সোমবার , জুলাই ২২ ২০২৪

আমের বিভিন্ন প্রকার রোগ ও দমন ব্যবস্থাপনা

কৃষিবিদ মো. আব্দুল্লাহ-হিল-কাফি : আম বাংলদেশের প্রধান চাষযোগ্য অর্থকরী ফলগুলোর মধ্যে অন্যতম। বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবহার, পুষ্টিমান এবং স্বাদ- গন্ধে এটি একটি অতুলনীয় ফল। এই উপমহাদেশে আম সবচেয়ে জনপ্রিয় ফল। তাই আম সকল ফলের সেরা। বাংলাদেশে আমই হচ্ছে সর্বাধিক জনপ্রিয় ফল। এর সাথে অন্য কোন ফলের তুলনা হয় না। কারণ, উৎকৃষ্ট জাতের আম স্বাদে গন্ধে ও দেখতে খুবই আকর্ষনীয়। আম এমন একটি ফল যা ছোট থেকে শুরু করে পাকা পর্যন্ত সব অবস্থায় খাওয়া যায়। আম পছন্দ করেনা এমন লোক হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবেনা। তাই অনেকে আমকে ফলের রাজা বলে থাকেন। বাংলাদেশে আম চাষাবাদের এলাকা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে আমাদের দেশে আম চাষে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো প্রতিহত করতে না পারলে আম চাষ লাভজনক হয় না। এরমধ্যে আমের নানা ধরনের রোগজনিত সমস্যা। তাদের দমন ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাপনা সম্বন্ধে নিম্নে আলোচনা করা হলো-

অ্যানথ্রাকনোজ রোগ
এই রোগের আক্রমনে গাছের কচি পাতা, কান্ড, কুঁড়ি, মুকুল ও ফলে দেখা যায়। পাতায় অসমান আকৃতির ধুসর বাদামী বা কালচে রঙের দাগ পড়ে। পাশাপাশি কয়েকটি দাগ একত্রিত হয়ে বড় দাগের সৃষ্টি করে। বেশি আক্রান্ত হলে পাতা ঝরে পড়ে। আমের মুকুল বা ফুল আক্রান্ত হলে কালো দাগ দেখা দেয়। ফুল আক্রান্ত হলে তা মারা যায় এবং ঝরে পড়ে। মুকুল আক্রান্ত হলে ফলধারন ব্যহত হয়। আম ছোট অবস্থায় আক্রান্ত হলে আমের গায়ে কালো দাগ দেখা দেয়। আক্রান্ত ছোট আম ঝরে পড়ে। বাড়ন্ত আমে রোগের জীবানু আক্রমণ হলে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় না। পাকা আমে ধুসর বাদামী বা কালো দাগের সৃষ্টি করে। গুদামের আবহাওয়া অনুকুল হলে রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে। আম বড় হওয়ার সময় ঘন ঘন বৃষ্টি ও মেঘলা আবহাওয়া বিরাজ করলে আমে আক্রমণ বেশী দেখা যায়।

প্রতিকার
১. রোগাক্রান্ত বা মরা ডালপালা ছাটাই করে পুড়ে ফেলতে হবে।
২. গাছের রোগাক্রান্ত ঝরা পাতা ও ঝরে পড়া আম সংগ্রহ করে পুড়াই ফেলতে হবে, প্রয়োজনে মাটির নিচে পুতে দিতে হবে।
৩.মুকুলে রোগের আক্রমণ প্রতিহত করতে হলে মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ভালভাবে স্প্রে করতে হবে। মুকুল ১০-১৫ সে: মি: লম্বা হলে প্রথম স্প্রে শেষ করতে হবে। আম মটর দানার মত হলে দ্বিতীয় বার স্প্রে করতে হবে। কীটনাশকের এবং ছত্রাকনাশক মিশিয়ে একত্রে মিশিয়ে স্প্রে করা যেতে পারে।
৪. বাড়ন্ত আমকে রোগমুক্ত রাখতে হলে আম সংগ্রহের ১৫ দিন আগ পর্যন্ত মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক   বা একরোবেট এম জেড প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে বা কার্বেন্ডাজিম প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম হারে ১৫ দিনের ব্যবধানে ৩/৪ বার স্প্রে করতে হবে।
৫. গাছ থেকে আম পাড়ার পরপরই গরম পানিতে (৫৫০ সেঃ তাপমাত্রায় ৫ মিনিট) ডুবিয়ে রাখার পর শুকিয়ে অর্থাৎ গরম পানিতে শোধন করে গুদামজাত করতে হবে।

আমের বোঁটা পচা রোগ
আম গাছ থেকে পাড়ার পর পাকতে শুরু করলে বোঁটা পচা রোগের লক্ষন প্রকাশ পায়। প্রথমে বোঁটায় বাদামী অথবা কালো দাগ দেখা দেয়। দাগ দ্রুত বাড়তে থাকে এবং গোলাকার হয়ে বোঁটার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। জীবাণু ফলের ভেতরে আক্রমণ করে পচিয়ে ফেলে। আক্রান্ত আম ২/৩ দিনের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়। রোগের জীবাণু বোঁটা ছাড়াও অন্যান্য আঘাতপ্রাপ্ত স্থান দিয়ে আমের ভিতরে প্রবেশ করে আম পচিয়ে ফেলতে দেখা যায়।

প্রতিকার
১. রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে গাছ থেকে আম পাড়তে হবে। আম পাড়ার সময় যাতে আঘাত না পায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
২. ৫ সেমি. (২ ইঞ্চি) বোঁটাসহ আম পাড়লে এ রোগের আক্রমণ কমে য়ায়।
৩. আম পাড়ার পর গাছের তলায় জমা না রেখে দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে।
৪. আম পাড়ার পর পরই গরম পানিতে (৫৫০ সেঃ তাপমাত্রার পানিতে ৫-৭ মিনিট) অথবা বাভিষ্টিন দ্রবনে (প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম) ৫ মিনিট ডুবিয়ে রাখার পর গুদামজাত করলে বোঁটা পচা রোগের আক্রমণ ানেকাংশে কমে যায়।

আমের আঠা ঝরা এবং হঠাৎ মড়ক রোগ
বর্তমানে আম গাছের যে সমস্ত রোগ দেখা যায় তাদের মধ্যে আমের আঠা ঝরা এবং হঠাৎ মড়ক সবচেয়ে মারাত্মক। কারণ এরোগে আক্রান্ত গাছ খুব অল্প সময়ের মধ্যে মারা যায় । প্রথমে কান্ড অথবা মোটা ডালের কিছু কিছু জায়গা থেকে হালকা বাদামি থেকে গাড় বাদামি রঙের আঠা বা রস বের হতে থাকে । বেশী আক্রান্ত ডগা বা ডালটি অল্প দিনের মধ্যেই মারা যায়। কিছুদিন পর দেখা যায় আরেকটি ডাল একই ভাবে মারা যাচ্ছে। এভাবে এক পর্যায়ে সম্পূর্ণ গাছ মারা যেতে পারে।

প্রতিকার
১. গাছে মরা বা ঘন ডাল পালা থাকলে তা নিয়মিত ছাটাই করতে হবে।ঃ
২. আঠা বা রস বের হওয়ার স্থানের আক্রান্ত সহ সুস্থ কিছু অংশ তুলে ফেলে সেখানে বোর্দো পেষ্টের (১০০ গ্রাম তুঁতে ও ১০০ গ্রাম চুন ১ লিটার পানির সাথে মিশিয়ে পেষ্ট তৈরী করা যায়) প্রলেপ দিতে হবে।
৩. আক্রান্ত ডাল কিছু সুস্থ অংশসহ কেটে পুড়ে ফেলতে হবে। কাটা অংশে রোগের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য বোর্দো পেষ্টের প্রলেপ দিতে হবে।
৪. গাছে নতুুন পাতা বের হলে মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম ১৫ দিনের ব্যবধানে ২ বার স্প্রে করতে হবে।

আগামরা রোগ
রোগের জীবানু প্রথমে কচি পাতায় আক্রমণ করে। আক্রান্ত পাতা বাদামী হয় এবং পাতার কিনারা মুড়িয়ে যায়। পাতাটি তাড়াতাড়ি মারা যায় ও শুকিয়ে যায়। আক্রমণ পাতা থেকে এ রোগের জিবানু কুড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ডগার সামনের দিকে মরে যায়। মরা অংশ নিচের দিকে অগ্রসর হতে থাকে ফলে বহু দুর থেকে আগামরা রোগের লক্ষণ বোঝা যায়। ডগাটি লম্বালম্বিভাবে কাটলে বাদামী লম্বা দাগের সৃষ্টি করে। আক্রমণ বেশী হলে গাছ মারা যেতে পারে।

প্রতিকার
১. আক্রান্ত ডাল কিছু সুস্থ অংশ সহ কেটে ফেলতে হবে। কাটা অংশ পুড়াই ফেললে ভাল। কাটা অংশে বোর্দো পেষ্টের (১০০ গ্রাম তুঁতে ও ১০০ গ্রাম চুন ১ লিটার পানির সাথে মিশিয়ে পেষ্ট তৈরী করা যায়) প্রলেপ দিতে হবে।
২. গাছে নতুুন পাতা বের হলে মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে ১৫ দিনের ব্যবধানে ২/৩ বার স্প্রে করতে হবে।

কালো প্রান্ত রোগ
ইটের ভাটা থেকে নির্গত ধোয়ায় কারণে এ রোগ হতে পারে। আমের বয়স দেড় মাস হলে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। আক্রান্ত আমের বোঁটার দিকের অংশ স্বাভাবিকভাবে বাড়লেও নিচের অংশ ঠিক মত বাড়তে পারে না। ফলে আমের গঠন বিকৃত হয়। নিচের অংশ কুঁচকে যায়, বেশী আক্রান্ত আমের নিচের অংশ কালো হয়ে যায়। কোন কোন সময় আমের বিকৃত অংশ ফেটে যেতে পারে এবং পচে যেতে পারে।

প্রতিকার
১. আম মার্বেল আকারের হলে প্রতি লিটার পানিতে ৫ গ্রাম বোরাক্স বা বোরিক পাউডার ১০-১৫ দিন পর পর ৩-৪ বার ¯েপ্র করতে হবে।
২. ইটের ভাটা আম বাগান থেকে ২ কি.মি. দূরে স্থাপন করতে হবে।
৩. ইটের ভাটার চিমনি কমপক্ষে ৩৭ মিটার (১২০ ফুট) উঁচু করতে হবে।

আম ফেটে যাওয়া
আম ছাড়াও কাঁঠাল, ডালিম, পেয়ারা ইত্যাদি ফল ফেটে যেতে দেখা যায়। সব ধরণের ফল ফাটার কারণ মোটামুটিভাবে একই। মাটিতে রসের দ্রুত হ্রাস-বৃদ্ধি আম ফাটার প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত। আবহাওয়া শুকনা হলে এবং দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হলে আমের উপরের খোসা শক্ত হয়ে যায়। এরপর হঠাৎ বৃষ্টিপাত হলে বা সেচ প্রদান করলে আম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। আমের ভিতরের দিক ঠিকমত বাড়লেও বাহিরের আবরণ শক্ত হওয়ার কারণে তা বাড়তে পারে না। এ অবস্থায় আম ফেটে যায়। মাটিতে বোরণের ঘাটতি থাকলেও আম ফাটতে সহায়তা করে বলে জানা যায়।

প্রতিকার
১. মাটিতে প্রচুর পরিমাণে জৈব সার দিতে হবে। জৈব সার মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে ফলে শুকনা বা খরার সময়ও মাটিতে যথেষ্ট রস থাকবে। জৈব সারের মধ্যে গোবর সব চেয়ে উত্তম বলে বিবেচিত।
২. সার দেওয়ার মৌসুমে ২০ বছর বা তদুর্ধ বয়সের গাছে ৫০ গ্রাম বোরাক্স বা বোরিক এসিড প্রয়োগ করতে হবে।

আম চাষী ভাইয়েরা উপরোক্ত বিষয় সমুহ সময় মত সঠিক ভাবে মেনে চললে উরোক্ত রোগ হতে পরিত্রান পাওয়া সম্ভব। যেহেতু অন্যান্য ফসলের মত আমেও বেশ কিছু রোগের আক্রমণ হয় যা আমের উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব বি¯তার করে। তাই আমের উৎপাদন বাড়াতে হলে রোগ দমন ব্যবস্থাপনা জানা এবং মেনে চলা অপরিহার্য়।

লেখক: আঞ্চলিক কৃষি তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, রাজশাহী।

This post has already been read 1990 times!

Check Also

জিএমও নিয়ে প্রচলিত ধারণা ভুলের দাবী

নিজস্ব প্রতিবেদক: জিএমও নিয়ে প্রচলিত ধারণা ভুলের দাবী করেছেন একদল বিজ্ঞানী ও গবেষক। এ ব্যাপারে …