
গৌতম কুমার রায় : ইলিশ মাছ সারা বছর কম-বেশী জলে ডিম ছাড়লেও, সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী অমাবস্যা ও কোজাগরি পূর্ণিমার জোয়ারে সাগরের মা ইলিশ দলবদ্ধভাবে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে মিষ্টি জলের স্পর্শে ঝাঁকে ঝাঁকে ডিম ছাড়তে আসে। পিছে পিছে ধেয়ে আসে পুরুষ ইলিশও। এই সময়ে দেশে দুই থেকে তিনটি জলোচ্ছ্বাস ও ঘুর্ণিঝড় হয়ে থাকে। যা কিনা ইলিশের প্রজনন ক্রিয়ায় সঙ্গত সহায়তা করে থাকে। দেশের প্রায় সব বড় নদ-নদীতে ইলিশের ডিম ছাড়ার জায়গা। তবে স্বাচ্ছন্দ্যগত ও অবস্থাগত কারণে মেঘনা নদীর ধলচর, কালিচর, মৌলভীর চর, ইলিশা, মনপুরা দ্বীপে মিষ্টি ও লবণ জলের মিশ্রিত জায়গায় এরা ডিম দিয়ে থাকে বেশী।
মেঘের গর্জন, প্রবল বর্ষণ আর জলের স্রোতে আছে বলেই জলে প্রাণিরা বংশ ছড়ায়। শুক্রাণুরা সাঁতার কাটতে পারে। যেটা বলেছে, কিয়োটো বিশ^বিদ্যালয়ের গবেষক কেন্টা ইশিমোতো ও তাঁর গবেষক দল, পি আর এক্স লাইফ জার্ণালে।
শুক্রাণু বিপরীত মুখী স্রোতে বহুদূর পথ পেড়িয়ে প্রতিযোগিতামূলক গতিতে পৌঁছায় পিয়ারের ডিম্বাণুর কাছে। ইলিশ মাছের জীবনচক্রে একটি বিষয় হলো লিঙ্গ পরিবর্তন। পরিবেশগত বিশেষ কারণে ইলিশ মাছের লিঙ্গ পরিবর্তন’ হয় বা ট্রান্স জেন্ডার’ ঘটে থাকে। এই পরিবর্তনের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে জলের লবণাক্ততার পরিমাণ, খাদ্যের প্রাচুর্যতার পরিমাণ, জলের তাপমাত্রার পরিমাণ।
জলজ প্রাণির ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর বাহ্যিক নিষিক্তকরণ হয়। পরে তা জাইগোটে পরিণত হয়। এ অবস্থার থেকে তৈরী হয় ভ্রƒণু। পুরো প্রক্রিয়াটি জেলির স্তর ভেদে শুক্রাণু বিশেষ এনজাইম নিঃসরন করে। যদিও জলে মাছ স্রোতের বিপরীত মুখে সাঁতার কাটতে অভ্যস্থ। তাঁরা লেজ দিয়ে গতির দিক ঠিক রেখে, পাখনা দিয়ে জলকে ঠেলা দেয় এবং সামনে এগিয়ে যায়। কিন্তু শুক্রাণুর কোন হাত নেই, পা নেই, পাখনাও নেই। তাদের আছে কেবলই সরু পাতলা চিকন লেজ। যাকে ফ্লাজেলা বলে চেনে। শুক্রাণুর শরীরের আঠালো ও তরল মিউকাস নাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যায়। তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয় রোমান্স পূরণে কে কার আগে, কত দ্রুততম সময়ে ডিম্বাণুকে স্পর্শ করবে। হাত-পা-পাখনা ছাড়া সরু নরম লেজে সাঁতার কাটার পদ্ধতি সম্পর্কে ঐ গবেষণায় বলা হয়েছে, শুক্রাণুর দেহে পাতলা লেজে আশ্চর্য এক ধরণ’ রয়েছে। যা মাত্রা ছাড়া এক স্থিতিস্থাপক বা অড-ইলাস্টিসিটি।’ অর্থাৎ টানলে বা বাঁকালে তা বাড়ে, ছেড়ে দিলে তা আবার পূর্বের জাগায় আকার নেয়। সেভাবে ফ্লাজেলা তার বুদ্ধি এবং কৌশল খাটিয়ে এমন অসম ক্রিয়া সম্পন্ন করে সাঁতার কেটে শুক্রাণু এগিয়ে যায়। আর এভাবেই শুক্রাণু ডিম্বাণুর চৌম্বকত্বে তার কাছে পৌছে যায়। প্রাকৃতিক নিয়মে ইলিশ মাছ লিঙ্গ পরিবর্তন করে থাকে।
ইলিশ পুরুষ হয়ে জন্ম নিয়েও এই প্রক্রিয়ায় স্ত্রী হয়ে ডিম দিয়ে থাকে। ইলিশ মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন হলো এক ধরণের অ্যানাড্রোমাস মাইগ্রেশন। এখানে পরিপক্ক ইলিশ গভীর সমুদ্র হতে নোনা জল ছেড়ে নদীর মিষ্টি জলে ডিম ছাড়তে আসে। যেখানে ডিম নিষিক্ত পদ্ধতিতে ভ্রূণু হতে বাচ্চা ইলিশে রূপান্তরিত হয়।
নদীতে জলের প্রবাহ কমেছে। জলে মাত্রাতিরিক্ত দূষণে ডুবেছে। নদীর গভীরতা না থাকায় স্রোতধারা স্বাভাবিকে নেই। প্লাংটনের অভাব বেড়েছে। জলের ঘোলাত্ব পরিমাণের চেয়ে বেশী এবং এই জলে নোংড়া ভরা ও বিষাক্ত। তাপমাত্রা অস্বাভাবিক। শিল্প, পয়ঃ বর্জ্য ও কীটনাশকের ধোঁয়ায় জল তেঁতেছে। মিষ্টি জলে ছেড়ে আসা অনেক ডিম অনেক সময় ভেসে যায় নোনা জলে। ডিম ছাড়তে পাড়লেও অনেক ডিম এভাবে নানান কারণে নষ্ট হয়ে যায়। এর সাথে বহুবিধ প্রতিকূলতার জন্য মা ইলিশ স্বাচ্ছন্দ্যে পরিপূর্ণ ডিম ছাড়তে পারে না। নদী মোহনার নতুন উৎপাত হলো পলিথিন এবং প্লাস্টিকের স্তূপ। চলার পখে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল এবং ইলিশ প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার যন্ত্রণা, নৌযানের অব্যাহত অত্যাচার। এখান থেকে নির্গত জ্বালানী তেল জলে ভাসে। বিকট শব্দমাত্রা ইলিশকে ডিম ছাড়তে বাঁধা দেয়।
শেষ কথা হলো, প্রজনন প্রক্রিয়ার পরিবেশের এমন বিশেষ সুবিধা থাকায় পিরোজপুরের বলেশ^র নদীর মোহনাতে ইলিশ প্রজননের নতুন ক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে।
লেখক: গবেষক, উদ্ভাবক, পরিবেশ বিজ্ঞানী।



