Tuesday 21st of May 2024
Home / ট্যুরিজম / পৃথিবীর স্বর্গ কাশ্মীর কাহিনী (পর্ব-২) !

পৃথিবীর স্বর্গ কাশ্মীর কাহিনী (পর্ব-২) !

Published at আগস্ট ১৩, ২০১৮

আইমান সাদ: পরদিন শ্রীনগরের ডাল লেকের সামনে থেকে আমরা দুজন অটোতে ১০০ রূপি দিয়ে চলে গেলাম “পারিমপুরা” বাস স্ট্যান্ড-এ। সেখানে শেয়ারিং জীপ ড্রাইভার গলা ফাটায়া ডাকতেছে “ট্যানমার্গ”। একজন ৭০ রূপি করে। ড্রাইভারের পাশে দুজনে বসে স্বর্গ দেখতে দেখতে ৩০৪০ মিনিটেই চলে এলাম (Tanmarg) ট্যানমার্গ।

সেখান থেকে আবার শেয়ারিং জীপে ৪০ রূপিতে ”Gulmarg”! এই শেয়ারিং জীপ খুবই এভেইলেবল এবং কমফোর্টেবল। আমাদের শেয়ারিং জীপে শুধু আমরাই ছিলাম। অথচ রিজার্ভ নিলে খরচ হতো ১৫০০ রূপি! তাই শুধু মনে রাখতে হবে বাসস্ট্যান্ড এর নামগুলো। সামান্য এই তথ্যগুলা না জানার জন্য বেশিরভাগ ট্যুরিস্ট যাতায়াতে রিজার্ভ জীপের জন্য খরচ হয় অস্বাভাবিক বেশি। তাছাড়া আগেও বলেছি, শেয়ারিং জীপে স্থানীয় লোকজন (মেয়েরাও ) উঠে।

নদীর পাশে ডেইজী ফুল দেখেও মন খারাপ??

ট্যানমার্গ থেকে গুলমার্গ পাহাড়ি উঁচু রাস্তা। পুরো রাস্তার দু’ ধারে সাদা ডেইজী কিংবা নাম না জানা বাহারি ফুলের কারপেট বেছানো। গুলমার্গ ঢোকার ঠিক আগে পুলিশী চেক পয়েন্টে ট্যুরিস্ট পরিচয় দিলেই রাজকীয় অভ্যর্থনা মিলবে।

গুলমার্গের হোটেল। শীতকালে এগুলাতে থাকা যায় না।

গুলমার্গ বাস স্ট্যান্ডের বাম পাশেই গন্ডোলা রাইড, মানে ক্যাবল কার। এগুলো সরকারি এবং খরচ পুরো রাইডে ১৭০০ রূপি। অর্ধেক চড়লে ৯৫০ রূপির মতো। খরচ অবশ্যই অস্বাভাবিক বেশী। এরচে নন্দন পার্ক এর কেবল কারে চড়া আরামদায়ক। আমরা গন্ডোলায় না চড়ে ঘোড়ায় চড়ে পাহাড়ের উপর যেখানে গন্ডোলায় করে লোকজন যায়, সেখানে গিয়েছি। ঘোড়ায় চড়াকে স্থানীয় ভাষায় বলে ”পনি রাইড”! ঘোড়াওয়ালারা গরীব এবং শুধুমাত্র গ্রীষ্মকালেই ওদের আয় হয়। তাই সরকারকে টাকা না দিয়ে ঘোড়ায় চড়াই বুদ্ধিমানের কাজ। একটা ঘোড়ায় একজন বসতে পারে আর ভাড়া ৪০০-৭০০ রূপি। এইটার একমাত্র সাইড ইফেক্ট হচ্ছে- পাছা ব্যাথা হওয়া। হয়তো এক্সট্রিম এডভেঞ্চার নিতে গিয়ে আগামী দুইদিন সোফায় বসলেও “আউচ” বইলা চিক্কার দিতে পারেন আরকি!

আমরা প্রথমে ভুল করে ডান পাশের গ্রাম্য রাস্তায় হাটছিলাম স্থানীয় কিছু পরিবারের সাথে। একটা পিচ্চি মেয়েকে নাম জিজ্ঞেস করলাম। বললো, সাহির মালিক! মিষ্টি মেয়েটার নাম শুনেই বলে ফেললাম “আয়াম ইন লাভ”! আর অমনি ওর মা অথবা বোন এসে ওকে নিয়েই ভো-দৌড়। নগদ ছ্যাকায় মন খারাপ হইছিলো খুব!

গুলমার্গের যে পাহাড়ে আমরা উঠেছিলাম তার ওপারেই পাকিস্তান। পাহাড়ে মেঘের সারি, হুট করে বৃষ্টি, ঠাণ্ডা শীতলকরা বাতাস, ভেড়ার পালের চড়িয়ে বেড়ানো সবকিছুই অসাধারণ। এখানে ছবি তুলে প্রোফাইল পিকচার দিলে যারা লাইক পায় না তারাও শতাধিক লাইক পাবে, গ্যারান্টি।

পাহাড়ের চূড়ায় আমরা কাশ্মীরী বিরিয়ানি খেয়েছি মাত্র ১৫০ রূপিতে, সাথে নুডলস ৮০ রূপি। এতো টেস্টি বিরিয়ানি আর নুডুলস কাশ্মীর আর স্বর্গ ছাড়া কোথাও পাওয়া যাওয়ার কথা না। পাহাড় থেকে নামার সময় “লিটল চেরি” নামের ভিটামিন এ ক্যাপসুলের মতো লালচে ছোট ফল পেয়েছি। আলকাতরার চেয়ে যেহেতু ভালো এবং ফ্রি ইচ্ছামতো খেয়ে নিন। খেলে যৌবন স্থায়ী হবে। (নিজস্ব গবেষণা, খাইয়া পাগল হইলে কর্তৃপক্ষ দায়ী না)!

পুরো গুলমার্গ যেন ফুলের বাগান। বাগানের উপরে মেঘেদের বিচরণ। এখানে ঠাণ্ডা থাকে সারাবছর। তাই শীতের কাপড় নেয়াটা সার্থক ছিলো। পাহাড়ের চূড়ায় একটু পরপর বৃষ্টি হয়। ওখানে একটা “সেভেন ওয়াটার ফল” কানেকশন আছে। পানি হাতে নিয়ে “তাজ্জব হয়ে গেলুম!” অস্বাভাবিক এবং অবিশ্বাস্য ঠাণ্ডা। এই পানি সবারই ছুঁয়ে দেখা উচিত! (লেজকাটা শিয়ালের গল্পের কথা বলতে আসবেন না, হুহ)

পানি হাতে নিয়ে “তাজ্জব হয়ে গেলুম!” অস্বাভাবিক এবং অবিশ্বাস্য ঠাণ্ডা।

গুলমার্গে না থেকে সেদিনই ফিরে আসি আমরা। ফিরতি গাড়ী সন্ধ্যা ৬ টা অব্দি এভেইলেবল। পরদিন সকালে বাক্সপেটরা নিয়ে রওনা দেই ৬৬ কিলোমিটার দূরে পেহেলগামের উদ্দ্যেশ্যে।

এবার ডাল লেক থেকে ৬০ রূপি দিয়ে অটোতে করে “লালচক বাস স্ট্যান্ড” -এ গেলাম। সেখান থেকে শেয়ারিং জীপে ৮০ রূপিতে গেলাম “অনন্তনাগ”! সেখান থেকে ৬০ রূপিতে সরাসরি পেহেলগাম। কাশ্মীরের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা।

শেয়ারিং জীপে যাওয়ার পথে মোজাফফর নামে এক ইয়াং স্থানীয় স্কুল শিক্ষক খুব ভালো ইংরেজিতে আলাপ জুড়ে দিলেন। আমি বললাম, আপনাদের মূখ্যমন্ত্রী তো মুসলমান! উনি বলেন, তাতে কি? সে তো ভারতীয় দালাল। নামেই শুধু মুসলমান। শুধু মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়। রাজনীতি যারা করে তারা সবগুলাই এমন। এবার আমি হাসি।

এরপর উনি একটা বাজার দেখালেন যেখানে কিছুদিন আগেই একসাথে ৪০ জন স্বাধীনতাকামীকে হত্যা করেছে ভারতীয় বাহিনী। অনেক কিছুই নাকি মিডিয়ায় আসে না।

আসার আগে উনি আমাদের জোর করে বেশকিছু কাজু বাদাম আর চকলেট দিলেন। অনেক সুস্বাদু ছিল বলে সব সাথে সাথেই খেয়ে ফেলেছি। এখন আর আপনারা চাইলেও দিতে পারবো না।

পথে যেতে যেতে চোখে পড়লো সারি সারি আপেল গাছ। আপেল ভালো করে পাকে নাই। নইলে কয়েকটা লুকায়া বাংলাদেশে নিয়া আসতাম। আপনারাও খাইতে পারতেন।

রাস্তার পাশেই লিডার নদী আর পেহেলগাম নদী। খুব বড় না, কিন্তু পানির রঙ নীল প্রচুর স্রোত। নদীতে প্রচুর পরিমাণে পাথর। কিছু কিছু পাথর এতো বড় যে ছুড়ে মারলে যে কারো ভেঙে যাবে।

বাস স্ট্যান্ডের পাশেই অনেক হোটেল। আমরা উঠলাম হোটেল এক্সিলেন্টে। ভাড়া ৮০০ রূপি, কোয়ালিটি ৭ স্টার! (বিশ্বাস না করলে নাই) পুরো হোটেল কাঠের আবরণ দেয়া। ফ্লোরে কার্পেট। জানালা দিয়ে নদী পাহাড় বাগান ফুল হেলিকপ্টার সবই দেখা যায়! এই কোয়ালিটির পাহাড়ি রিসোর্ট-এ বান্দরবানে থাকতে প্রতিরাত ১০ হাজার টাকা দিয়েও হবে না।

পাহাড়ি লিটল চেরী। খেয়েছি, পাগল হইয়া প্রেমিক হইছি শুধু।

পেহেলগামে ঘুরার জন্য আছে “আরু ভ্যালি, বেতাব ভ্যালি, চন্দনওয়ারী, বাইসারান!” এতোসব জায়গা না ঘুরে ঘোড়ায় করে ৪০০ রূপি দিয়ে কেবল বাইসারান ঘুরলেই হলো। বাইসারানকে মিনি সুইজারল্যান্ড বলা হয়। অনেক বিখ্যাত সিনেমার শ্যুটিংস্পট হয়েছে এই জায়গায়। আমরা বাইসারান গিয়েছিলাম, যাবার পথেই পড়বে আরু ভ্যালি, বেতাব ভ্যালী এইসব স্পট। ঘোড়াওয়ালারা আপনাকে বলবে প্রতিটা স্পট ঘুরিয়ে আনবো ৫০০ রুপি করে। এটা একটা ভাঁওতাবাজি। আপনি শুধু বাইসারান ঘুরবেন, বাকি স্পটগুলা অটোমেটিক চলে আসবে!

কাশ্মীরের ভাষা কাশ্মীরি। আমাদের ঘোড়ার পাইলট কাশ্মীরি, উর্দু আর ইংরেজি মিলিয়ে কথা বলেন। আমি বাংলা, হিন্দী আর ইংরেজী মিলিয়ে কথা বলি। সবাই সবার ভাষা বুঝি।

পেহেলগামের বিভিন্ন স্পট ঘিরে খুবই গরীব পরিবার দেখা যায়, যারা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে খুপরি ঘর বানিয়ে থাকছে। অথচ তাদের পোশাকাদি ভালো। ব্যক্তিত্ব অসাধারণ। ছোট ছোট বাচ্চারা কিউট খরগোশ হাতে নিয়ে রিকুয়েস্ট করবে ছবি তোলার জন্য। বিনিময়ে ১০ রূপি থেকে ১০০ রূপি যা খুশি দিবেন, ওরা খুশিতে লাফাবে।

তবে আমার কাছে পেহেলগামের মূল শহরটা, মানে বাস স্ট্যান্ডের সামনের জায়গাটাই অসাধারণ লেগেছে। লিডার নদী এবং পেহেলগাম নদী দুটি এক হয়ে মিশে গেছে আমাদের হোটেলের সামনেই। অবশ্য এই নদীগুলোকে বরিশালের লোকজন খাল বলে ইনসাল্ট করতে পারে। তাদের কথায় মোটেও কান দেবেন না। এসব নদীর উপর দিয়ে ব্রিজ আছে কয়েকটি। ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে ছবি তোলা একটা মহান কাজ হতে পারে। কারণ, এসব ছবি হতে পারে আপনার নেক্সট পাচ বছরে ফেবুর প্রোপিক আর কাভার ফটো!

আলোচিত দুই নদীর মাঝখানে আবার ফুলের বাগান। সেখান থেকে হাতছানি দেয় থরে থরে সাজানো পাহাড়ের সাড়ি, তার উপর জমে থাকা সাদা বরফ! পাথরের উপর বসে পাহাড়ি আপেল আর পাকা টসটসে আলু বোখারা খাচ্ছিলাম! জান্নাত বুঝি একেই বলে!

নদীর ধার ঘেঁষে আমরা হাটছিলাম সেদিন বিকেলে। এক পাশে ব্যারিকেড দেয়া। সেই ব্যারিকেড টপকে উপারে গিয়ে পাকিস্তানে যাওয়ার ফিলিংস আসছিলো। নিজেরে যখন বজরংগী ভাইজান লাগতেছিলো তখনি এক পুলিশ এসে ২০+২০ রূপির একটি টিকেট ধরিয়ে বললো এটিও বাগান।

কাশ্মীরে গেলে পেহেলগামের জন্য দুইটি রাত বরাদ্দ রাখা উচিত। যেহেতু হোটেল একেবারেই এভেইলেবল এবং ভাড়াও খুবই কম, প্রকৃতির সব রস এখান থেকেই নিয়ে আসা যায়।

কাশ্মীর যাবেন বিমানে। অন্তত কোলকাতা থেকে দিল্লী হয়ে শ্রীনগর যাবেন বিমানে, আসবেনও বিমানে। কারণ, দীর্ঘ পথ ট্রেনে বিরক্ত লাগবে, আর দুই মাস আগে টিকেট কাটলে বিমানের ভাড়া ট্রেনের ভাড়ার প্রায় সমানই পড়ে। আমাদের দুজনের বিমানে যাওয়া আসা, থাকা-খাওয়া, সাইট সিয়িং খরচ মিলিয়ে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এরমধ্যে যখন তখন যা খুশি খাওয়া, একেবারে ছোটখাটো সব খরচা, ট্রাভেল ট্যাক্স সবই অন্তর্ভুক্ত।

এরপরে যাবো শীতে বরফ আর তুষারপাত দেখতে। কারণ কাশ্মীরের রূপ তখন একেবারেই পালটে যায়। প্রায় সর্বত্র বরফে ঢাকা থাকে। সেক্ষেত্রে অবশ্য স্পট কমিয়ে ফেলে খরচ আরো কমানো যায়!

এবার আপনাকে রিকুয়েস্ট করতেছি একবারের জন্য হলেও টাকা জমিয়ে, সময় করে ঘুরে আসুন ভূস্বর্গ কাশ্মীর! এখন কথা হচ্ছে, সবই তো ঘুরলেন। কিন্তু কাশ্মীর কই?

আসলে বাংলাদেশ ঘুরতে এসে যেমন কেউ বাংলাদেশ পাবে না তেমনি কাশ্মীর গিয়েও কাশ্মীর পাবে না। শ্রীনগর হচ্ছে কাশ্মীরের ঢাকা। গুলমার্গ, সোনমার্গ, পেহেলগাম, দুধপাত্রী এসব হচ্ছে মূল স্পট।

*টিকা- কাশ্মীর গেলে কখনওই আগে থেকে হোটেল/ বোট হাউজ বুকিং দেবেন না। আর সবার সাথে ভালো আচরণ করবেন।

This post has already been read 4895 times!