
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের পেট সেক্টর আগামী দিনে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় শিল্পখাতে পরিণত হবে বলে মন্তব্য করেছেন এসিআই পিএলসির গ্রুপ অ্যাডভাইজার ড. এফএইচ আনসারী। তিনি বলেন, মানুষের জীবনযাত্রা ও পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে দেশে পোষা প্রাণীর প্রতি আগ্রহ ও সম্পৃক্ততা দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে পোষা প্রাণীর স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের চাহিদা। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রাণিচিকিৎসা, পুষ্টি, ভ্যাকসিন, রোগ নির্ণয়, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক ক্লিনিক্যাল সেবার সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন।
আজ শুক্রবার (২ অক্টোবর) কক্সবাজারে প্রথমবারের মতো আয়োজিত ‘1st BASAVA Pet Summit 2026’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ স্মল অ্যানিমাল ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশন (BASAVA) আয়োজিত এ সম্মেলনে দেশের পেট সেক্টরের বর্তমান পরিস্থিতি, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়।
দেশের প্রথম পেট সামিট আয়োজনের জন্য BASAVA-কে অভিনন্দন জানিয়ে ড. এফএইচ আনসারী বলেন, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজারে এমন একটি আয়োজন বাংলাদেশের পেট স্বাস্থ্য ও পেট সেক্টরের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এ আয়োজনে কো-পার্টনার হিসেবে যুক্ত হতে পেরে এসিআই গর্বিত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোতে পরিবর্তন আসছে। যৌথ পরিবারের পরিবর্তে একক পরিবার বাড়ছে। পড়াশোনা ও কর্মসংস্থানের কারণে পরিবারের অনেক সদস্যকে দূরে বসবাস করতে হচ্ছে। এ বাস্তবতায় মানুষের জীবনে পোষা প্রাণীর সঙ্গে মানসিক ও পারিবারিক সম্পৃক্ততা বাড়ছে। প্রবীণদের একাকিত্ব কমাতে পোষা প্রাণী ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে শিশুদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতা তৈরিতেও পোষা প্রাণীর ভূমিকা রয়েছে। ফলে পোষা প্রাণী এখন আর শুধু ঘরে পালিত প্রাণী নয়; অনেক পরিবারের কাছেই তারা পরিবারের একজন সদস্য।
দেশের পেট মার্কেটের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে ড. আনসারী বলেন, বাংলাদেশের পেট মার্কেটের আকার বর্তমানে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা এবং এ খাত প্রতিবছর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। এর মধ্যে পেট ফুডের অংশ প্রায় ৬০ শতাংশ। ভেটেরিনারিয়ান, পেট প্র্যাকটিশনার, আমদানিকারক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্মিলিত উদ্যোগেই এ খাতের বর্তমান বাজার গড়ে উঠেছে। তবে বাজারের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বও বাড়ছে।
তিনি বলেন, পোষা প্রাণীর জন্য প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত পুষ্টি ও ভ্যাকসিন, প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা এবং ‘One Health’ পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রাণীর স্বাস্থ্য, মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ—এই তিনটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করেই পেট সেক্টরের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
পেট প্র্যাকটিশনারদের এ খাতের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে ড. এফএইচ আনসারী বলেন, প্রতিটি নতুন পেট পরিবারের জন্য একজন বিশ্বস্ত ভেটেরিনারিয়ানের প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন শহর ও নগরে আধুনিক পেট ক্লিনিকের চাহিদাও বাড়বে। রোগ নির্ণয়, সার্জারি, পুষ্টি ব্যবস্থাপনা ও ক্লায়েন্ট কেয়ারে দক্ষতা অর্জন তরুণ ভেটেরিনারিয়ানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠবে। আজকের তরুণ ভেটেরিনারিয়ানদের মধ্য থেকেই আগামী দিনে দেশের বিশ্বমানের পেট হাসপাতাল গড়ে উঠতে পারে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পেট সেক্টরে এসিআইয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে ড. আনসারী বলেন, মানুষের জীবনমান উন্নয়নে জ্ঞান, দক্ষতা ও প্রযুক্তির দায়িত্বশীল প্রয়োগ এবং বিশ্বমানের পণ্য ও উদ্ভাবনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উৎকর্ষ অর্জন এসিআইয়ের অন্যতম লক্ষ্য। পেট সেক্টরে এর বাস্তব প্রয়োগের অর্থ হলো—সুস্থ পোষা প্রাণী, সুখী পরিবার এবং সুস্থ সমাজ।
তিনি বলেন, কোনো খাতই বিচ্ছিন্নভাবে টেকসইভাবে এগিয়ে যেতে পারে না; পুরো ভ্যালু চেইনের সমন্বিত উন্নয়নের মাধ্যমেই একটি খাত শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়। সেই লক্ষ্যেই বাংলাদেশের পেট সেক্টরের জন্য ভবিষ্যতে প্রজনন, গবেষণা ও উন্নয়ন, পেট ফুড ও পুষ্টি, ওষুধ ও ভ্যাকসিন, রোগ নির্ণয়, ভেটেরিনারিয়ানদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, পেট কেয়ার পণ্য ও রিটেইল এবং পেট ক্লিনিক স্থাপনে সহায়তাসহ সমন্বিত সমাধান নিয়ে কাজ করার কথা জানান তিনি।
এসব উদ্যোগ BASAVA, ভেটেরিনারি কমিউনিটি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে ড. আনসারী ভবিষ্যতের পেট সামিটগুলোতেও অংশীদার হিসেবে পাশে থাকার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো সফলভাবে এ আয়োজনের জন্য BASAVA, আয়োজক, কো-পার্টনার ও স্পন্সরদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইউসুফ এলাহী চৌধুরী, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. বয়জার রহমান এবং চীনের Bridge Petcare Co., Ltd.-এর Overseas Business-এর জেনারেল ম্যানেজার মি. কার্টার ঝেং।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশনের (BVA) কনভেনর ডা. সাফিউল আহাদ সারদার স্বপন। স্বাগত বক্তব্য দেন BASAVA-এর জেনারেল সেক্রেটারি প্রফেসর ড. কেএইচএম নাজমুল হুসাইন নাজির। বক্তব্য দেন BASAVA-এর প্রেসিডেন্ট ডা. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে কো-স্পন্সর হিসেবে ছিল এসিআই অ্যানিমেল হেলথ।



