Tuesday 9th of August 2022
Home / ফসল / নারিকেল’র মাকড় সমস্যা ও সমাধান

নারিকেল’র মাকড় সমস্যা ও সমাধান

Published at অক্টোবর ৩, ২০১৭

narikelডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম:
নারিকেল আছে হাজারো সমস্যা। এর মধ্যে নারিকেল মাকড় আক্রমণ ইদানিংকালে একটি গুরুতর সমস্যা। এসব মাকড়ের আক্রমণে কচি অবস্থায় নারিকেল’র খোলের ওপর ফাটা ফাটা শুকনো দাগ পড়ে এবং কুঁচকে বিকৃত হয়ে পরিপক্ব হওয়ার আগেই তা ঝরে পড়ে। আক্রমণের শুরুতে আক্রান্ত নারিকেল দেখে সহজে মাকড় চেনা যায় না। অতীতে আমাদের দেশে নারিকেল এ রকম সমস্যা দেখা যায়নি। এ সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা না থাকায় আক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে মাকড় অনাবিষ্কৃত থেকে যায়। কৃষকের ধারণা মোবাইল টাওয়ারের কারণে নারিকেল এমনটি হচ্ছে। যে কারণে এ সমস্যা সমাধানের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি। মূল সমস্যা ক্ষতিয়ে না দেখে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ সমস্যাকে গুজব বলে অবহেলা করায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষক। এসব মাকড়ের ঝাঁক কচি নারিকেল’র বোঁটার কাছে বৃতির নিচে বসে নারিকেল’র গা থেকে রস চুষে খায়। রস চুষে নেয়ার সময় নারিকেল’র যে ক্ষত হয় পরবর্তিতে তা ফাটা বাদামি দাগে পরিণত হয়। পরে সেকেন্ডারি ইনফেকশনের মাধ্যমে আরো বেশি সমস্যায় আক্রান্ত হয়। বাতাস, কীটপতঙ্গ ও পাখির মাধ্যমে মাকড় এক গাছ থেকে অন্য গাছে ছড়ায়। বর্তমানে এটি বেশ উল্লেখযোগ্য সমস্যা হিসেবে পরিগণিত।

একটি গাছ থেকে বছরে ১০০ থেকে ১৫০টি নারিকেল পাওয়া গেলেও মাকড় আক্রান্ত গাছ থেকে কিছুই না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে মাকড় দমনের ওপর ধারাবাহিকভাবে গত কয়েক বছর ধরে মাঠ পর্যায়ে গবেষণা করার পর মাকড় দমন ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়। নারিকেল আক্রমণকারী মাকড় নারিকেল’র খোসা থেকে রস চুষে খায়। গাছে নারিকেল না থাকলে মাকড় বাঁচতে পারে না। বোঁটার কাছে বৃতির নিচে লুকানো অবস্থায় থাকে বলে মাকড়নাশক দিলে এরা সহজে মরে না, আবার প্রাকৃতিক শত্রুও এদের খুঁজে পায় না। কচি নারিকেল সঙ্গবদ্ধ অবস্থায় থাকে বলে শীতের আগে আক্রান্ত ফল গাছ থেকে নামিয়ে ধ্বংস করে গাছের মাথায় কাঁদি সংলগ্ন এলাকায় মাকড়নাশক স্প্রে করে ঝাঁকসহ মাকড় ধ্বংস করা যায়। শীত মৌসুমে গাছে নারিকেল ধরে কম এবং তাই দৈবক্রমে বেঁচে যাওয়া মাকড় খাদ্যের অভাবে মারা যায় ও আক্রমণ করার মতো উপযুক্ত বয়সের নারিকেল পায় না। সেজন্য বার বার গাছে উঠে স্প্রে করার দরকার হয় না। গাছে নতুন ফল এলে সে ফলের বয়স ২ মাস হলে দ্বিতীয়বার মাকড়নাশক স্প্রে করতে হয়। এক গাছ থেকে অন্য গাছে সহজেই ছড়ায় বলে এলাকাভিত্তিক মাকড় দমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এককভাবে এলাকার এক-দুইজন মাকড় দমন করলে যথাযথভাবে কার্যকর হবে না। মাকড় আক্রান্ত নারিকেল গাছে ৫ ধাপে দমন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হয়। তবেই ভালো ফল পাওয়া যায়।

প্রথম ধাপ
শীত শুরু হওয়ার আগে ভাদ্র-আশ্বিন (মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর) মাসে আক্রান্ত নারিকেল গাছের বিকৃত ২ থেকে ৬ মাস বয়সের সব নারিকেল কেটে গাছতলাতেই আগুনে পুড়িয়ে মাটির নিচে পুঁতে রাখতে হবে যাতে সেসব আবর্জনা অন্য গাছে মাকড় ছড়াতে না পারে।

দ্বিতীয় ধাপ
ভাদ্র-আশ্বিন (মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর) মাসে গাছের মাথা পরিষ্কার করার পর কাঁদি সংলগ্ন জায়গাতে ১.৫ শতাংশ হারে মাকড়নাশক ওমাইট/সুমাইট/রনভিট/ডেনিটল/ভার্টিমেট অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। এ সাথে আশপাশে কম বয়সি গাছের কচিপাতায় একইভাবে মাকড়নাশক স্প্রে করতে হবে।

তৃতীয় ধাপ
ফাল্গুন-চৈত্র (মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্য মার্চ) মাসে প্রথমবার মাকড়নাশক প্রয়োগের পর গাছে নতুন ফুল আসলে তাতে ফল ধরবে, ফলের বয়স ২ মাসে মুষ্টির আকার হলে একই মাত্রায় দ্বিতীয়বার মাকড়নাশক প্রয়োগ করতে হবে।

চতুর্থ ধাপ
তৃতীয়বার চৈত্র-বৈশাখ (মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য মে) মাসের পর স্প্রে করার আগে কাটার মতো ডাব ও নারিকেল সংগ্রহের পর আগের মতো একই মাত্রায় মাকড়নাশক স্প্রে করতে হবে।

পঞ্চম ধাপ
চতুর্থ ধাপের মতো ফাল্গুন-চৈত্র (মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্য মার্চ) মাসে পাশের ছোট গাছসহ নির্দিষ্ট গাছগুলোতে শেষবারের মতো মাকড়নাশক স্প্রে করতে হবে। এভাবে ৫টি ধাপে মাকড় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। ছত্রাকজনিত রোগের কারণেও কচি অবস্থায় নারিকেল ঝরে যায়। তাই প্রথম ও দ্বিতীয় বার স্প্রে করার সময় প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে ব্যাভিস্টিন/নইন/এমকোজেম/জেনুইন নামক ছত্রাকনাশক অনুমোদিত মাত্রায় মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

কৃষক পর্যায়ে এসব কার্যকর উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহার করার মাধ্যমে দেশে আবার আগের মতো নারিকেল’র উৎপাদন হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও কৃষিভিত্তিক সমৃদ্ধিকে এগিয়ে নিতে হলে খামার ব্যবস্থাপনায় নারিকেল অন্তর্ভুক্ত করা খুবই জরুরি। একটু পরিকল্পিতভাবে নারিকেল’র চাষ করলে আমাদের কৃষিভিত্তিক সমৃৃদ্ধিকে আমরা অনেকটুকু এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।

লেখক : পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫

This post has already been read 3044 times!