অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানো, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলা ও ভ্যাকসিনেশন জোরদারে গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিলেন বিশেষজ্ঞগণ

সাভার সংবাদদাতা: প্রাণিসম্পদ খাতকে আরও লাভজনক ও টেকসই করতে হলে উৎপাদন ব্যয়ের বড় দুটি ক্ষেত্র—খাদ্য ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার খরচ কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) মোকাবিলা, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিনেশনের সম্প্রসারণ এবং উন্নত পশুখাদ্য উদ্ভাবনে গবেষণা জোরদার করা প্রয়োজন। প্রাণিসম্পদ খাতের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে এসব বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুছ ছালাম।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকালে সাভারে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত ‘বার্ষিক গবেষণা পর্যালোচনা কর্মশালা ২০২৬’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. মো. আবদুছ ছালাম বলেন, জাতীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কৃষি এবং প্রাণিসম্পদ খাতের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। এ অগ্রযাত্রার পেছনে বিএলআরআইয়ের বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণা এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সম্প্রসারণকর্মীদের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তবে প্রাণিসম্পদ খাতকে লাভজনক করে তোলা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উৎপাদন ব্যয় কমানোর বিকল্প নেই। বিশেষ করে খাদ্য ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার খরচ কমাতে কার্যকর গবেষণা ও প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, কৃষি খাতে ইতোমধ্যে গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (জিএপি) পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে। প্রাণিসম্পদ খাতের জন্যও গুড লাইভস্টক প্র্যাকটিস (জিএলপি)-এর খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং খামারের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
প্রাণিসম্পদ গবেষণার অগ্রাধিকার তুলে ধরে বিএআরসি নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি গবেষণায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা জীবাণুর ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠার ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর গবেষণা প্রয়োজন। অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমাতে হবে এবং রোগ প্রতিরোধের ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি সীমান্ত অতিক্রমকারী সংক্রামক রোগ (ট্রান্সবাউন্ডারি ডিজিজ) নিয়ন্ত্রণে গবেষণা ও কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভ্যাকসিনেশনকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রাণিসম্পদের খাদ্য ব্যয় কমাতে উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ উন্নত পশুখাদ্য বা হাই-প্রোটিন এনরিচড ফডার উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে কাজ করতে হবে। এতে পশুখাদ্যের ব্যয় কমার পাশাপাশি খামারের উৎপাদনশীলতা ও মুনাফা বাড়বে। একই সঙ্গে দেশীয় প্রাণিসম্পদের স্থানীয় জাত সংরক্ষণ এবং উন্নত ক্রস ব্রিড উদ্ভাবনের মাধ্যমে দুধের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বিএলআরআইয়ের মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক বলেন, দুই দিনব্যাপী কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের কাছ থেকে পাওয়া সুপারিশগুলো ইনস্টিটিউটের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকারভিত্তিতে গবেষণা পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। জাতীয় চাহিদা ও খাতসংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধানকে সামনে রেখেই বিএলআরআই তার গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
দেশীয় মুরগির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিএলআরআই ইতোমধ্যে দেশি মুরগির জাত উন্নয়নে কাজ করছে। বাচ্চা অবস্থায় সঠিক ব্রুডিং নিশ্চিত করা এবং খাদ্যসহ অন্যান্য ব্যবস্থাপনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা গেলে দেশি মুরগির উৎপাদন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
ফিড গবেষণার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রাণিখাদ্য নিয়ে বিএলআরআইয়ে ব্যাপক কাজ হয়েছে। তবে উৎপাদন ব্যয় কমাতে এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি ঘাসের সর্বোত্তম ব্যবস্থাপনা বা বেস্ট ম্যানেজমেন্ট প্র্যাকটিস অনুসরণ করে ঘাসভিত্তিক প্রাণী পালন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে গবাদিপশু পালন করলে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের পরিমাণও হ্রাস করা সম্ভব।
ড. শাকিলা ফারুক আরও বলেন, প্রাণিসম্পদের উন্নত জাত উদ্ভাবন ও ভ্যাকসিন নিয়ে বিএলআরআইয়ের গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সীমিত বাজেট ও জনবল নিয়েও জাতীয় চাহিদার আলোকে গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে দুই দিনব্যাপী কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও সুপারিশমালা উপস্থাপন করেন বিএলআরআইয়ের পরিচালক (গবেষণা) ড. মো. জিল্লুর রহমান। পরে উন্মুক্ত আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। পর্বটি পরিচালনা করেন বিএলআরআইয়ের মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক।
সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় গো প্রজনন ও দুগ্ধ খামার, সাভার, ঢাকার পরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম। সম্মানীয় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের সদস্য ড. এ. এস. এম. গোলাম হাফিজ।
দুই দিনব্যাপী এ কর্মশালায় মোট ছয়টি গবেষণা সেশনে ৩৩টি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপনের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে নিউট্রিশন, ফিডস অ্যান্ড ফিডিং ম্যানেজমেন্ট; অ্যানিম্যাল অ্যান্ড পোল্ট্রি ডিজিজ অ্যান্ড হেলথ; অ্যানিম্যাল অ্যান্ড পোল্ট্রি ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিকস; বায়োটেকনোলজি, ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স, ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ডেইরি রিসার্চ এবং সোশিও-ইকোনোমিকস অ্যান্ড ফার্মিং সিস্টেম রিসার্চসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণা উপস্থাপন করা হয়। পাশাপাশি বিএলআরআইয়ের চলমান গবেষণা কার্যক্রমের ওপর ৩৭টি পোস্টার প্রদর্শন করা হয়।
কর্মশালায় আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশ নেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রাণী ও পোল্ট্রি উৎপাদন এবং খামার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, খামারি এবং বিএলআরআইয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তারা।
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে সমাপ্ত গবেষণার ফলাফল ও অগ্রগতি পর্যালোচনা, গবেষণার সীমাবদ্ধতা চিহ্নিতকরণ এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণের লক্ষ্যে ৪ ও ৫ নভেম্বর দুই দিনব্যাপী এ কর্মশালার আয়োজন করে বিএলআরআই।

