২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮, ১৫ মে ২০২১, ৪ শাওয়াল ১৪৪২
শিরোনাম :

ধানের খোলপোড়া রোগ ও নিয়ন্ত্রণের উপায়

Published at এপ্রিল ২৮, ২০২১

নাজনীন নাহার অনন্যা: কৃষি হলো এমন একটি বিষয় যা আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ যেভাবেই হোক না কেনো প্রতি মুহূর্ত আমরা বেঁচে আছি এর উপর ভিত্তি করেই।কৃষির সাথে সম্পর্কিত ক্ষেত্র এতটাই বিস্তীর্ণ যে তার সবকিছু সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ সত্যিই দুষ্কর।তবুও আমরা প্রয়াস চালিয়ে যাই ক্রমেই এর গভীর থেকে আরও গভীরে পদার্পণের।আর সেই প্রয়াস থেকেই আজ আমরা জানব ধানের খোলপোড়া রোগের কিছু কথা।

আমাদের ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হল বিভিন্ন রোগব্যাধি। আর যেহেতু আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি। তাই ভাত তথা ধানের দিকে একটু যেনো বেশি নজর চলেই যায়।ধানের বিভিন্ন প্রকার রোগ দেখা যায় যেমন উফরা রোগ,পাতা ঝলসানো রোগ,গুড়িপঁচা রোগ,ফোস্কা রোগ,ব্লাইট রোগ,বাকানি রোগ,বাদামী রোগ ইত্যাদি।এগুলোর মধ্যে একটি হল খোলপোড়া রোগ।

খোলপোড়া রোগ কী

খোলপোড়া বা Sheath blight হল ধানের এমন একটি রোগ যাতে ধানগাছের খোলে ডিম্বাকৃতির সবুজ থেকে ধূসর বর্ণের ১-৩ সে.মি. লম্বা জলসিক্ত দাগ পড়ে। ধানগাছের কুশিস্তর থেকে এর বিস্তার শুরু হয়। পাতা ও কান্ডে দাগগুলোর কেন্দ্রস্থল ধূসর ও সাদা হয় এবং পাতার কিনারার দিকে বাদামী হয়ে থাকে।রোগ বাড়তে থাকলে ক্রমেই উপরের অংশগুলোও সংক্রমিত হয় এবং সম্পূর্ণ অংশ ঝলসে যায়। রোগটির কারণ হল Rhizoctonia solani নামক এক প্রকার ছত্রাকের আক্রমণ।আউশ ও আমন মৌসুমে সাধারণত এ রোগটি হয়ে থাকে।মাটি ও পরিত্যক্ত খড়কুটায় ছত্রাক থাকে।আর সেখানে থেকেই এ রোগটির সংক্রমণ হয়।

রোগ সংক্রমণের উপযুক্ত পরিবেশ

২৮-৩২ সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা,৮৫-১০০% আপেক্ষিক আর্দ্রতা এবং অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সারের ব্যবহারে এ রোগ বৃদ্ধি পায়।এছাড়াও ইউরিয়া সারের ব্যবহার বেশি হলেও এ রোগ হয়ে থাকে। বর্ষাকাল এ রোগ সংক্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।ধানগাছের পাতাগুলো কাছাকাছি থাকলে তা পরস্পরের সংস্পর্শে এসে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।এছাড়াও এ রোগের ছত্রাক স্ক্লেরোশিয়াম আকারে কয়েক বছর মাটিতে থেকে যেতে পারে। তাই যখনই তা নতুন পাতার সংস্পর্শে আসে তখনই সংক্রমণ ঘটায়।

রোগ নিয়ন্ত্রণ

রোগ দেখা গেলে বিঘাপ্রতি ৫ কেজি পটাশ সার উপরি প্রয়োগ এবং প্রোপিকোনাজল(টিল্ট ২৫০ইসি) কিংবা টেবুকোনাজল (ফলিকুর ২৫০ ইসি) বা হেক্সাকোনাজল (কনটাফ ৫ ইসি) প্রতি লিটার পানিতে এক মিলি হারে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ৩/৪ বার স্প্রে করতে হবে।এছাড়াও ভ্যালিডামাইসিন ২ মিলি এক লিটারে মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর স্প্রে করা যায়। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার আওতায় জৈবিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সর্বদা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে হবে।

রোগ প্রতিরোধ

আমরা জানি যে রোগ প্রতিরোধ সবসময়ই প্রতিকারের চেয়ে অধিকতর ভালো উপায়।তাই আমাদের প্রথমেই সচেতন হওয়া উচিৎ যেনো ধানের এই রোগটি প্রতিরোধ করা যায়।

১. এক্ষেত্রে প্রথমেই ধানে ব্যবহৃত সারের পরিমাণ সঠিক করতে হবে।

২. নির্দিষ্ট দূরত্বে গাছ রোপণ করতে হবে যেনো একটি গাছ অন্যটির সংস্পর্শে না আসে। (সারি থেকে সারি ২৫সে.মি. এবং গাছ থেকে গাছ ১৫/২০সে.মি.)

৩.নামলা চাষের পরিকল্পনা করা উচিৎ।

৪. ধানের বীজ যেনো সুস্থ হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

৫.রোগ বহনকারী আগাছা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

৬.কোনো গাছ যদি সংক্রমিত হয়েও যায় তবে প্রথমেই তা নিষ্কাশিত করতে হবে যেনো ছড়িয়ে না পড়ে।

৭.বীজ ছত্রাকনাশক কিনা তা খেয়াল রাখতে হবে।

৮.রোগ সহনশীল জাত যেমন বি আর-১০,২২,২৩, ব্রি-২৯,৩২,৩৯,৪২ রোপণ করা যেতে পারে।

৯. রোগ দেখা দিলে জমির পানি শুকিয়ে ৭-১০ দিন পর আবার সেচ দিতে হবে।

১০.ফসল কাটার পর ক্ষেতের নাড়া পুড়িয়ে ফেলা।

১১.যেসব এলাকায় এ রোগের সংক্রমণ বেশি সেসব এলাকায় খাটো জাতের পরিবর্তে লম্বা জাত ব্যবহার করা।

ধানের খোলপোড়া রোগের বিস্তার বেশি হয়ে গেলে তা ফলন অনেকাংশে নষ্ট করে দেয়। যেনো ধানক্ষেতের কিছু স্থান আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।তাই অন্যান্য রোগগুলোর মতই এ রোগটি প্রতিরোধেও যথেষ্ট সচেতন হওয়া আবশ্যক।

লেখক: শিক্ষার্থী, কৃষি অনুষদ, লেভেল-২,সেমিস্টার-১, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

This post has already been read 346 times!

Fixing WordPress Problems developed by BN WEB DESIGN