
বাগেরহাট সংবাদদাতা: মাছ ও চিংড়ি চাষে উৎপাদন বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ এবং সঠিক খামার ব্যবস্থাপনা এবং খামারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব, ও পুকুরের পরিবেশ, পানির গুণগত মান, তুলে ধরে বাগেরহাটের সাইনবোর্ড এলাকায় এডভান্স এগ্রোটেক বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে প্রশিক্ষণ কর্মশালা ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) এডভান্স এগ্রোটেক বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে স্থানীয় পরিবেশক প্রতিষ্ঠান হাবিব এন্টারপ্রাইজের সহযোগিতায় এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে প্রায় ৫০ জন স্থানীয় মাছ ও চিংড়িচাষি, খামারি, হ্যাচারি মালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ী অংশগ্রহণ করেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা গাজী মনিরুল ইসলাম। স্থানীয় আয়োজনে সহযোগিতা করেন হাবিব এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ। মূল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ অ্যাকুয়া প্রোডাক্ট কোম্পানি অ্যাসোসিয়েশনের (বাপকা) সাবেক সভাপতি ও অ্যাডভান্স অ্যাগ্রোটেক বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান। কারিগরি প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন প্রতিষ্ঠানের কারিগরি ও বিপণন বিভাগের প্রধান কৃষিবিদ রেজাউল হক। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রতিষ্ঠানের যশোর ও বাগেরহাট অঞ্চলের নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন।
পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন মাওলানা আবদুল হান্নান।
মূল আলোচনায় মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান মাছ ও চিংড়ি চাষে প্রোবায়োটিকের বৈজ্ঞানিক ভূমিকা এবং সঠিক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পুকুরের উৎপাদনশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে মাটি ও পানির গুণগত মান, দ্রবীভূত অক্সিজেন, অ্যামোনিয়া, পিএইচ এবং তলদেশে জমে থাকা জৈব বর্জ্যের ওপর। এসব উপাদানের ভারসাম্য নষ্ট হলে মাছ ও চিংড়ির স্বাভাবিক বৃদ্ধি, খাদ্য গ্রহণ ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, উপযুক্ত উপকারী অণুজীব জৈব বর্জ্য পচন ও পুকুরের পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করতে পারে। তবে প্রোবায়োটিক ব্যবহার কখনোই পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ, নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা এবং সঠিক খামার ব্যবস্থাপনার বিকল্প নয়। চাষিদের নিয়মিত ভোরে দ্রবীভূত অক্সিজেন পরীক্ষা, পানির পিএইচ পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যামোনিয়া ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরামিতি যাচাইয়ের পরামর্শ দেন তিনি।
অপ্রয়োজনীয় বা অকার্যকর পণ্য ব্যবহারে অর্থ অপচয় না করে পুকুরের অবস্থা ও সমস্যার ধরন অনুযায়ী মানসম্মত পণ্য নির্বাচন এবং নির্ধারিত মাত্রায় প্রয়োগের ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
কারিগরি প্রশিক্ষক কৃষিবিদ রেজাউল হক তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি খাতে চিংড়ি চাষের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি পুকুর প্রস্তুতি, তলদেশের মাটি পরীক্ষা, চুন ও প্রয়োজনীয় উপকরণের সঠিক ব্যবহার, মানসম্মত ও রোগমুক্ত পিএল (পোস্ট লার্ভা) নির্বাচন এবং মজুতের আগে পানির তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার সঙ্গে পিএল-এর পরিবেশগত অভিযোজনের বিষয়ে আলোচনা করেন।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত ঘনত্বে পোনা মজুত, অপরিকল্পিত খাদ্য প্রয়োগ এবং পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণে অবহেলা চাষের ঝুঁকি বাড়ায়। নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ করে মাছ ও চিংড়ির গড় ওজন, দৈহিক বৃদ্ধি, বেঁচে থাকার হার এবং মোট বায়োমাস নির্ণয় করতে হবে। খাদ্য প্রয়োগের ক্ষেত্রে ট্রে বা ফিডিং ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করে পরিমাণ সমন্বয় করলে খাদ্যের অপচয় কমানো এবং খাদ্য রূপান্তর অনুপাত (এফসিআর) উন্নত করার সুযোগ থাকে।
রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে তিনি জৈব নিরাপত্তা, খামারে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত রাখা, সুস্থ পোনা নির্বাচন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। রোগের লক্ষণ দেখা দিলে কারণ শনাক্ত না করে ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন। প্রয়োজনে রোগ নির্ণয়ের জন্য বিশেষজ্ঞ বা স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তার সহায়তা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের খামারের বিভিন্ন সমস্যা ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। আলোচকরা তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দেন এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ প্রদান করেন। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে চাষিদের মধ্যে এডভান্স এগ্রোটেক বাংলাদেশ-এর মাছ চাষবিষয়ক বই ও টি-শার্ট বিতরণ করা হয়।
স্থানীয় অংশগ্রহণকারীরা এ ধরনের উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতেও নিয়মিত কারিগরি প্রশিক্ষণ আয়োজনের আহ্বান জানান। তাঁদের মতে, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে এ ধরনের কর্মসূচি চাষিদের উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং লাভজনক চাষ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করতে পারে।

