট্যান্ডার্ড মান বজায় রাখা বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে । এক্ষেত্রে করণীয় কি আছে বলে আপনি মনে করেন?

অধ্যাপক . এমদাদুল হক চৌধুরী: প্রথমত প্রাণিসম্পদ বিভাগের রেগুলেটরি ভেটেরিনারি  সার্ভিস জোরদার করতে হবে। তাদের যথেষ্ট আইন আছে। কিন্তু প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের যথেষ্ট জনবল নেই। তাদেরকে জনবল দিতে হবে, সাথে বিচারিক ক্ষমতা প্রদান বা ব্যবস্থাপনা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, পোল্ট্রি প্রফেশনাল এসোসিয়েশনগুলো সম্মিলিতভাবে জোরালো ভূমিকা পালন করতে পারে। ফিড উপকরণ পরীক্ষার ব্যবস্থা বাড়াতে হবে এবং মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

এগ্রিনিউজ২৪.কম: ফিরে আসি আবার সেমিনার প্রসঙ্গে। আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি মেলার সাথে সম্ভবত গেল বছর থেকে আলাদাভাবে টেকনিক্যাল সেমিনার যুক্ত হয়েছে। প্রান্তিক খামারি পর্যায়ে এ ধরনের সেমিনার কতটুকু প্রভাব ফেলবে বলে আপনি মনে করেন?

অধ্যাপক . এমদাদুল হক চৌধুরী: পোল্ট্রি  মেলার সাথে সেমিনার সেই ২০০৮ সন থেকেই যুক্ত হয়েছে। আমাদের টেকনিক্যাল সেমিনারের উদ্দেশ্য হচ্ছে- প্রান্তিক পর্যায়ে যে সমস্ত ভেটেরিনারিয়ান বা পশু পালনের স্নাতক বা সমপর্যায়ে স্নাতকরা কাজ করেন তাদেরকে সমসাময়িক টেকনোলজি দ্বারা বা নতুন উদ্ভাবিত জ্ঞান দ্বারা সমৃদ্ধ করা। যেহেতু এরা প্রান্তিক পর্যায়ে কাজ করে তাই তাদের আহরিত নতুন জ্ঞান কাজের উৎকর্ষতা বাড়াবে এবং খামারি  উপকৃত হবে। তাছাড়া বিজ্ঞানীরা ও একে অপরের সাথে আলাপ আলোচনায় নতুন গবেষণার ক্ষেত্র পাবে।

এগ্রিনিউজ২৪.কম: কৃষিতে বিজ্ঞানের মূল বিষয় হচ্ছে গবেষণা এবং সম্প্রসারণ। আপনি কি মনে করেন পোল্ট্রি সংক্রান্ত গবেষণা মাঠ পর্যায়ে সঠিকভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে?  না হয়ে থাকলে কারণ কি?

অধ্যাপক . এমদাদুল হক চৌধুরী: বলা খুব কঠিন। তবে আমার ধারণা হচ্ছে- না। প্রধান কারণ মনে হয়- আমরা গবেষকরা গবেষণা কেবলই আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশ করে থাকি। যা কিনা খামারি বা পলিসি মেকার বা সংশ্লিষ্টদের নজরে আসে না। আমরা মনে হয় গবেষকদের বেশি বেশি করে তাদের গবেষণার ফলাফল পপুলার মিডিয়াতে লেখা দরকার আছে। পলিসি মেকারদের দৃষ্টিতে যদি আমাদের গবেষণার ফলাফল না আসে, তবে তা কখনোই কৌশল পত্রে যোগ হয় না। সরকারের সাহায্য ছাড়া সম্প্রসারণ সম্ভব না।

এগ্রিনিউজ২৪.কম: উৎপাদন বিনিয়োগ বা কর্মসংস্থানের বিবেচনায় পোলট্রি শিল্প বিগত দুই দশকে অনেক দূর এগিয়েছে। এতকিছুর পরও ৫০ বছরেও আমাদের পোল্ট্রি ব্রীড সম্পূর্ণ বিদেশ নির্ভর কেন?

অধ্যাপক . এমদাদুল হক চৌধুরী: এখনো জেনেটিক্স এবং ব্রিডিং রিসার্চে আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা সেই পুরানো ধাঁচের  ক্রস ব্রিডিং পদ্ধতি নিয়েই পড়ে আছে। এখন অনেক নতুন নতুন প্রযুক্তি আছে। সেগুলো আমাদের দেশে ব্যবহার করা উচিত। বিশেষ করে আমাদের প্রাণি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন জাত উদ্ভাবন করবে -এটা জাতি আশা করতেই পারে। জেনেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজি ব্যবহার করা গেলে নতুন জাত উদ্ভাবন সম্ভব। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) বিজ্ঞানীদের গতানুগতিক গবেষণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শস্য উৎপাদনে অনেক আধুনিক জাত আছে। আমরা কেন পারি না?

এগ্রিনিউজ২৪.কম: বিএলআরআই  ছাড়াও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মুরগির কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে বলে আমরা জানি। উদ্ভাবিত জাতগুলো কেন নিজ দেশে কেন কোন স্বতন্ত্র কিংবা শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি বলে আপনি মনে করেন?

অধ্যাপক . এমদাদুল হক চৌধুরী: এ বিষয়ে বিএলআরআই  বা বাকৃবির সংশ্লিষ্ট গবেষকগণ ভালো বলতে পারবেন বলে আমি মনে করি। তবে অবশ্যই ঘাটতি আছে। আর ঘাটতি আছে বলেই বিদেশী জাতের সাথে আমাদের উদ্ভাবিত জাতগুলো পেরে উঠছে না। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে অবশ্যই উৎপাদনে ভালো করতে হবে।

এগ্রিনিউজ২৪.কম: সেইফ বা নিরাপদ পোল্ট্রি উৎপাদনের ক্ষেত্রে সরকার নিষিদ্ধ এন্টিবায়োটিকের যত্রতত্র ব্যবহার একটা গুরুত্বপূর্ণ বাঁধা। দেশে নামে বেনামে পোলট্রিতে নিষিদ্ধ এন্টিবায়োটিকের উৎপাদন, আমদানি বিক্রয় ও ব্যবহার সবই হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে বলে আপনি মনে করেন?

অধ্যাপক . এমদাদুল হক চৌধুরী: যেকোনো মূল্যে এন্টিবায়োটিক এর অপব্যবহার আমাদের বন্ধ করতেই হবে। এক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদ বিভাগের রেগুলেটরি ভুমিকা আরো জোরদার করণে যা কিছু করা দরকার আমাদের করতে হবে। নিবন্ধন যুক্ত ভেটেরিনারিয়ানদের  প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনভাবেই এন্টিবায়োটিক বিক্রি বা ব্যবহার করা যাবে না। অবৈধভাবে উৎপাদন বা বিপনন আইনিভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে এবং শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আমাদের সকল স্তরে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। বেসরকারি এসোসিয়েশনগুলোকেও সরকারকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করতে হবে।

এগ্রিনিউজ২৪.কম:  সেমিনারে উপস্থাপিত গবেষণাগুলোর সারাংশ বা মূল বক্তব্ গুলো সরকারের নজরে আনার জন্য কোন পরিকল্পনা আছে কি? তাছাড়া পোল্ট্রি সেক্টরে গবেষণার জায়গাগুলোতে সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের আরো কি কি সহযোগিতা প্রয়োজন আছে বলে আপনি মনে করেন?

অধ্যাপক . এমদাদুল হক চৌধুরী: আপাতত সেমিনারে উপস্থাপিত প্রবন্ধগুলোর মূল বক্তব্যগুলো আমরা লিপিবদ্ধ করে রাখবো। পরে আমরা ওয়াপসা-বিবি এবং বিপিআইসিসি’র সাথে বসে ঠিক করবো কিভাবে সরকারের নজরে আনা যায়। তবে আমি মনে করি, আপনারা মিডিয়া ব্যক্তিত্ব যারা সেখানে উপস্থিত থাকবেন, তারাও আপনাদের লিখনীর মাধ্যমে সরকারের নজরে আনতে পারেন। গবেষণার ক্ষেত্রে সরকারের বরাদ্দ আরো বেশি বাড়ানো উচিত। বিদেশে বেসরকারি কোম্পানি গবেষণায় অনেক অর্থ ব্যয় করে থাকেন। আমাদের দেশে এখনো তেমনটা দেখা যাচ্ছে না। বড় বড় পোল্ট্রি কোম্পানিগুলির গবেষণায় অর্থ ব্যয় করা উচিত। প্রযুক্তি উদ্ভাবনে তাদেরও দায়িত্ব আছে। প্রযুক্তি তারাইতো ব্যবহার করবে।

এগ্রিনিউজ২৪.কম:  মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

অধ্যাপক . এমদাদুল হক চৌধুরী: আপনাকেও ধন্যবাদ।

This post has already been read 2314 times!