Sunday 14th of April 2024
Home / ফসল / তিল চাষে ফলন বাড়াতে সার ও পানি ব্যবস্থাপনা

তিল চাষে ফলন বাড়াতে সার ও পানি ব্যবস্থাপনা

Published at ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৯

. মো. হোসেন আলী, পার্থ বিশ্বাস এবং মো. আকতারুল ইসলাম (ময়মনসিংহ): বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে তেল ফসল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিল বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম ভোজ্য তেল ফসল। বাংলাদেশে প্রায় ৩৩ হাজার হেক্টর জমিতে তিল চাষ হয় এবং মোট উৎপাদন প্রায় ২৯ হাজার মে. টন। বাংলাদেশে খরিফ এবং রবি উভয় মৌসুমেই তিলের চাষ করা হয়। তবে বর্তমানে দুই-তৃতীয়াংশ তিলের আবাদ খরিফ মৌসুমে হয়। বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলেই তিলের চাষ হয়। আমাদের দেশে সাধারণত কালো ও খয়েরী রঙের বীজের তিলের চাষ বেশি হয়। তিলের বীজে ৪২-৪৫% তেল এবং ২০% আমিষ থাকে। তিলের জাতীয় গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৫০০-৬০০ কেজি। উন্নত জাতের ব্যবহার, সঠিক সময়ে সেচ ও পানি ব্যবস্থা এবং উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে তিলের ফলন প্রতি হেক্টরে ১২০০-১৫০০ কেজি পাওয়া সম্ভব।

মাটি আবহাওয়া: পানি জমে থাকে না এমন প্রায় সব ধরনের মাটিতে তিলের চাষ করা যায়। উঁচু বেলে দোআঁশ বা দোআঁশ মাটি তিল চাষের জন্য বেশি উপযোগী। তবে জমি থেকে পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা থাকতে হবে। তাপমাত্রা ২৫০ সেলসিয়াসের নিচে নামলে বীজ গজাতে দেরি হয় এবং চারা ঠিকমত বাড়তে পারে না। বাড়ন্ত অবস্থায় অনবরত বৃষ্টিপাত হলে তিল গাছ মরে যায়।

জাত নির্বাচন: অধিক ফলন পেতে উন্নত জাত যেমন- বিনা তিল-৩, বিনা তিল-৪, বারি তিল-৩ এবং বারি তিল-৪ খুবই উপযোগী।

বপনের সময়: তিল খরিফ ও রবি (১৬ অক্টোবর-১৫ মার্চ বা কার্তিক-ফাল্গুন) উভয় মৌসুমে চাষ করা যায়। খরিফ-১ মৌসুমে অর্থাৎ ফাল্গুন-চৈত্র মাসে (মধ্য-ফেব্রুয়ারি হতে মধ্য-এপ্রিল), খরিফ-২ মৌসুমে অর্থাৎ ভাদ্র মাসে (মধ্য-আগস্ট হতে মধ্য-সেপ্টেম্বর) তিলের বীজ বপনের উত্তম সময়।

বপন পদ্ধতি: তিলের বীজ সাধারণত ছিটিয়ে বপন করা হয়। তবে সারিতে বপন করলে অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা করতে সুবিধা হয় এবং কাংখিত ফলন পাওয়া যায়। সারিতে বপন করলে সারি থেকে সারির দূরত্ব ২৫-৩০ সে.মি ও গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৫ সে.মি রাখতে হবে।

বীজের হার: ছিটিয়ে বপনের ক্ষেত্রে হেক্টর প্রতি ৮-৯ কেজি (বিঘা প্রতি ১-১.১৫ কেজি) এবং সরিতে বপনের ক্ষেত্রে হেক্টর প্রতি ৭.০-৭.৫ কেজি (বিঘা প্রতি ১ কেজি)।

সারের পরিমাণ: মাটির উর্বরতা ভেদে সারের চাহিদার কিছুটা তারতম্য হতে পারে। মধ্যম শ্রেণীর উর্বর মাটির জন্য নিম্নরূপ হারে সার প্রয়োগ করতে হবে:

সারের নাম পরিমাণ (কেজি/হেক্টর)            পরিমাণ (কেজি/বিঘা)
ইউরিয়া ১০০-১২৫ ১৩-১৭
টিএসপি ১৩০-১৫০ ১৭-২০
এমপি ৪০-৫০ ৫-৮
জিপসাম ১০০-১১০ ১৩-১৫
জিংক সালফেট (প্রয়োজনে) ০-৫
বরিক এসিড (প্রয়োজনে) ৮-১০ ১-১.৫

সার প্রয়োগ পদ্ধতি: ইউরিয়া সারের অর্ধেক ও বাকি সব সার জমি শেষ চাষের সময় ছিটিয়ে মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। বাকি ইউরিয়া বীজ বপনের ২৫-৩০ দিন পর ফুল আসার সময় উপরি প্রয়োগ করতে হবে।

সেচ প্রয়োগ পানি নিষ্কাশন: সাধারণত খরিপ-১ মৌসুমে তিল বোনার সময় প্রায়ই রসের অভাব পরিলক্ষিত হয়। মাটিতে পর্যাপ্ত রস বা আদ্রতা না থাকলে বীজ গজানোর বিষয়টি নিশ্চত করতে বপনের পূর্বে জমিতে অবশ্যই একটি সেচ দিতে হবে এবং মাটিতে জোঁ আসার পর চাষ দিয়ে বীজ বপন করতে হবে। তিল ফসল খরা সহনশীল হলেও ফুল আসার সময় জমিতে রসের অভাব হলে (সাধারণত বীজ বোনার ২৫-৩০ দিন পর) ফুল আসার পূর্বে এক বার সেচের প্রয়োজন হয়। জমিতে রস না থাকলে ৫৫-৬০ দিন পর ফল ধরার সময় আর একবার সেচ দিতে হবে। উল্লেখ্য যে, তিল ফসল দীর্ঘ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। তাই জমির মধ্যে মাঝে মাঝে নালা কেটে বৃষ্টি বা সেচের অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে ফসলকে রক্ষা করতে হবে।

ফসল সংগ্রহ: তিল ফসল সংগ্রহ করতে সাধারণত জাত ভেদে ৮৫-৯০ দিন সময় লাগে।

লেখক: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, কৃষি প্রকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা), ময়মনসিংহ-২২০২

This post has already been read 6727 times!