
ড. মনিরুল ইসলাম: বাংলাদেশে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, আমদানিনির্ভর জ্বালানির উচ্চ ব্যয়, লোডশেডিং এবং শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকট বিবেচনায় পল্লী উন্নয়ন একাডেমী-আরডিএ, বগুড়ায় আমাদের উদ্ভাবক দল ফ্লাইহুইলভিত্তিক গ্রিন পাওয়ার প্রযুক্তির একটি কার্যকর প্রোটোটাইপ তৈরি করেছে। এ ব্যবস্থায় মোটর, ভেরিয়েবল ফ্রিকোয়েন্সি ড্রাইভ, গিয়ারবক্স, ভারী ফ্লাইহুইল, শ্যাফট, বিয়ারিং এবং ১৫০ আরপিএমের স্থায়ী চুম্বক জেনারেটর ব্যবহার করা হয়েছে। মোটরের মাধ্যমে ফ্লাইহুইলে ঘূর্ণনশক্তি সঞ্চিত হয় এবং প্রয়োজনের সময় সেই শক্তি জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়ে আকস্মিক লোড, ভোল্টেজ ও কম্পাঙ্কের ওঠানামা এবং স্বল্পমেয়াদি বিদ্যুৎঘাটতি সামাল দিতে পারে।
পরীক্ষামূলক প্রদর্শনীতে ৫০০ ওয়াট প্রাথমিক ইনপুটের পর সঞ্চিত ঘূর্ণনশক্তির সহায়তায় স্বল্প সময়ের জন্য প্রায় ৩ হাজার ওয়াট আউটপুট দেখানো এবং একটি সাবমার্সিবল পাম্প চালানো হয়েছে; পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ পাইলট প্রকল্পে মোট ইনপুট ও আউটপুট কিলোওয়াট-ঘণ্টা, কর্মদক্ষতা, তাপমাত্রা, কম্পন, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব স্বাধীনভাবে যাচাই করা হবে।
ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি শুধু আমাদের গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নয়; যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও পেনসিলভানিয়ায় ২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ফ্লাইহুইল কেন্দ্র বিদ্যুৎ গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হচ্ছে, চীনের শানসি প্রদেশে ৩০ মেগাওয়াটের ডিংলুন ফ্লাইহুইল প্রকল্প ১১০ কেভি গ্রিডে যুক্ত হয়েছে এবং আয়ারল্যান্ডের মানিপয়েন্টে বৃহৎ ফ্লাইহুইলযুক্ত সিনক্রোনাস কনডেনসার নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎসমৃদ্ধ গ্রিডে জড়তা ও স্থিতিশীলতা সরবরাহ করছে।
গবেষক দলের প্রাথমিক তুলনামূলক হিসাব অনুযায়ী, এক মেগাওয়াট ফ্লাইহুইল গ্রিন পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনে প্রায় ২৫ কোটি টাকা, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের ব্যয় লক্ষ্যমাত্রা ১ টাকা, সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল ৪০ বছর এবং প্রকল্পজীবনে সম্ভাব্য সাশ্রয় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা; বিপরীতে একই ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে আনুমানিক ১১০ কোটি টাকা, প্রতি ইউনিট ৬ টাকা, আয়ুষ্কাল ২৫ বছর এবং সম্ভাব্য সাশ্রয় ৯০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। অর্থাৎ প্রাথমিক হিসাবে সৌরের তুলনায় ফ্লাইহুইলের স্থাপন ব্যয় ৮৫ কোটি টাকা কম, ইউনিটপ্রতি ব্যয় ৫ টাকা কম এবং আয়ুষ্কাল ১৫ বছর বেশি। একইভাবে এক মেগাওয়াট ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎব্যবস্থার তুলনামূলক মোট ব্যয় প্রায় ৩৫৮ কোটি টাকা, প্রতি ইউনিট ২১ টাকা এবং আয়ুষ্কাল ২৫ বছর ধরা হলে ফ্লাইহুইলে সম্ভাব্য ব্যয় ৩৩৩ কোটি টাকা এবং ইউনিটপ্রতি প্রায় ২০ টাকা কম হতে পারে।
তবে সৌরবিদ্যুৎ সূর্যের আলো থেকে নতুন শক্তি উৎপাদন করে, আর ফ্লাইহুইল মূলত শক্তি সঞ্চয়, দ্রুত সরবরাহ ও গ্রিড স্থিতিশীলতার কাজ করে; তাই এ দুটিকে প্রতিযোগী না ভেবে পরিপূরক প্রযুক্তি হিসেবে দেখা উচিত। সৌরবিদ্যুতের উদ্বৃত্ত শক্তি ফ্লাইহুইলে সঞ্চয় করে সন্ধ্যার পিক চাহিদা, সেচপাম্প, হিমাগার, হাসপাতাল, পোশাকশিল্প, ইপিজেড ও অন্যান্য শিল্পকারখানায় সরবরাহ করা গেলে ডিজেল জেনারেটরের ব্যবহার, জ্বালানি আমদানি, উৎপাদন বন্ধ থাকা এবং কাঁচামালের অপচয় কমবে; একই সঙ্গে দেশের উৎপাদনশীলতা, রপ্তানি সক্ষমতা ও জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়বে।
এ হিসাবগুলো এখনো গবেষক দলের প্রাথমিক প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন; তবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পূর্ণাঙ্গ পাইলট পরীক্ষা, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ যাচাই এবং দেশীয়ভাবে যন্ত্রাংশ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা গেলে ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি বাংলাদেশের সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: উপপরিচালক, পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (আরডিএ), বগুড়া
ইমেল: monirul@rda.gov.bd



