Sunday 25th of February 2024
Home / অর্থ-শিল্প-বাণিজ্য / খেজুরের রস যেন সোনার হরিণ

খেজুরের রস যেন সোনার হরিণ

Published at জানুয়ারি ১৩, ২০২৪

ফকির শহিদুল ইসলাম (খুলনা): হারিয়ে যেতে বসেছে দক্ষিণাঞ্চলের সুস্বাদু খেজুর রস। এক সময় শীত মৌসুম শুরু হবার আগেই গ্রামগঞ্জের খেজুর গাছ কাটার কাজে নিয়োজিতরা প্রতিযোগীতায় নেমে পরতো। কার আগে কে খেজুর গাছ কেটে প্রকৃতির সেরা উপহার রস সংগ্রহ করবে। শীতে খেজুর রসের কদর বাড়লেও সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে সেই খেজুর রস। খেঁজুর গাছ কাটার পেশায় জড়িতরা পেশা বদল করে চলে যাচ্ছে অন্য পেশায়। সে কারণে ঐহিত্যবাহী খেজুরের রস এখন সোনার হরিণ।

‘রস , ঠিলা ভরা খেজুরের রস’ ঘাড়ের উপর বাঁশের চটিতে বাঁধনো দু’ধারে দু’টি মাটির ঠিলা নিয়ে ছুটে চলা দুরন্ত গতি এখন আর চোখে মেলেনা। শীতের সকালে কুয়াশার আধারে কম্বল পেঁচিয়ে বিছানার উপর থেকে আর শোনা যায় না খেজুর রস বিক্রির ডাক হাক। খেজুর রসের সেই পিঠা, পায়েস ও ক্ষীরের আনন্দটাও এখন আর নেই ইট পাথরের নগরী খুলনায়।

কুশায়ার আস্তারন কেটে সকালের সূর্য চোখ মিলছে তবে মেলে না আর ঐহিত্যবাহী খেজুরের রস। পৌষ আর মাঘের শীতে শহরের বাইরে গ্রাম বা প্রত্যন্ত অঞ্চল গুলোতে খেজুর রসের পিঠাবিহীন যেন শীতকাল মনেই হতো না। ঘরে ঘরে রসের তৈরী হরেক রকম রসের পিঠা, রসের তৈরি গুড়, ভাপা পিঠা, ও রসের চিতই পিঠা তৈরীর মহোৎসব চলত।

কিন্তু কালের পরিক্রমায় সেদিনের মহোৎসব ক্রমান্বয়ে স্মৃতির পাতায় ধাবিত হচ্ছে। এক সময়ে পড়ন্ত বিকাল হতে শুরু করে মাঝ রাত পর্যন্ত চলতো পিঠা তৈরীর প্রতিযোগীতা। তবে বর্তমানে খেজুর রস এখন বিলুপ্তির পথে। রস না পাওয়ার জন্য গাছের অভাব আর ইট ভাটার আগ্রাসনকে দায়ী করেছেন অনেকেই। পৌষের শেষাংসের পড়া শীতে খুলনার রূপসা, বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ডুমুরিয়া, পাইকগাছা ফুলতলা, তেরখাদা ও দিঘলিয়া উপজেলার গ্রামাঞ্চলে খেঁজুর গাছের রস আগের মতো মিলছে না। খেঁজুর রস যেন এখন সোনার হরিণ। হাজার টাকা দিয়েও মিলছেনা একঠিলা খেজুরের রস।

বিশেষ করে রূপসার আইচগাতি, শ্রীফলতলা, নৈহাটি, বাহিরদিয়া, ঘাটভোগ এলাকা, পাইকগাছার হরিঢালী, কপিলমুনি, লতা, দেলুটি, সোলাদানা, লস্কর, গদাইপুর, রাড়ুলী, চাদখালী, গড়ইখালী এলাকা, দিঘলিয়ার, আড়ংঘাটা, সেনহাটি, লাখোহাটি, বাতিভিটা, মাঝিরগাতি, গাজীর হাট, কুমারখালি এলাকা, ডুমুরিয়ার শলুয়া, রংপুর, থুকড়া, শাহপুর, মিকশী মিল, ঘোনা, খর্নিয়া এলাকা, ফুলতলার আটরা, গিলাতলা, দামোদর, জামিরা এলাকা ও তেরখাদার আজগড়া, বারাসাত, ছাগলাদাহ, সাচিয়াদাহ, তেরখাদা ও মধুপুর এলাকার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল গুলোতে এখন আর আগের মতোই গাছে গাছে রসে ঠিলা প্রতীয়মান হচ্ছে না।

দিঘলিয়া উপজেলা এলাকার একাধীক ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানা যায়, কেন খেজুরের রস এখন সোনার হরিণের মতো, আর কেনই বা হারিয়ে যেতে বসেছে খেজুরের রস? উত্তর মেলে প্রথমত গ্রামাঞ্চল গুলো এখন অনেকটাই নগরায়নের পথে। গ্রামের রাস্তাগুলো সংস্কার হওয়ার কারণে রাস্তার পাশে থাকা খেজুর গাছগুলো ক্রমান্বয়ে কেটে ফেলা হলেও বিপরীতে কেউ নতুন করে গাছ লাগায় না। যার কারণে প্রতিনিয়ত খেজুর গাছের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। দ্বিতীয়ত গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ যারা এ সময়ে এলাকায় খেজুর গাছ কাটতো, তারা এখন ভিন্ন ভিন্ন পেশায় আশায় শহরমুখী হয়ে পড়েছে। যে কারণে আজ এই ইট পাথরের শহরে ঐহিত্যবাহী খেজুরের রস বিলুপ্তির পথে।

কথা হয় দৌলতপুর এলাকার মাহেন্দ্রা চালক সবুরের সাথে। তিনি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন, পাকিস্তানী সেনাও দেখেছেন । তিনি জানান, আগের দিনগুলোর কথা মনে পড়লে জিভে পানি চলে আসে। সকালে গাছিরা ঠিলে ভরে লাল রস নিয়ে আসতো। খেয়ে নিতাম ৫/৬ গ্লাস, কি যে মিষ্টি! তাছাড়া মাঠে ঘাটে যেখানে সেখানে গাছিরা ঠিলা পেতে রাখতো। ভোর হতে না হতে ঠিলা ভরে যেত। রাতে দোস্তদের নিয়ে রস চুরি করে খেতাম। পাওয়া যেত খাটি খেজুরের রস। আজ সবই ইতিহাস।টাকা দিয়েও মেলে না রস।

গৃহিনী জোসনা বেগম জানান, শীত পড়া শুরু করলেই ছেলে মেয়েরা রসের পিঠা খেতে চায়। কিন্তু রসই তো মিলছে না। বর্তমানে টাকা থাকলেও খেজুরের রস পাওয়া দুস্কর। কৃষি গবেষনা ইনষ্টিটিউট খুলনার সরেজমিন বিভাগের মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হারুনুর রশিদ জানান, খেজুর রস সংকটের পিছনে কিছু যৌক্তিক কারণ আছে। যার প্রথম কারণ প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতেও আধুনিক নগরায়নের ব্যবস্থাপনার ছোঁয়া লেগেছে। গ্রামের উন্নয়নকল্পে নতুন নতুন রাস্তা সংস্কার করার জন্য রাস্তার পাশে থাকা খেজুর গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। ফলে ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে খেজুর গাছের। দ্বিতীয় কারণ হলো, পেশাগত পরিবর্তন।

অর্থ্যাৎ গাছি সংকট। যারা খেজুর গাছ কাটতো, তার আজ গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হয়ে পড়েছে। যে কারণে পেশাগত পরিবর্তন এই ঐতিহ্য হারানো অন্যতম একটি কারণ। তৃতীয়ত, বৈশ্বায়িক পরিবর্তন। এ তিনে মিলেই খেজুর রসের কৃত্রিম সংকট। তবে এর বিপরীতে বজ্রপাত রোধে আর খেজুরের রস ধরে রাখতে বেশি করে রাস্তার দু’পাশে খেজুর ও তাল গাছ লাগানোর পরামর্শ দেন এ কর্মকর্তা।

This post has already been read 426 times!