Thursday 1st of December 2022
Home / ফসল / খরচ কম, লাভ বেশি সরিষার আবাদ বৃদ্ধি

খরচ কম, লাভ বেশি সরিষার আবাদ বৃদ্ধি

Published at নভেম্বর ১৭, ২০২২

কৃষিবিদ মো. আব্দুল্লাহ-হিল-কাফি : মাননীয় কৃষিমন্ত্রী কৃষিবিদ ডক্টর আব্দুর রাজ্জাক জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানির জন্য গত অর্থবছর দেশে ৮১ বিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। আর ভোজ্যতেলের জন্য অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে আড়াই বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে ভোজ্যতেলের চাহিদার মাত্র ১০-১৫ শতাংশ দেশীয় উৎস থেকে পূরণ হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিদেশ থেকে আনা ভোজ্যতেলের ওপর চাহিদা কমাতে আগামীতে দেশে সরিষার উৎপাদন বর্তমানের ১০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধবনীতি ও নানামুখী প্রণোদনার ফলে বিগত ১২ বছরে দেশে তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তারপরও ভোজ্যতেলের বেশিরভাগ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় এবং এর পিছনে ২.৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। ইতোমধ্যে আমাদের বিজ্ঞানীরা উচ্চফলনশীল ও স্বল্পকালীন উন্নত জাতের ধান ও সরিষার জাত উদ্ভাবন করেছে। এগুলোর চাষ দ্রুত কৃষকের নিকট ছড়িয়ে দেওয়া ও জনপ্রিয় করতে পারলে ধান উৎপাদন বৃদ্ধি না কমিয়েও অতিরিক্ত ফসল হিসাবে সরিষাসহ তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়ান সম্ভব হবে।

২০০৯ সালে তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন, ২০২০-২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টনে। ব্রিধান-৭১, ব্রিধান ৮১, ব্রিধান৮৯, ব্রিধান ৯২সহ উন্নতজাতের ধান চাষ করে হেক্টর প্রতি এক টন উৎপাদন বাড়ান সম্ভব। এটি করতে পারলে ১০% জমি উদ্বৃত্ত থাকবে যাতে ধান চাষ না করে অন্যান্য ফসল চাষ করা যাবে। এছাড়া, উন্নত জাতের ধান ও সরিষার  চাষ করে শস্যের নিবিড়তা বাড়ানোও সম্ভব।

ইতিমধ্যে সরকার ২৭৮ কোটি টাকার ‘তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি’ প্রকল্প (২০২০-২০২৫ মেয়াদে) ২৫০টি উপজেলায় বাস্তবায়িত করছে। এর মাধ্যমে প্রচলিত শস্য বিন্যাসে কৃষিগবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিক্ষীত স্বল্পমেয়াদি তেল ফসলের আধুনিক জাত অন্তর্ভুক্ত করে সরিষা, তিল, সূর্যমুখী, চীনাবাদাম, সয়াবিনসহ তেল ফসলের আবাদ এলাকা ২০% বৃদ্ধি করা হবে। এছাড়া, বিএআরআই ও বিনা কর্তৃক উদ্ভাবিত তেল ফসলের আধুনিক প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং মৌ-চাষ অন্তর্ভুক্ত করে তেলজাতীয় ফসলের হেক্টর প্রতি ফলনও ১৫-২০% বৃদ্ধি পাবে। ফলে, তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়বে ও আমদানির পরিমাণ হ্রাস পাবে।

দেশে তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনের মূল সমস্যা হলো জমির স্বল্পতা। ধানসহ অন্যান্য ফসলের তুলনায় কৃষকেরা এ ফসল চাষে কম আগ্রহী। বর্তমানে দেশে ফসল আবাদের ৭৫% জমিতে দানাজাতীয় ফসলের চাষ হয়। অন্যদিকে ক্রমশ তেলের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সাধারনত: যে জমি আমন ধান কর্তনের পর পতিত থাকে এবং তারপর বোরো ধান করা হয়, সে সকল জমি সহজেই সরিষা চাষের আওতায় আনা যায়। তাই পহেলা আষাঢ় বা ১৫ ই জুনের মধ্যে আমন ধানের বীজতলা তৈরি করে ১৫ ই জুলাই বা পহেলা শ্রাবণের মধ্যে ধানের চারা রোপণ করলে উপযুক্ত সময়ে সরিষা চাষ করা যাবে। এক্ষেত্রে আমন ধানের উন্নত জাত গুলি হলো: ব্রিধান-৭১, ব্রিধান-৭৫, ব্রিধান-৮৭, ব্রিধান-৯৫, বিনা ধান-১৭, বিনা ধান-২২ এসব। আর সরিষার উন্নত জাত হলো: বারি সারিষা-১৪, বারি সারিষা-১৫, বারি সারিষা-১৭ এসব। স্বর্না বা ব্রিধান-৫১ জাত করলে জুনের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে বা জ্যৈষ্ঠের শেষে বীজতলা করে পহেলা শ্রাবণ বা জুলাই মাসের প্রথমেই আমন ধানের চারা রোপন করলেও সরিষা চাষ করা যাবে।

সরিষা আবাদের প্রধান প্রধান সমস্যা
১. দীর্ঘ জীবনকাল সম্পন্ন রোপা আমন ধানের আবাদ।
২. কর্তনের পর কর্তনকৃত ধান/ খড় জমিতেই শুকানোর প্রবণতা
৩. আমন ধান কর্তনের পর কর্তনকৃত ধান/ খড় জমিতেই শুকানোর প্রবণতা। আওয়র হিসেবে খড় সংগ্রহ করার জন্য কৃষকগণ ধান কর্তন কাজে কম্বাইন হারভেষ্টার বা মাড়াই যন্ত্র (পাওয়ার থ্রেসার) ব্যবহারে অনীহা।
৪. স্বল্প জীবন কালীন উচ্চ ফলনশীল রোপা আমন ধানের জাত এখনো কাংখিত মাত্রায় সম্প্রসারণ না হওয়া।
৫. খড়/বিচালীর দাম অনেক বেশি হওয়া ।
৬. স্বল্প জীবনকালীন উচ্চ ফলনশীল সরিষার বীজ সরবরাহ না থাকা।
৭. ভোজ্য তেল হিসেবে সরিষা ব্যবহারে জনগন অভ্যস্ত নয়।

রিলে ফসল হিসেবে আমন ধানের সাথে সরিষার  চাষ করে আবাদ বৃদ্ধি
এই ক্ষেত্রে আমন ধান কর্তনের দুই সপ্তাহ আগে সরিষার জন্য বেসাল ডেজে সার দিয়ে ৪-৫ দিন পর অর্থাৎ ধান কাটার ১০ দিন পূর্বে ধানের জমিতে বারি সরিষা ১৪ বা বারি সরিষা-১৭ জাতের বীজ বপন করতে হবে। যে সকল জমি আমন ধান কর্তনের পর ‘জো’ আসে না, জমিতে পানি জমে থাকে না কিন্তু কাদা ভাব থাকে সে সমস্ত জমিতে সরিষা চাষ না করে কয়েক মাস পতিত রেখে তারপর বোরো ধান চাষ করা হয়, সে সকল জমি রিলে পদ্ধতিতে সহজেই সরিষা চাষের আওতায় আনা যায়। রিলে বা সাথী পদ্ধতিতে ফসল চাষ করতে হলে খেয়াল রাখতে হবে যে, জমিতে যেন পানি জমে না থাকে এবং মাটি কাদা কাদা অবস্থায় থাকে।

ধান কাটার ১০-১৫ দিন পূর্বে সরিষা চাষের জন্য ধানের জমিতে সার ছিটিয়ে দিতে হবে। ছিটানো সারের পরিমাণ হলো: প্রতি শতকে টিএসপিঃ ৬০০-৭০০ গ্রাম, এমওপিঃ ৩৫০ গ্রাম, জিপসামঃ ৬০০-৭০০ গ্রাম, জিংক বা দস্তা সারঃ ২০-২৫ গ্রাম, বোরনঃ ৩০-৩৫ গ্রাম। সার ছিটিয়ে ৪-৫ দিন পর অর্থাৎ ধান কর্তনের ৮-১০ দিন পূর্বে আমন ধানের জমিতে বিঘা প্রতি ১ কেজি সরিষা বীজ ছিটিয়ে বপন করতে হবে। বীজ বপনের ৮-১০ দিন পর ধান কাটতে হবে। তবে ধান কাটার সময় যদি ধানের খড় ১২ ইঞ্চি উচু রেখে কাটা হয় তবে তা সরিসার বৃদ্ধির উপকার হবে। ধান কেটে তা বেশি দিন জমিতে না রেখে ২-৩ দিনের মধ্যে সরিয়ে ফেলতে হবে। এতে সরিষা গাছ পর্যাপ্ত আলো বাতাস পেয়ে পরিমিত খাদ্য তৈরি করতে পারবে।

কাটা ধান সরিয়ে নেবার পর অর্থাৎ ২-৩ দিন পর সরিষার জমিতে প্রতি শতকে ইউরিয়া ৩০০ গ্রাম হিসেবে ছিটিয়ে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। এক্ষেত্রে জমিতে রসের পরিমাণ কম থাকলে বিকেলে ইউরিয়া সার ছিটিয়ে দিতে হবে। গাছের বয়স ২৫-৩০ দিন হলে যদি জমিতে অতিরিক্ত ঘাস থাকে তবে নিড়ানি দিতে হবে। এরপর প্রতি শতকে ইউরিয়া ৩০০-৩৫০ গ্রাম উপরি প্রয়োগ করতে হবে এবং বাকি ইউরিয়া ফুল আসলে প্রতি শতকে ইউরিয়া ৩০০-৩৫০ গ্রাম উপরি প্রয়োগ করতে হবে। সার উপরি প্রয়োগের সময় জমিতে রস থাকা দরকার। প্রয়োজনে হালকা সেচ প্রদান করা যেতে পারে।

সরিষাতে তেমন রোগ ও পোকার আক্রমণ হয় না। তবে দেরিতে বুনলে জাব পোকার আক্রমণ হয়। আশ্বিনের শেষ ভাগ ও মধ্য-কার্তিক (অক্টোবর) অর্থাৎ আগাম সরিষা বপন করলে জাব পোকার আক্রমণের আশংকা কম থাকে। প্রতি গাছে ৫০ টির বেশি পোকা থাকলে ম্যালাথিয়ন-৫৭ ইসি বা সুমিথিয়ন-৫৭ ইসি বা ফলিথিয়ন-৫৭ ইসি বা একোথিয়ন-৫৭ ইসি, ডায়াজিনন ৬০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি হারে মিশিয়ে বিকালে স্প্রে করতে হবে।

৮০% সরিষা পেকে গেলে সকালের দিকে কর্তন করতে হবে। সরিষা কাটার পর জাগ দিয়ে রাখতে হবে। তারপর শুকিয়ে মাড়াই, ঝাড়াই ও শুকানো কাজ করতে হবে। এ পদ্ধতিতে চাষ করলে বিঘা প্রতি ৩-৪ মণ সরিষার ফলন পাওয়া যায়।

সাধারণত: এক কেজি সরিষা থেকে ৩৫০-৪০০ গ্রাম তেল উৎপাদন হয়, অর্থাৎ বোরো ধান চাষের আগে জমি পতিত না রেখে আমনের সাথে সরিষা রিলে আবাদ করে প্রতি বিঘায় প্রায় ৫০-৬০ কেজি তেল পাওয়া যায়। এতে করে একটি পরিবারে সারা বছরের তেলের চাহিদা পূরণ হবে।

কৃষি যন্ত্র ব্যবহার করে সরিষা আবাদ বৃদ্ধিতে কিছু করণীয়
রোপা আমন ধানের দানা ৮০-৯০% সোনালী রং ধারণ করলে কম্বাইন হারভেস্টারের মাধ্যমে আমন ধান কেটে ২-৩ দিনের মধ্যে জমিতে “জো” আসলে চাষ দিয়ে বারি সরিষা-১৮ জাতের সরিষা আবাদ করা হবে। এতে ১০-১৫ দিন সময় সাশ্রয় হবে এবং সরিষা আবাদের মৌসুম ধরা সম্ভব হবে। পরবর্তীতে সরিষা সংগ্রহের পর রাইস ট্রান্স প্লান্টার দ্বারা বোরো ধানের ব্রিধান-৮৯ জাত সহজে রোপণ করা যাবে।

জাত পরিবর্তন করে সরিষা আবাদ বৃদ্ধিতে কিছু করণীয়ঃ
টরি ৭, মাঘী, ডুপিসহ স্থানীয় জাতের পরিবর্তে উচ্চফলনশীল সরিষার জাতের পরিবর্তে বিনা-৪, ৯, বারি সরিষা-১৪ বা বারি সরিষা-১৭ জাত চাষ করুন। এতে ফলন বাড়ে এবং লাভবান হওয়া যায়।

আমনের জাত পরিবর্তন করে সরিষা আবাদ বৃদ্ধিতে কিছু করণীয়
১. ব্রিধান ৩৯ এর পরিবর্তে স্বল্প জীবনকালীন ধান ব্রিধান ৭৫ (জীবনকালঃ ১১৫ দিন) জাত চাষ করুন।
২. ব্রিধান- ৪৯ এর পরিরর্তে জীবনকালীন ধান ব্রিধান ৭৫ (জীবনকালঃ ১১৫ দিন) বা ব্রিধান ৮৭ (জীবনকালঃ ১২৭ দিন) বা বিনাধান ১৬/১৭/২২ (১১৫ দিন) জাত চাষ করুন।
৩. স্বর্ণা জাতের পরিবর্তে ব্রিধান-৭৫ বা ব্রিধান-৯৫ অথবা বিনাধান-১৬,১৭,১৯,২২ জাতের চাষ করুন।

শস্য বিন্যাস পরিবর্তন করে সরিষা আবাদ বৃদ্ধিতে কিছু করণীয়
১. রোপা আমন ধান -পতিত-বোরো ধান শস্যবিন্যাসকে রোপা আমন ধান-সরিষা-বোরে ধান শস্য বিন্যাসে রুপান্তর করুন।
২. বছরব্যাপি আখ শস্যবিন্যাসকে আখ + সরিষা শস্য বিন্যাসে রুপান্তর করুন।
৩. ফল বাগান শস্য বিন্যাসকে ফল বাগান + সরিষা শস্য বিন্যাসে রুপান্তর করুন।
৪. রোপা আমন-পতিত-পতিত শস্যবিন্যাসকে রোপা আমন-সরিষা-পতিত শস্য বিন্যাসে রুপান্তর করুন।
৫. পতিত-বোরো-পতিত শস্য বিন্যাসকে সরিষা-বোরো-পতিত শস্য বিন্যাসে রুপান্তর করুন।
৬. পতিত-বোরো-আউশ শস্য বিন্যাসকে সরিষা-বোরো-আউশ রুপান্তর করুন।

সরিষা আবাদ বৃদ্ধিতে কিছু আরোও  করণীয়
১. ভালো ফলনের জন্য সরিষার জমিতে বোরন ও জিপসাম সার ব্যবহার নিশ্চিত করা।
২. আমন ধান কর্তনের পর পর জো আসার অপেক্ষা না করে বিনা চাষে সরিষার বীজ বপন করতে হবে।
৩. ভোজ্য তেল হিসেবে সরিষা ব্যবহারে উৎসাহিত হতে হবে।
৪. সময়মত সরিষার বীজ বপন নিশ্চিত করা।

আসুন সরিষা আবাদ বৃদ্ধি করে দেশকে তেল ফসলে সমৃদ্ধ করি। সরিষা আবাদ করে তেলের ঘাটতি মেটাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বর্তমানে আবাদকৃত টরি-৭, মাঘী, ডুপিসহ স্থানীয় জাতের পরিবর্তে উচ্চফলনশীল সরিষার জাত বিনা-৪, ৯, বারি ১৪, ১৭ প্রভৃতি জাত সম্প্রসারণ করতে হবে হবে। এছাড়া অনাবাদি পতিত, অনাবাদি চরাঞ্চল, উপকূলের লবণাক্ত, হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলকে তেল জাতীয় ফসল চাষের আওতায় আনতে হবে। এভাবেই বাংলাদেশে সরিষা চাষে নতুন সূর্য উদিত হতে পারে।

লেখক: আঞ্চলিক কৃষি তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, রাজশাহী।

This post has already been read 288 times!