
মো. খোরশেদ আলম জুয়েল: তেলাপিয়া উৎপাদনে বাংলাদেশের তিন দশকের সাফল্য এবার আফ্রিকার দেশ কেনিয়ার কাছে অনুসরণীয় মডেল হয়ে উঠেছে। উন্নত জাতের জিআইএফটি (GIFT) তেলাপিয়ার উৎপাদন, ব্রুডস্টক ব্যবস্থাপনা, মানসম্মত পোনা উৎপাদন এবং হ্যাচারি থেকে খামার পর্যায়ে এর বিস্তারে বাংলাদেশের অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজেদের তেলাপিয়া খাতকে আরও শক্তিশালী করতে চায় কেনিয়া। সম্প্রতি দেশটির গবেষক ও কর্মকর্তারা বাংলাদেশ সফর করে এই ব্যবস্থাপনা সরেজমিনে দেখেছেন। এসব তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মৎস্য ও জলজ খাদ্য গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিশ।
ওয়ার্ল্ড ফিশ (WorldFish) -এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে তেলাপিয়া উৎপাদন ছিল মাত্র ২ হাজার ১৪০ টন। ধারাবাহিক গবেষণা, উন্নত জাতের পোনা, নির্বাচিত প্রজনন, হ্যাচারি প্রযুক্তি এবং বাণিজ্যিক চাষের বিস্তারের ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে তেলাপিয়া উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৫৫৭ মেট্রিক টনে। বর্তমানে তেলাপিয়া উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। একই সময়ে দেশের বেসরকারি হ্যাচারিগুলো প্রায় ৪০০ কোটি তেলাপিয়া পোনা উৎপাদন করেছে।
এই সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে GIFT বা জেনেটিক্যালি ইমপ্রুভড ফার্মড তেলাপিয়া। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশে প্রথম GIFT পোনা আসে। এরপর গবেষণা ও নির্বাচিত প্রজননের মাধ্যমে এর উৎপাদন ও বিস্তার বাড়তে থাকে। ২০০৫ সালে মালয়েশিয়া থেকেও ৩০টি GIFT পরিবারের ৭৫০টি ফিঙ্গারলিং তেলাপিয়া বাংলাদেশে আনা হয়। দীর্ঘদিনের গবেষণা ও ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এখন উন্নত জাতের তেলাপিয়ার পোনা উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে।
বাংলাদেশের এই সাফল্য ও অভিজ্ঞতাই এখন কেনিয়ার আগ্রহের মূল কারণ। দেশটির জন্য শুধু উন্নত জাতের মাছ আমদানি করাই যথেষ্ট নয়; GIFT-এর জেনেটিক গুণগত মান ধরে রাখা, ব্রুডস্টক ব্যবস্থাপনা, মানসম্মত পোনা উৎপাদন এবং দক্ষ জনবল তৈরি করাও জরুরি। এসব বিষয়ে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখতে সম্প্রতি কেনিয়া ও ঘানার গবেষক, সরকারি কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেন।

সফরকালে তারা বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ময়মনসিংহের বেসরকারি হ্যাচারি ও মাছের খামার পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁরা বাংলাদেশের স্বনামধন্য বেসরকারি কোম্পানি Fishtech Hatchery Limited-এর বাণিজ্যিকভাবে তেলাপিয়া পোনা উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপ পর্যবেক্ষণ করেন। প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ১০ কোটি তেলাপিয়া পোনা বিক্রি করে। ব্রুডস্টক ব্যবস্থাপনা থেকে ডিম সংগ্রহ, ইনকিউবেশন এবং নার্সারি পর্যায়ে পোনা উৎপাদনের প্রক্রিয়াও সরেজমিনে দেখেন সফরকারীরা।
ময়মনসিংহের চর বারবিলা গ্রামের একটি মাছের খামারও পরিদর্শন করেন তারা। সেখানে পারিবারিক পর্যায়ে GIFT তেলাপিয়া চাষের পাশাপাশি কার্প ও ক্যাটফিশ উৎপাদন দেখেন সফরকারীরা। অর্থাৎ গবেষণাগার ও আধুনিক হ্যাচারি থেকে শুরু করে সাধারণ কৃষকের পুকুর পর্যন্ত উন্নত জাতের তেলাপিয়ার বিস্তারের যে বাস্তব কাঠামো বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে, সেটিই কেনিয়ার জন্য বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।
কেনিয়ার মেরিন অ্যান্ড ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (KMFRI) সাগানা সেন্টারের সিনিয়র রিসার্চ সায়েন্টিস্ট ড. জ্যাকব আবওয়াও বলেন, ভালো মানের পোনা পাওয়ার পাশাপাশি সেই গুণগত মান ধরে রাখার কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। কেনিয়ার স্টেট ডিপার্টমেন্ট ফর দ্য ব্লু ইকোনমি অ্যান্ড ফিশারিজের সহকারী পরিচালক জন কোয়ানিয়া এনগিচোর মতে, সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি হ্যাচারির সমন্বয়ে বাংলাদেশের যে ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, কেনিয়াও GIFT সম্প্রসারণে এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলতে চায়।
বাংলাদেশ সফরের পর সহযোগিতার উদ্যোগও এগিয়েছে। WorldFish জানিয়েছে, সফরের দুই সপ্তাহের মধ্যে KMFRI GIFT ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে কারিগরি সহযোগিতা চেয়ে বিএফআরআইকে চিঠি দিয়েছে। কেনিয়া ও ঘানার সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণা ও প্রশিক্ষণ সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে যোগাযোগের পরিকল্পনা করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের GIFT অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু উন্নত জাতের মাছ উৎপাদন নয়; বরং গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি হ্যাচারি এবং খামারিকে একটি উৎপাদনব্যবস্থার মধ্যে যুক্ত করা। সেই অভিজ্ঞতাই এখন বাংলাদেশের মৎস্য খাতের সাফল্যকে দেশের সীমানার বাইরে নিয়ে যাওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
WorldFish-এর তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ১৯৯৯ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে তেলাপিয়া উৎপাদন যে গতিতে বেড়েছে, তা দেশের মৎস্য খাতের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য। আর সেই সাফল্যের অভিজ্ঞতা এখন কেনিয়ার GIFT সম্প্রসারণের পরিকল্পনায় কাজে লাগতে যাচ্ছে -যা বাংলাদেশের মৎস্য গবেষণা, হ্যাচারি ও চাষ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও বটে।

