Wednesday 28th of February 2024
Home / সাক্ষাৎকার / পোল্ট্রি বিষয়ক জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সম্মিলন ঘটিয়েছে ‘আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি শো ও সেমিনার’-মসিউর রহমান

পোল্ট্রি বিষয়ক জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সম্মিলন ঘটিয়েছে ‘আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি শো ও সেমিনার’-মসিউর রহমান

Published at ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৩

জনাব মসিউর রহমান- বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) এবং পোলট্রি সায়েন্স এসোসিয়েশন -বাংলাদেশ শাখা (ওয়াপসা-বিবি) এর সভাপতি। এছাড়াও তিনি ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশন বাংলাদেশ(ফিআব) ও ব্রিডার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (বিএবি) -এর সাবেক সভাপতি। প্রায় ৩০ বছর ধরে পোলট্রি ব্যবসার সাথে জড়িত জনাব মসিউর একাধারে একজন সফল উদ্যোক্তা ও সংগঠক।

বিপিআইসিসি এবং ওয়াপসা-বিব ‘র যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত আগামী ১৬-১৮ মার্চ (তিন দিনব্যাপী) অনুষ্ঠেয় “International Poultry Show & Seminar -2023” তিনি আহ্বায়ক। আন্তর্জাতিক পোলট্রি শো ও সেমিনারের আয়োজন সহ দেশের পোলট্রি শিল্পের নানান খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন এগ্রিনিউজ২৪.কম এর সাথে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এগ্রিনিউজ২৪.কম এর সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী মো. খোরশেদ আলম জুয়েল, ক্যামেরায় ছিলেন সাব্বির আহমেদ তুহিন। দেশের পোলট্রি শিল্পের এই জীবন্ত কিংবদন্তীর সাথে সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ সম্মানিত পাঠকদের উদ্দেশ্যে এখানে তুলে ধরা হলো-

এগ্রিনিউজ২৪.কম: আন্তর্জাতিক পোলট্রি শো ও সেমিনারের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে জানতে চাই?

মসিউর রহমান: এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- পোল্ট্রি শিল্পের সাথে জড়িত সকল খামারি ও উৎপাদনকারি, বিনিয়োগকারি, ক্রেতা ও বিক্রেতা, পোল্ট্রি বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞ এবং সম্ভাব্য সকল স্টেকহোল্ডারদের একত্রিত করে আধুনিক ও যুগোপযোগী ধ্যান-ধারনা একে অন্যের সাথে আদান-প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করা।

উন্নত বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পও যেন এগিয়ে যেতে পারে; সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত ও নিরাপদ পোল্ট্রি ও প্রোটিন বাংলাদেশের মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে পারে; রপ্তানি বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারে- সেজন্য আধুনিক বিশ্বের সর্বাধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বাংলাদেশের খামারিদের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দেয়াই আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি শো ও সেমিনারের মূল লক্ষ্য।

এগ্রিনিউজ২৪.কম: আগামী ১৬-১৮ মার্চ অনুষ্ঠেয় পোলট্রি শো’র এর মূল থিম কি এবং কেন সেটিকে আপনারা বেঁছে নিলেন?

মসিউর রহমান: ১২তম পোল্ট্রি শো ও সেমিনারের এবারের থিম হচ্ছে: ”Tasty and Healthy Protein for All”. একেবারে শুরুর দিকে পোল্ট্রি’র ডিম ও মাংস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে নানান দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল। এতটুকু মুরগি কিভাবে এত বড় হয়? এ মুরগি খাওয়া ঠিক হবে কীনা? এমন নানান প্রশ্ন ছিল। আমরা দীর্ঘকাল যাবৎ দেশী মুরগি দেখে এবং খেয়ে অভ্যস্ত ছিলাম। পোল্ট্রি সেই প্রচলিত ধারায় পরিবর্তন এনেছে। এখন অবশ্য সে ধরনের প্রশ্ন নেই বলা যায়; তবে ব্রয়লার মাংসের স্বাদ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এটিই এখন পোল্ট্রি শিল্পের জন্য নতুন একটি চ্যালেঞ্জ। মূলত: সে কারণেই ব্রয়লার মাংসের স্বাদ, গুণগত মানের উন্নয়ন ও নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনকে এবার অধিকতর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

এগ্রিনিউজ২৪.কম: ব্রয়লার মাংসের স্বাদের প্রশ্নটা উঠার কারণ এবং এ থেকে উত্তরণের উপায় কি বলে আপনি মনে করেন?

মসিউর রহমান: এক্ষেত্রে খামারি এবং ভোক্তা উভয়কেই সচেতন হতে হবে। বিষয়টি বুঝানোর জন্য আপনাকে একটি উদাহরণ দিচ্ছি। ধরুন, কোরবানির গরু যখন আমরা কিনতে যাই তখন সেটির অন্তত দুটি দাঁত উঠেছে কি না, সেটি নিশ্চিত হই। কারণ, এটি ব্যাতীত কোরবানি হালাল হবে না। এখানে মূল বিষয় হলো গরুর ম্যাচিউরিটি নিশ্চিত হওয়া। উপযুক্ত বয়স না হলে কোরবানি যেমন হালাল হবে না, তেমনি গরুর মাংসের প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যাবে না। গরুর মতো মুরগিরর একটা ম্যাচিউরিটির বিষয় থাকে, যেটি না হলে সেটির প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায় না। আমরা এ বিষয়টি ভুলে গেছি, আমরা যুদ্ধে নেমেছি কে কত এফসিআর (FCR) করা যাবে, যে যুদ্ধটা মোটেই সঠিক না।

ব্রয়লার মুরগির মাংসের প্রকৃত স্বাদ ও গন্ধ পেতে হলে সেটিকে অবশ্যই কমপক্ষে ৩৫ দিন পালন করতে হবে। কারণ,  এর আগে মাংসের ফাইবারগুলোও সেভাবে তৈরি হয় না, মাংস পানি পানি ও বেস্বাদ লাগে। এছাড়াও মুরগির ওজন যদি কমপক্ষে ১৮০০ গ্রাম না হয়, তাহলে চিকেন ফ্লেবার আসে না, যার জন্য মুরগি খেয়ে মজা পাওয়া যায় না। এজন্য ভোক্তাদের প্রতি আমাদের পরামর্শ হলো- প্রায় দুই কেজি বা তারচেয়ে বেশি ওজনের ব্রয়লার মুরগি যেন তারা ক্রয় করেন এবং খামারিদের প্রতি আহ্বান থাকবে তারা যেন মিনিমাম ৩৩-৩৫দিন পালনের পর ব্রয়লার মুরগি বিক্রি করেন। ভোক্তারা যেন ব্রয়লার মুরগির স্বাদ ও গুণাগুণ নিয়ে প্রশ্ন না তুলতে পারেন, সে রকম একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ফার্মিং করতে হবে।

এগ্রিনিউজ২৪.কম: এফসিআর সংক্রান্ত যে যুদ্ধটা শুরু হয়েছে সেটি থেকে বের হওয়ার জন্য আপনাদের সংগঠনগুলো কি কাজ করছে বা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে?

মসিউর রহমান: আমরা কয়েক বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। বিভিন্ন, সভা, সেমিনার এবং মিটিংয়ে ব্রয়লার মুরগির মিনিমাম বয়স এবং ওজন নিয়ে আমরা কথা বলছি। এর ফলে বাজারে আপনি এখন ২ কেজি বা তারচেয়েও অধিক ওজনের ব্রয়লার মুরগি বেশি দেখতে পাবেন। যে মুরগি এক সময় আমরা ২৭-২৮ দিন বয়সেই বিক্রি করে দিতাম, সেটিকে এখন আমরা ৩৩-৩৫ দিনে নিয়ে গেছি। ভোক্তা এবং উৎপাদক উভয় পক্ষকেই আমরা সচেতন করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। স্বাদের পাশাপাশি নিরাপদ পোলট্রি পোলট্রি পণ্য উৎপাদনকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।

এগ্রিনিউজ২৪.কম: এই ধরনের শো এবং সেমিনার দেশের পোলট্রি সেক্টরের টেকসই উন্নয়নে কতটুকু ভূমিকা রাখছে বলে আপনি মনে করেন?

মসিউর রহমান: পোল্ট্রি একটি শিল্প, একটি বিজ্ঞান। এ ব্যবসায় তিনিই সফল হবেন- যাঁর পোল্ট্রি সম্পর্কে আধুনিক জ্ঞান রয়েছে এবং পোল্ট্রি প্রযুক্তিকে যিনি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেন। শুরুর দিকে আমাদের কাছে জ্ঞান কিংবা প্রযুক্তি কোনটাই সহজলভ্য ছিল না কিংবা বলা যায় হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন এ সম্পর্কে জানতেন। এখন যারা বড় আকারের বিনিয়োগ করেছেন, শুরুতে অর্থ খরচ করে তাঁদের বিদেশের বিভিন্ন শো এবং সেমিনারে অংশ নিতে হয়েছে। তাঁরা দেখেছেন পোল্ট্রি দুনিয়া কিভাবে এগিয়ে চলেছে। তাঁরা বুঝেছেন, অত্যাধিক জনসংখ্যার ছোট আয়তনের বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে হলে পোল্ট্রি শিল্পের কোন বিকল্প নাই। তাঁরা নিজেরা খামার ও শিল্প কারখানা গড়েছেন। কিন্তু একই সাথে সারাদেশের খামারিদের মাঝে এই বিশেষায়িত জ্ঞান ছড়িয়ে দেয়ার তাগিদ অনুভব করেছেন। উপলব্ধি করেছেন- সুলভ মূল্যে ডিম ও মুরগির মাংসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে প্রযুক্তি ব্যবহারের কোন বিকল্প নেই। মূলত: সেই তাগিদ থেকেই আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি শো ও সেমিনারের আয়োজন।

পোল্ট্রি বিষয়ক জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সম্মিলন ঘটিয়েছে ‘আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি শো ও সেমিনার’। পুষ্টি ও প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনে পোল্ট্রি শিল্প বাংলাদেশে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে। এ বিশাল অর্জনকে সহজতর করে দিয়েছে পোল্ট্রি শো। দেশে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৪ কোটি থেকে ৫ কোটি ডিম এবং সরকারি হিসাবে দৈনিক প্রায় ১০,২৭৩ মেট্রিক টন  পোল্ট্রি মুরগির মাংস উৎপাদিত হচ্ছে। শুরু হয়েছে প্রসেসড এবং ফারদার প্রসেসড চিকেন প্রোডাক্ট তৈরি। এর পাশাপাশি বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে উৎপাদিত হচ্ছে বায়োগ্যাস, জৈবসার এবং বিদ্যুৎ। শুধু তাই নয়, ২০১৯ সন থেকে বাংলাদেশের পোল্ট্রি ও ফিস ফিড রপ্তানি হচ্ছে। পোল্ট্রি মাংস ও মাংসজাত পণ্য তৈরির জন্যও প্রস্তুতি চলছে। আজকের এই অর্জনকে সহজ ও সম্ভব করেছে পোল্ট্রি শো।

শুধু প্রযুক্তি নয় বিভিন্ন ধরনের রোগ-বালাইয়ের কার্যকর চিকিৎসা এবং ঔষধ আবিষ্কার হচ্ছে। তবুও থেমে নেই নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব। বৈষ্ণিক উষ্ণতা ও জলবায়ুর পরিবর্তন- প্রকৃতি ও পরিবেশের পাশাপাশি পোল্ট্রি’কেও নানাভাবে আক্রান্ত করেছে। কী হবে আগামী দিনের পোল্ট্রি শিল্পের রূপরেখা? এসব বিষয় নিয়ে বিশ্বব্যাপী চলছে পঠন-পাঠন ও গবেষণা। সারাবিশ্বের এসব গবেষণাকর্ম ও গবেষকদের একই সূতোয় গেঁথেছে পোল্ট্রি সেমিনার। তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক জ্ঞান ও বিজ্ঞানকে একই ছাদের নিচে সকলের জন্য উন্মুক্ত করার এ উদ্যোগটিই বোধ করি ওয়াপসা-বিবি আয়োজিত আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি শো ও সেমিনারের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য। সেমিনার থেকে আগামী দিনের পোল্ট্রি শিল্পের জন্য কী ধরনের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ হাতিছানি দিচ্ছে সে সম্পর্কে এক ধরনের গাইডলাইন পাওয়া যায়। আর শো’তে দেখা মেলে আধুনিক পোল্ট্রি শিল্পের সর্বশেষ ও চৌকষ প্রযুক্তি ও তার ব্যবহারিক প্রায়োগের নানান উপকরণ- যা এদেশের খামারি ও উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বড় পাওয়া। সে বিচারে বলা যায়- দেশের পোল্ট্রি শিল্পের উন্নয়নে ওয়াপসা-বিবি আয়োজিত পোল্ট্রি শো ও সেমিনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

এগ্রিনিউজ২৪.কম: প্রান্তিক খামারিদের জন্য এবারের শো’তে বিশেষ কোন আয়োজন থাকছে কি?

মসিউর রহমান: বর্তমান সময়ে প্রান্তিক খামারিদের জন্য সবচেয়ে বেশি দরকারি বিষয়টি হচ্ছে- উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনা। কিভাবে এ খরচ কমানো যায় সেটা আমাদেরও বিবেচ্য বিষয়। সাধ্যের মধ্যে থেকেও কিভাবে প্রযুক্তিগত সহায়তা নেয়া যেতে পারে; খামার ব্যবস্থাপনার উন্নতি ঘটিয়ে কিভাবে রোগ-বালাই এবং ওষুধের লোড কমানো যেতে পারে সে লক্ষ্যে এবারের শো ও সেমিনারে বিভিন্ন আয়োজন আছে। খামারিদের সনাতন ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং খামারের আকার অবশ্যই বাড়াতে হবে।

এগ্রিনিউজ২৪.কম: আপনি বলেছেন ‘খামারের আকার অবশ্যই বাড়াতে হবে’। এখানে কিন্তু খামারিদের সামর্থ্যের একটি প্রশ্ন এসে যায়, এক্ষেত্রে তারা কি করবেন?

মসিউর রহমান: আমাদের দেশের অনেক খামারিদের দেখা যায় তারা একই বাড়িতে আলাদা আলাদা শেডে ভাগ ভাগ করে তিন বয়সের মুরগি রাখেন। এক্ষেত্রে তারা ওই তিনটি ফার্মের সমান একটি বড় করে শেড তৈরি করতে পারেন। মিক্স ফার্মিং করা যাবে না, এটি কখনোই ভালো না। একই ফার্মে অল ইন এবং অল আউট সিস্টেমে যেতে হবে; অর্থাৎ মুরগির বাচ্চা একইসঙ্গে উঠানো এবং উপযুক্ত বয়সে একইসঙ্গে সব বিক্রি করে দিতে হবে। এতে করে তার মেধা, শ্রম, সময়, খরচ সবই বাঁচবে; সেই সাথে মুরগির রোগ-বালাই কমে যাবে। খামারের আকার বড় করা মানে আমি এটিই বুঝিয়েছি। কারণ, বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের পোলট্রি ব্যবসায়ীদের মূল যুদ্ধটা হচ্ছে সঠিক পদ্ধতিতে উৎপাদন খরচ কমানো। আমাদের টিকে থাকতে হলে গুড প্র্যাক্টিসের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমিয়ে নিয়ে আসার বিকল্প নেই।

এগ্রিনিউজ২৪.কম: বিগত বছরগুলোতে শো’তে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবং মার্চের শো তে আপনারা কেমন সংখ্যক ভিজিটর ও প্রতিষ্ঠান আশা করছেন?

মসিউর রহমান: বাংলাদেশে ১১তম পোল্ট্রি শো অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৯ সালে। সেখানে ২১টি দেশের ২০২টি কোম্পানী/প্রতিষ্ঠান এক্সিবিটর  হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিল। এর মধ্যে ১৩১টি দেশী কোম্পানীর ৪১৫টি স্টল এবং ৭১টি বিদেশী কোম্পানীর ২২৫টি স্টল অর্থাৎ সর্বমোট ৬৪০টি স্টল ছিল।

এ বছরের ১২তম পোল্ট্রি শো’তে ২০টি দেশের ১৬৯টি কোম্পানী/প্রতিষ্ঠান অংশ নিবে- যার মধ্যে ১২৬টি দেশী কোম্পানীর ৪৬৮টি স্টল এবং ৪৩টি বিদেশী কোম্পানীর ১২৩টি স্টলসহ সর্বমোট ৫৯১টি স্টল থাকবে। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে অন্যতম বৃহৎ একটি দেশ- চীন এবার মেলায় অংশগ্রহণ না করায় স্টলের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। তবে এখনও বিভিন্ন দেশ থেকে চাহিদা আসছে। আমরা তাঁদের জায়গা দেয়ার চেষ্টা করছি। গতবার যে পরিসর নিয়ে শো’র আয়োজন করা হয়েছিল এবারও সেই একই ভেন্যুতেই মেলা হচ্ছে।

এগ্রিনিউজ২৪.কম: আয়োজকদের পক্ষ থেকে শো তে দেশি-বিদেশী কোন পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে কি না এবং করলে তারা কারা এবং শোতে তাদের ভূমিকা কি থাকবে?

মসিউর রহমান: এবারের আন্তর্জাতিক সেমিনারে ১৩৯টি দেশী এবং ২৮টি বিদেশী অর্থাৎ মোট ১৬৭টি টেকনিক্যাল পেপার জমা পড়েছে। এর নির্বাচিত হয়েছে ৩১টি দেশী ও ৯টি বিদেশী পেপার। পোস্টার প্রদর্শণীর জন্য নির্বাচিত হয়েছে ৫২টি পেপার।

দেশী-বিদেশী প্রায় ১২০ জন পোল্ট্রি বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞ অংশগ্রহণ করবেন। এছাড়াও প্লেনারি সেশনে ১১জন বিশ্বসেরা বিজ্ঞানী ও গবেষক উপস্থিত থাকবেন।

এগ্রিনিউজ২৪.কম: ওয়াপসা-বিবি সংখ্যার দিক থেকেই কি কেবল বিশ্বের মধ্যে সর্ববৃহৎ নাকি এর গবেষণা ও অন্যান্য কার্যক্রমেও এগিয়ে রয়েছে?

মসিউর রহমান: সদস্য সংখ্যার বিচারে ওয়াপসা-বাংলাদেশ শাখা বিগত কয়েক বছর ধরেই প্রথম স্থান অধিকার করে আছে। তবে আমরা জ্ঞান ও বিজ্ঞান চর্চাতেও এগিয়ে থাকতে চাই। সে লক্ষ্যে আমরা “ওয়াপসা-বিবি রিসার্চ গ্রান্ট” চালু করেছি। এ বছর থেকেই পোল্ট্রি মাংস, ডিম, ফিড, রোগ-বালাই, জীবনিরাপত্তা, খামার ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং, ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণার জন্য ৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি থেকে ১জন এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও পটুয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২জন করে মোট ১০ জন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী-গবেষকদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকার বৃত্তি প্রদান করা হবে। প্রতিবছরই এ বৃত্তি প্রদান করা হবে এবং পর্যায়ক্রমে পরিধি আরো বাড়ানো হবে।

আমরা গত ১০ ও ১১ জুন ২০২২ তারিখে ঢাকায় দু’দিনব্যাপী একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন করেছি, তাছাড়া ৩ জুলাই ২০২২ তারিখে “নিরাপদ ও টেকসই পোল্ট্রি উৎপাদন” বিষয়ে একটি নীতি-নির্ধারণী কর্মশালার আয়োজন করেছি। এছাড়াও পোল্ট্রি শিল্পের কেন্দ্রিয় সংগঠন বিপিআইসিসি’র সাথে যৌথ উদ্যোগে খামারি প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও বিপিআইসিসি’র সাথে যৌথ উদ্যোগে দেশব্যাপী বিশ্ব ডিম দিবস উদযাপন করছি। কাজেই এ কথা বলা যায় যে, ওয়াপসা-বাংলাদেশ শাখা পোল্ট্রি বিষয়ক গবেষণা, পঠন-পাঠনই কেবল নয় বরং পোল্ট্রি শিল্পের সার্বিক উন্নয়নের সাথেই জড়িত রয়েছে।

এগ্রিনিউজ২৪.কম: চলমান বৈশ্বিক আর্থিক মন্দা পরিস্থিতিতে শো’তে খামারিদের কেমন রেসপন্স আশা করছেন; এর কোন বিরুপ প্রভাব শো’তে পড়বে বলে কি আপনি মনে করেন?

মসিউর রহমান: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা শুধু বাংলাদেশ নয় বরং বিশ্বব্যাপী পোল্ট্রি শিল্পে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অত্যাশ্যকীয় কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে; প্রচুর খামার বন্ধ হয়ে গেছে; ব্রয়লার মুরগির চাহিদা ও উৎপাদন কমেছে। ফিডের উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গত বছরের মে মাস থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত উৎপাদন খরচেরও চেয়েও কম মূল্যে একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা বিক্রি করতে হয়েছে; ১৪৫-৫০ টাকা খরচে এক কেজি ব্রয়লার মুরগি উৎপাদন করে মাত্র ১১০-১২০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে; ১০.৫০টাকায় ডিম উৎপাদন করে বিক্রি করতে হচ্ছে ৯.৫০ টাকা থেকে ১০টাকায়। লোকসানের কারণে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও নাজুক, কাজেই ছোট খামারিদের অবস্থা যে কী তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

তবে আশা নিয়ে বাঁচতে হবে। দেশের মানুষকে সাশ্রয়ী মূল্যে প্রোটিন সরবরাহ করতে হবে; দেশ থেকে অপুষ্টির অভিশাপ দূর করতে হবে। ২০৩১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ Upper Middle Income Country স্ট্যাটাস অর্জনের প্রত্যাশা করছে। ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আর সে লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই হবে। আমরা আশাকরছি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা কেটে যাবে এবং পোল্ট্রি শিল্প আবারও গতি ফিরে পাবে। খামারিদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ স্বল্প খরচে মানসম্মত ডিম ও মাংস উৎপাদন করা। আর এ অংশটিতে খামারি ও উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিতেই আমাদের আয়োজন।

এ বছর আমাদের শো’তে প্রায় ২০টি দেশ থেকে মোট প্রায় ১৫৫টি এক্সিবিটর থাকবেন, স্টলের সংখ্যা প্রায় ৬০০টি। কাজেই বলা যেতেই পারে- এবারের রেসপন্স কমবে না বরং বাড়বে।

এগ্রিনিউজ২৪.কম: এন্টিবায়োটিক এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আপনাদের মতো শিল্পোদ্যোক্তাগণ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও এখন অনেক বেশি সচেতন, এ ব্যাপারে আপনাদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাগুলো জানতে চাই।

মসিউর রহমান: এন্টিবায়োটিকের বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশে এখন প্রিবায়োটিক, প্রোবায়োটিক ও এসেনশিয়াল অয়েল প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়াও বেশ কিছু হারবাল প্রোডাক্টের ব্যবহারও বাড়ছে। এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার খামারির জন্য লাভজনক তো নয়ই বরং ক্ষতিকারক। এন্টিবায়োটিকের যে দাম; তা খামারির লাভের টাকা খেয়ে ফেলে। সে কারণেই আমাদেরকে টেকসই পোল্ট্রি পালনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

আমাদের দেশে খামার ব্যবস্থাপনার উন্নতি হয়েছে। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পোল্ট্রি উৎপাদনের স্বার্থে এনভায়রনমেন্টালি কন্ট্রোল্ড হাউসেও বাণিজ্যিক ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগি পালন করা হচ্ছে। তবে এখনও প্রচুর সংখ্যক খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আশানুরূপ নয়। যেখানে সেখানে খামার গড়ে তোলা হচ্ছে, পোল্ট্রি নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়ন হচ্ছে না। রোগাক্রান্ত মৃত মুরগি ও মুরগির বিষ্ঠা খামারের আশেপাশের খোলা জায়গায় কিংবা পুকুর ডোবায় ফেলে দেয়া হচ্ছে। এতে রোগ-জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে; আশেপাশের খামার আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে ওষুধের অযাচিত ব্যবহার হচ্ছে। সে কারণেই ওয়াপসা-বিবি এবং বিপিআইসিসি থেকে আমরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং এর ওপর জোর দিচ্ছি। সরকারকে আমরা বলেছি- বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঠিক পরিকল্পনা না থাকলে কোন খামারকে যেন রেজিস্ট্রেশন না দেয়া হয়। বড় খামারগুলোর ক্ষেত্রে বায়োগ্যাস প্লান্ট বাধ্যতামূলক করার সুপারিশও করা হয়েছে। খামারিদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সত্যি কথা বলতে- খুব সাধারণ কিছু নিয়ম মেনে খামার করলে ছোট খামারেও এন্টিবায়োটিক রেসিডিউমুক্ত ডিম ও মাংস উৎপাদন সম্ভব এবং সেটি হচ্ছেও।

এগ্রিনিউজ২৪.কম: মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

মসিউর রহমান: আপনাকেও ধন্যবাদ।

This post has already been read 2822 times!