
চট্টগ্রাম সংবাদদাতা: বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির আহ্বান জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত “বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি: প্রাক-বাজেট (২০২৬-২৭) সংবাদ সম্মেলন”-এ এ দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ক্লিন (CLEAN), আইএসডিই বাংলাদেশ (ISDE Bangladesh) এবং বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (BWGED)।
পরিবেশ প্রতিবেশ ফোরাম-চট্টগ্রামের সভাপতি এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক ড. খালেদ মিসবাহউজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সঞ্চালনা করেন সিআরসিডির নির্বাহী পরিচালক কাজী ইকবাল বাহার ছাবেরী। প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আইএসডিই বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এস এম নাজের হোসাইন।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. খালেদ মিসবাহউজ্জামান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, “জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর উন্নয়ন মডেল পরিবেশ, অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তি উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।”
তিনি দেশীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে এস এম নাজের হোসাইন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি বারবার চাপের মুখে পড়ছে। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগত দুর্বলতা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এবং আমদানিনির্ভর নীতির ফলে জনগণকে উচ্চমূল্যের বোঝা বহন করতে হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আরইবি ও পিবিএসের কাঠামোগত সমস্যার সমাধান জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শহর ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যুৎ সেবায় এখনও উল্লেখযোগ্য বৈষম্য রয়েছে। জাতীয় গ্রিডের আওতায় থাকা অনেক এলাকাও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন থাকে, যা উন্নয়ন ও জনজীবনের জন্য উদ্বেগজনক।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, এলএনজি ও কয়লার মূল্য অস্থিরতা এবং বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, ভর্তুকির চাপ বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও ক্রমাগত বেড়ে চলেছে।
বক্তারা উল্লেখ করেন, দেশের বিদ্যুৎ খাত এখনও প্রধানত গ্যাস, তেল ও কয়লাভিত্তিক। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, জ্বালানি আমদানি ব্যয় এবং ভর্তুকির চাপ জাতীয় অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি বোঝা সৃষ্টি করছে। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।
বক্তারা আরও বলেন, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর (পিবিএস) অবকাঠামোগত দুর্বলতা, জনবল সংকট ও ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার কারণে গ্রামীণ জনগণ শতভাগ বিদ্যুতায়নের প্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছে না। সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতেই বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগে। এ অবস্থায় আরইবি ও পিবিএসের মধ্যকার বৈষম্য, অসন্তোষ ও নীতিগত দুর্বলতা দূর করে মানসম্মত বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
বক্তারা বলেন, বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান এখনও খুবই সীমিত। অথচ রুফটপ সোলার, সোলার ইরিগেশন, এগ্রিভোল্টাইকস, ফ্লোটোভোল্টাইকস, নেট মিটারিং এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে আসন্ন জাতীয় বাজেট উপলক্ষে ১১ দফা সুপারিশ উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে— নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, সোলার প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর কর-শুল্ক হ্রাস, সহজ শর্তে সবুজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা, নেট মিটারিং সম্প্রসারণ, কৃষিতে সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর নতুন প্রকল্প নিরুৎসাহিত করা, জাতীয় গ্রিড আধুনিকায়ন, কমিউনিটি-ভিত্তিক জ্বালানি রূপান্তর, আরইবি-পিবিএস সংস্কার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি গবেষণা তহবিল গঠন এবং ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা ও বাজেট বরাদ্দ প্রদান।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী, কনজ্যুমারস মিডিয়া অ্যালায়েন্সের সভাপতি আলমগীর সবুজ, ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের ব্যুরো প্রধান অনুপম দাস, দৈনিক আমাদের সময়ের ব্যুরো প্রধান হামিদুল্লাহ, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমের আল রহমান, দৈনিক সকালের খবরের ব্যুরো প্রধান এস এম পিন্টু, চট্টলার খবরের মরিয়ম জাহান মুন্নী, টাইমস অব বাংলাদেশের মিজানুর রহমান, দৈনিক পূর্বদেশের এম এ হোসেন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ব্যুরো প্রধান মোহাম্মদ ইলিয়াছ, পরিবেশ প্রতিবেশ ফোরাম-চট্টগ্রামের সদস্য জান্নাতুল ফেরদৌস এবং মোহাম্মদ জানে আলম।
এ সময় পরিবেশকর্মী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষার্থী, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উদ্যোক্তা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জলবায়ু-সহনশীল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে হবে।



