১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ২৮ নভেম্বর ২০২১, ২৪ রবিউস-সানি ১৪৪৩
শিরোনাম :
https://mailtrack.io/trace/link/f26343803e1af754c1dd788cd7a73c22043d5987?url=https%3A%2F%2Finnovad-global.com%2Flumance&userId=1904341&signature=5e74e7dc17531970

বাংলাদেশে সয়াবিনের উৎপাদন ও ব্যবহার

Published at আগস্ট ১৮, ২০২১

ড. মো. আব্দুল মালেক : দেশের সয়াবিন সমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে পরিচিত বৃহত্তর নোয়াখালী এবং চাঁদপুর জেলায়। বিগত ছয় বছরে গড়ে ৭৬.৯৩ হাজার হেক্টর জমি হতে উৎপাদিত সয়াবিনের পরিমাণ গড়ে ১.৩১ লক্ষ টন। দেশে উৎপাদিত  এ স্বল্প পরিমাণ সয়াবিন তেল নিষ্কাশনে ব্যবহৃত না হয়ে পোলট্রি এবং মাছের খাদ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও পোলট্রি এবং মাছের খাদ্য শিল্পে ব্যবহারের জন্য বিদেশ থেকেও বিপুল পরিমাণ দানা সয়াবিন ও সয়ামিল আমদানি করা হয়ে থাকে। মূলত সিটি, মেঘনা ও যমুনা গ্রæপসহ এবং আরও কিছু ছোট ছোট কোম্পানি তেল নিষ্কাশনের উদ্দেশ্যে বিদেশ হতে প্রতি বছর প্রায় ২০ লক্ষ টন সয়াবিন আমদানি করে যার কিছু অংশ সরাসরি তেল নিষ্কাশনে এবং বাকি অংশ দেশের পোলট্রি এবং মাছের খাদ্য তৈরির শিল্পে ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশের সয়াবিন চাষাধীন এলাকা

সয়াবিন সাধারণত বেলে দো-আঁশ এবং দো-আঁশ মাটিতে ভালো জন্মায়। মাটির বুনটের বিবেচনায় বাংলাদেশের বৃহত্তর নোয়াখালী এবং চাঁদপুর ছাড়াও ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, যশোর, মেহেরপুর, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও জামালপুর জেলায় সয়াবিন আবাদ বৃদ্ধির যথেষ্ঠ সুযোগ রয়েছে। এছাড়া সয়াবিন মধ্যম মাত্রার লবণ সহিষ্ণু বিধায় উপকূলীয় জেলাসমূহে সয়াবিন চাষের সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশে সয়াবিন চাষের গুরুত্ব

১. বাংলাদেশের আবহাওয়ায় রবি ও খরিফ-২ মৌসুমে চাষোপযোগী একটি ফসল হলো সয়াবিন;

২. বর্তমান নিবিড় চাষাবাদের ফলে বাংলাদেশের মাটির স্বাস্থ্য হুমকির সম্মুখীন। তাই প্রচলিত শস্যবিন্যাসে সয়াবিন অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্যের উন্নতি করা যেতে পারে এবং সয়াবিন চাষ পরবর্তী ফসলে রাসায়নিক সার কম প্রয়োজন হয়। তাই বোরো ধানের আবাদ সীমিত করে সয়াবিন-রোপা আউশ-রোপা আমন শস্যবিন্যাসের প্রচলন করার যথেষ্ঠ সুযোগ আছে। ফলে শস্যবিন্যাসটি কৃষকের নিকট একটি লাভজনক শস্যবিন্যাস হিসেবে বিবেচিত হবে।

৩. সয়াবিন একটি পরিবেশবান্ধব ফসল, সয়াবিন গাছ শিকড়ে সৃষ্ট গুটি/নডিউলের মাধ্যমে বাতাস হতে নাইট্রোজেন গ্রহণের মাধ্যমে মাটিতে নাইট্রোজেন যোগ করে বিধায় সয়াবিন চাষে ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হয় না;

৪. উদ্ভিজ্জ আমিষ উৎপাদনকারী অন্যান্য ডাল ফসলের তুলনায় সয়াবিনের ফলন এবং আমিষের পরিমাণ উভয়ই বেশি;

৫. বাংলাদেশের মানুষের পুষ্টিহীনতা দূর করতে সয়াবিন বিশেষ ভ‚মিকা রাখতে পারে, কারণ সয়াবিনে সবগুলো অত্যাবশ্যকীয় এমাইনো এসিড সমৃদ্ধ উৎকৃষ্টমানের আমিষ বিদ্যমান যার পুষ্টিমান মাছ-মাংসের ন্যায়। এ ছাড়া সয়াবিনে তেল, কার্বোহাইড্রেট, খনিজ লবণ এবং ভিটামিনের একটি ভালো উৎস।

৬. কোলস্টেরলমুক্ত এবং অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডযুক্ত ভোজ্যতেলের অভাব মিটাতে সয়াবিনের আবাদ বৃদ্ধি বিশেষ গুরুত্ব রাখে;

৭. সয়াবিন মাছ, হাস-মুরগী এবং গৃহপালিত অন্যান্য পশু-পাখির একটি উৎকৃষ্ট খাদ্য;

৮. অন্যান্য মাঠ ফসলের তুলনায় সয়াবিন চাষাবাদ তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ;

৯. সয়াবিন লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসল, তাই দেশের উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকায় সয়াবিন চাষ সম্প্রসারণের সুযোগ আছে;

১০. অন্যান্য ফসলের তুলনায় সয়াবিন চাষে সার, সেচ, কীটনাশক ও পরিচর্যা তুলনামূলকভাবে কম লাগে; এবং

১১. বিভিন্ন মাঠ ফসল (যেমন আম, ভুট্টা) সাথে সয়াবিন আন্তঃফসল/সাথী ফসল হিসেবে চাষ করা যায়।

বাংলাদেশে সয়াবিন আবাদ বৃদ্ধির উপায়সমূহ

১. মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার

মানুষের খাদ্য হিসেবে সয়াবিন সরাসরি বা প্রক্রিয়াজাত করে ব্যবহার করার প্রচলন বাংলাদেশে এখনো শুরু হয়নি। যদিও কয়েকটি কোম্পানি যেমন-অলিম্পিক, ড্যানিশ এবং অলটাইম ইদানীংকালে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে সয়াবিন দিয়ে স্বল্প পরিসরে কিছু খাবার যেমন- সয়াবিস্কুট, সয়াকেকসহ বিভিন্ন খাবার তৈরি করছে।

সয়াবিন হতে মানুষের জন্য বিভিন্ন ধরনের খাদ্য যেমন- সয়াআটা দিয়ে সয়াপরাটা বা রুটি, কেক ও নিমকি, সয়াডাল ভর্তা, সয়াডাল, সয়া ঘুগনী, সয়াবিনের চটপটি, ছোলা বা মটরের মতো সয়াবিন ভাজা, মাছে বা সবজির সাথে সবজি হিসেবে সয়াবিন, সয়াদুধ, সয়াদুধের দধি ও পুডিং, সয়াপিয়াজু, সয়াহালুয়া, সয়াছানা, সয়ামাংস, সয়াসিঙ্গারা, সয়াবিস্কুট, সয়াকেক ইত্যাদি খুব সহজেই তৈরি করা যায়। তাই উচ্চ পুষ্টিগুণসম্পন্ন সয়াবিনকে সরাসরি মানুষের খাদ্য হিসেবে বা প্রক্রিয়াজাতকরণ করে ব্যবহারে উদ্বুদ্ধকরণের জন্য গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার ও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

২. তেল নিষ্কাশন যন্ত্রের ব্যবহার

স্থানীয় ঘানি বা দেশে প্রচলিত এক্সপেলার মেশিনে সয়াবিন থেকে তেল নিষ্কাশন করা যায় না। অত্যাধুনিক নিষ্কাশন মেশিনে বীজ হতে তেল নিষ্কাশন করা যায়, যা আমেরিকা, জাপান, চীন,  ব্রাজিলসহ সয়াবিন উৎপাদনকারী দেশে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে সিটি, মেঘনা ও যমুনা গ্রুপ সয়াবিন হতে তেল নিষ্কাশনের জন্য সীমিতভাবে আধুনিক মেশিন ব্যবহার করছে এবং প্রয়োজনীয় সয়াবিন বিদেশ হতে আমদানি করছে।

পর্যাপ্ত সয়াবিনের জোগানের নিশ্চয়তা পেলে বেসরকারি শিল্প উদ্যোক্তারা অধিকতর উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তেল নিষ্কাশন মেশিন আমদানি করতে উদ্বুদ্ধ হবে। তাছাড়া সরকার শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অত্যাধুনিক এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সয়াবিন তেল নিষ্কাশন মেশিন আমদানি করে কোন বেসরকারি শিল্প উদ্যোক্তাকে দায়িত্ব দিয়ে তেল নিষ্কাশন করাতে পারে। বর্তমান লাভজনক এবং বাণিজ্যিক কৃষিকে বিবেচনায় এনে সরকারি উদ্যোগে বিএডিসির মাধ্যমে গুণগতমানসম্পন্ন বীজ উৎপাদনসহ ডিএই-কে দিয়ে সয়াবিন উৎপাদনে কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে সয়াবিন উৎপাদন করাতে হবে। সয়াবিন আবাদ লাভজনক বিবেচিত হলে কৃষক সয়াবিন চাষে উদ্যোগী হবেন এবং কৃষকগণ অন্য রবি ফসল যেমন- বোরো ধান আবাদ কমিয়ে সয়াবিন চাষে ঝুঁকবে এবং এতে স্বল্প সময়েই দেশে সয়াবিনের চাহিদার অনেকটাই মেটানো সম্ভব হবে। এজন্য কৃষি বিশেষজ্ঞবৃন্দকে দেশের অর্থকরী ও লাভজনক এবং সম্ভাবনাময় ফসল হিসেবে সয়াবিনকে বিবেচনায় আনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভ‚মিকা পালন করতে পারেন। কাজেই সরকার উদ্যোগী হলে দেশের উৎপাদিত সয়াবিন দিয়ে ভোজ্যতেলের চাহিদার অধিকাংশই মেটানো সম্ভব হবে।

উল্লেখ্য, সয়াবিন থেকে তেল নিষ্কাশনের পর সয়ামিল থেকে মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের জন্য পুষ্টি সমৃদ্ধ সয়াময়দাসহ  বিভিন্ন ধরনের খাবার এবং পোলট্রি, গবাদিপশু ও মাছের   খাবারও তৈরি করা যাবে।

৩. বীজ সমস্যা

সয়াবিন বীজ আর্দ্রতার প্রতি খুবই সংবেদনশীল অর্থাৎ কোন কারণে বীজে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি হলে বীজের গুণগতমান অর্থাৎ অংকুরোদগম ক্ষমতা দ্রæত কমে যায় এবং বীজ গজায় না।

বীজের গুণগতমান নির্ভর করে সঠিকভাবে বীজ সংরক্ষণের উপর। বীজের আর্দ্রতা কমিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে বীজ সংরক্ষণ করতে পারলে বীজ গজানোর হার ৯০% পর্যন্ত বজায় রাখা যায়। তাই সঠিক আর্দ্রতায় ও বায়ুরোধী পাত্রে বীজ সংরক্ষণের উপর কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। অপরদিকে বিএডিসি কর্তৃক চাহিদার বিপরীতে বীজ সরবরাহের পরিমাণ খুবই কম এবং বিএডিসি কর্তৃক রবি মৌসুমে উৎপাদিত বীজ পরবর্তী রবি মৌসুমে ভালো গজায় না। তাই বিএডিসি কর্তৃক খরিফ-২ মৌসুমে পর্যাপ্ত বীজ উৎপাদন করে রবি মৌসুমে ব্যবহারের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

খরিফ-মৌসুমে সয়াবিন বীজ উৎপাদন : এ মৌসুমে সয়াবিন বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমন ধানের সহিত প্রতিযোগিতা করতে হয়। তাছাড়া খরিফ-২ মৌসুমে এমন এলাকা নির্বাচন করতে হবে যেসব এলাকা উঁচু অর্থাৎ বন্যার আশংকামুক্ত। এ বিবেচনায় বন্যার আশংকামুক্ত জেলাসমূহ নির্বাচন করে আমন ধাননির্ভর শস্যবিন্যাসসমূহে আমন ধানের পরিবর্তে মানসম্পন্ন সয়াবিন বীজের জন্য সয়াবিনকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সে হিসেবে বর্তমানে চাষকৃত প্রায় ৮০.০০ হাজার হেক্টর জমিতে সয়াবিন চাষের জন্য মানসম্পন্ন সয়াবিন বীজের প্রয়োজন হবে প্রায় ৪,৮০০ টন (হেক্টর প্রতি ৬০ কেজি বীজ হিসেবে) এবং এজন্য প্রায় ২,৪০০ হেক্টর জমির (হেক্টর প্রতি ২.০ টন বীজ উৎপাদন হিসেবে) প্রয়োজন হবে। লাভজনক ফসল আমন ধানকে বাদ দিয়ে কৃষকদের সয়াবিন চাষ করাতে হলে বিএডিসি-কে চুক্তিবদ্ধ কৃষকদের নিকট থেকে রবি মৌসুমের চেয়ে বেশি মূল্যে অর্থাৎ প্রতি কেজি সয়াবিন বীজ ৮০ হতে ৯০ টাকা দরে  ক্রয় করতে হবে। তাছাড়া বীজের গুণগতমানের নিশ্চয়তা দিতে পারলে সয়াবিন চাষের কৃষকগন অধিক মূল্যেও বীজ ক্রয় করতে আগ্রহী হবেন।

৪. বোরো ধানের সহিত প্রতিযোগিতা

বাংলাদেশের মাটি, আবহাওয়া ও পরিবেশ সয়াবিন চাষের জন্য সম্পূর্ণ উপযোগী ও অনুক‚ল এবং ভাল ফলন দিলেও রবি মৌসুমের ফসল হওয়ায় বোরো ধানের সহিত প্রতিযোগিতা করতে হয়।

অপেক্ষাকৃত কম লাভজনক বোরো ধান চাষের পরিবর্তে অধিকতর লাভজনক সয়াবিন আবাদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে রোপা আমন-পতিত -বোরো শস্যবিন্যাস (এ শস্যবিন্যাসে জমির পরিমাণ ২৩.১০ লক্ষ হেক্টর) এর পরিবর্তে  রোপা আমন – সয়াবিন – আউশ শস্যবিন্যাস প্রবর্তন করার বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। উল্লেখ্য, প্রবর্তিত শস্যবিন্যাসে সয়াবিন অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটবে, ফলে পরবর্তী আউশ ও আমন ধান চাষে রাসায়নিক সার কম প্রয়োগ করতে হবে। তাই সয়াবিন অন্তর্ভুক্ত করে ব্যাপকভাবে প্রদর্র্শনী স্থাপন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

৫. অস্থিতিশীল বাজার দর

বর্তমানে দেশের সয়াবিন চাষাধীন এলাকায় সয়াবিনের বাজার দর স্থিতিশীল নয়। বাজার দর উচ্চ এবং স্বাভাবিক/স্থিতিশীল থাকলে  কৃষকগণ নিজেরাই সয়াবিন চাষে আগ্রহী হবেন এবং একটি অর্থকরী ফসল হিসেবে সয়াবিন আবাদ বৃদ্ধির সম্ভাবনা বেশ বৃদ্ধি পাবে। এজন্য মধ্যস্বত্বভোগী বিশেষ করে পাইকার বা আড়তদারগণের পরিবর্তে সরকারিভাবে সয়াবিন ক্রয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

৬. সয়াবিনের উৎপাদন খরচ ফলন

সনাতন পদ্ধতিতে সয়াবিন চাষ হওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং ফলনও কম হয় অর্থাৎ ১.৬৯ টন/হে. মাত্র জমি তৈরি, বীজ বপন, আগাছা বাছাই,  সেচ প্রয়োগ, বালাইনাশক প্রয়োগসহ অন্যান্য পরিচর্যা, ফসল সংগ্রহ ও মাড়াই এবং শুকানো পর্যন্ত কাজগুলো যান্ত্রিকভাবে না করার কারণে উৎপাদন খরচ বেশি হয়। বীজ বপন যন্ত্রের মাধ্যমে বীজ বপন ও পরবর্তীতে নিড়ানি যন্ত্রের সাহায্যে নিড়ানি দিতে পারলে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি ফলনও বেশি পাওয়া যায়। মাঠ হতে সংগ্রহের পর যান্ত্রিকভাবে সয়াবিন মাড়াই করতে পারলে পোস্ট হারভেস্ট ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। তাছাড়া দেশে সয়াবিন চাষে কোন প্রণোদনার ব্যবস্থা নাই, তাই সয়াবিন চাষে সরকারকে সেচসহ অন্যান্য কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন বীজ বপন, নিড়ানি, সংগ্রহ ও মাড়াইযন্ত্রের উপর প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে।

৭. সয়াবিন চাষে জীবাণুসারের ব্যবহার সঠিক মাত্রায় রাসায়নিক সার প্রয়োগ 

দেশে সয়াবিন চাষে জীবাণুসারসহ রাসায়নিক সারের ব্যবহার খুবই কম, ফলে ফলনও অনেক কম। অথচ জীবাণুসার এবং সঠিক মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহারে সয়াবিনের ফলন অনেকাংশে বৃদ্ধি করা সম্ভব।

গবেষণায় দেখা গেছে জীবাণুসার ব্যবহারে সয়াবিনের ফলন ৭৫-২০০% এবং সঠিক মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহারে   ২৫-২৭% বৃদ্ধি করা সম্ভব। তাই সয়াবিন চাষে সুষম মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহার নিশ্চিত করা ও জীবাণুসারের প্রাপ্যতাসহ এর ব্যবহার বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এজন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেমন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং ডিএইর  সমন্বয়ে সঠিক মাত্রায় রাসায়নিক ও জীবাণুসার ব্যবহারে কৃষকদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে ব্যাপকভাবে ফলাফল প্রদর্শন, মাঠ দিবস আয়োজন এবং কৃষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

৮. উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত এবং পতিত জমিতে সয়াবিন চাষ

উপকূলীয় খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ভোলা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষীপুর, ফেনী এবং চাঁদপুর জেলার ২.৮৫ মিলিয়ন হে. জমিতে স্বল্প থেকে মধ্যম মাত্রা পর্যন্ত লবণাক্ততা (৪-৯ ডিএস/মি.) বিধায় এ অঞ্চলের চাষযোগ্য জমির অধিকাংশই পতিত থাকে।

সয়াবিন জেনেটিক্যালি মধ্যম মাত্রার লবণাক্ততা (৮-৯ ডিএস/মি. পর্যন্ত) সহনশীল, তাই নিম্ন হতে মধ্যম মাত্রার লবণাক্ত উপকূলীয় এলাকায় সয়াবিন চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে আশানুরূপ ফলন পাওয়াও সম্ভব। চারা অবস্থা থেকে ফল পরিপক্ব হওয়া পর্যন্ত সয়াবিন মধ্যম মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে বিধায় উপকূলীয় অঞ্চলে সহজেই সয়াবিন চাষে কোনো সমস্যা হবে না।

উল্লেখ্য, দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ফলে দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় বিগত তিন বছরে এই আমদানি হার পূর্ববর্তী বছরগুলো তুলনায় আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মাথাপিছু দৈনিক ৪০ গ্রাম হারে ২০২১ সালে দেশে শুধুমাত্র ভোজ্যতেলেরই চাহিদা দাঁড়াবে প্রায় ২৫ লক্ষ টন। উপরোল্লিখিত উপায়ে দেশে সয়াবিন আবাদ বৃদ্ধি করা গেলে উৎপাদিত সয়াবিন হতে তেল আহরণ করে দেশে ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব হবে এবং পুষ্টি নিরাপত্তায়ও অগ্রগতি আসবে।

লেখক: মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ-২২০২।

This post has already been read 890 times!

Fixing WordPress Problems developed by BN WEB DESIGN