Saturday 4th of February 2023
Home / পোলট্রি / পোল্ট্রি বর্জ্যে নতুন সম্ভাবনার হাতছানি

পোল্ট্রি বর্জ্যে নতুন সম্ভাবনার হাতছানি

Published at জুলাই ১৯, ২০১৮

মো. সাজ্জাদ হোসেন : ‘শিল্প বর্জ্য ও দূষণ’- বর্তমান ও আগামী পৃথিবীর ভয়াবহ একটি হুমকীর নাম। সারা পৃথিবীর বাঘা বাঘা পরিবেশ বিজ্ঞানীরা হন্নে হয়ে ছুটছেন এর সমাধানের পেছনে কারন শিল্প দূষণে মাটি, পানি, বাতাস এমনকি সামগ্রিক প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপন্ন হয়ে পড়ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মানুষের রকমারি চাহিদা পূরণ, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা, শিল্প বিপ্লব, আর্থিক মুনাফা, বাণিজ্যিক আগ্রাসন সবকিছু মিলিয়ে এমন এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যে এর থেকে পরিত্রাণের উপায় খুব সহজ নয় বলেই মনে করছেন বিশ্ব নেতৃবৃন্দ।

শিল্প বিপ্লবের এ যুগে ঘরোয়া পরিবেশে পালিত মুরগিও যখন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হয় অতি সাধারন একটি কুটির শিল্প যখন বৃহৎ শিল্পের মর্যাদা লাভ করে তখন অনেক পরিবেশবাদিরই ভ্রু কুঁচকে যাবে সেটাই স্বাভাবিক! উন্নত দেশগুলোর মুরগির খামারগুলোতে বছরে যখন লাখ লাখ টন পোল্ট্রি লিটার, প্রসেসিং প্লান্টগুলোতে যখন মিলিয়নস অব টন ওয়েস্ট জমা হতে শুরু করে তখন এগুলোর অপসারন ডাম্পিং কিংবা সঠিক ব্যবস্থাপনা রীতিমত মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অবশ্য এ মাথাব্যথার ঔষধ আবিষ্কার করতে খুব বেশি সময় লাগেনি। আর সে কারণেই শিল্প বর্জ্য নিয়ে বিশ্ব জুড়ে যে হৈচৈ চলছে সেখানে পোল্ট্রি বর্জ্য বড় কোন আলোচনায় আসেনা।

সাম্প্রতিক সময়গুলোতে পোল্ট্রি বর্জ্য অভিশাপ তো নয়ই বরং আশির্বাদ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশ্বের বড় বড় দেশ- যেখানে কৃষি জমির পরিমান অনেক বেশি- যেমন যুক্তরাষ্ট্র, অষ্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল প্রভৃতি দেশে জমির উর্বরতা বাড়াতে কম্পোষ্ট সার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে পোল্ট্রি লিটার। খুবই সহজ কিছু পদ্ধতি এবং সাধারন কিছু প্রযুক্তি ব্যবহার করে পোল্ট্রি লিটার রিসাইকেল করে জৈব সার উৎপাদন করা হচ্ছে এমনকি প্যাকেটজাত অবস্থায় বাজারজাতও করা হচ্ছে। তবে এটিই শেষ কথা নয়। পোল্ট্রি বর্জ্য থেকে যে কত কী উৎপাদিত হচ্ছে তা না জানলে অনেক কিছুই অজানা থেকে যাবে। আজকের এ লেখায় খুবই সংক্ষিপ্ত পরিসরে সে বিষয়েই আপনাদের কিছুটা জানানোর চেষ্টা করব।

এ.ই নিউজের দেয়া এক তথ্য মতে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রিতেই বছরে প্রায় ১১ বিলিয়ন পাউন্ড ওজনের বর্জ্য উৎপাদিত হয়। অবশ্য এটি ক’বছর আগের পরিসংখ্যান, বর্তমানে এ পরিমানও আরও অনেক বেশি। ২০১৫ সালের এক পরিসংখ্যান মতে শুধুমাত্র আলবামা রাজ্যেই বছরে ১০লাখ টন চিকেন ওয়েষ্ট উৎপাদিত হয়েছে।

২০১১ সালের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে- গ্লোবাল পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রি’তে প্রতি বছর বর্জ্য হিসেবে উৎপাদিত হয় প্রায় ২ মিলিয়ন টন মুরগির পালক! কারো কারো মতে, এ পরিমান প্রায় ৫ মিলিয়ন টন!

একবার ভাবুন তো, যদি এভাবে বর্জ্য জমা হতে থাকে তবে মানুষ কিংবা পরিবেশের কি অবস্থা হবে? বিজ্ঞানীরা অবশ্য বলছেন- দুশ্চিন্তার কিছু নেই বরং আছে সুখকর সংবাদ! কারণ পোল্ট্রি বর্জ্য এখন রিসাইকেল করে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ভ্যালু অ্যাডেড প্রোডাক্ট।

ডিমের খোসার ওপর সুক্ষ্ম কারুকার্য করা কিংবা ঘর সাজাতে ডিমের খোসার ব্যবহার অনেক আগে থেকে শুরু হলেও হাল জামানায় পোল্ট্রি শিল্পের বর্জ্য নিয়ে চলছে বিস্তর গবেষণা। এখন বলা হচ্ছে পোল্ট্রি শিল্পে বর্জ্য বলে কিছু নেই।

ডিমের খোসায় নান্দনিক শিল্পকর্ম।

পোল্ট্রি নিয়ে পৃথিবী জুড়েই আগ্রহের যেন শেষ নেই। সারা দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের জন্য ডিম ও মুরগির মাংসের যোগান দিতে কৃষিভিত্তিক এ শিল্পের যেন কোন বিকল্প নেই। সমকালের পোল্ট্রি বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীরা ডিম ও মুরগির মাংসের উপকার নিয়ে নানাবিধ গবেষণা করছেন। এমনকি নানাবিধ ভ্যালু অ্যাডেড প্রোডাক্ট তৈরিরও চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন- যেমন ওমেগা৩ সমৃদ্ধ ডিম। জাপানের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এডভান্সড ইন্ডাষ্ট্রিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির একদল গবেষক ২০১৭ সালের অক্টোবরে দাবি করেছেন যে- দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক ডিম উৎপাদনেও তাঁরা সফলতা পেয়েছেন। তবে শুধু খাদ্য হিসেবেই নয় পোল্ট্রি এখন গুরুত্ব পাচ্ছে দারুণ সব পণ্য তৈরির উপকরণের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের যোগানদার হিসেবেও।

পোল্ট্রি’র বিষ্টা বা লিটার থেকে এখন তৈরি হচ্ছে জৈব সার। রাসায়নিক সারের নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্ব যখন বিকল্প খুঁজছে, তখন এমন একটি আবিষ্কার স্বস্তিদায়ক তো বটেই উপরন্তু কৃষির জন্যও আশির্বাদ ! বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে পোল্ট্রি লিটার থেকে জৈব সারের উৎপাদন। শুধু তাই নয় পোল্ট্রি লিটার থেকে তৈরি হচ্ছে বায়োগ্যাস এবং বিদ্যুৎ। বাংলাদেশের প্যারাগন পোল্ট্রি, কাজী ফার্মস প্রভৃতি দেশীয় কোম্পানীগুলো নিজস্ব খামারে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে অভিনব এ পদ্ধতিকে কাজে লাগাচ্ছে।

পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞরা বলছেন- ২০ হাজার মুরগির একটি ব্রয়লার খামার থেকে প্রায় ৪০ হাজার পাউন্ড বিস্টা বা লিটার পাওয়া যায়। বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) এর হিসাব মতে- দেশে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৪ হাজার মেট্রিক টন মুরগির মাংস এবং প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ ডিম উৎপাদিত হচ্ছে। কাজেই বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে আমাদের দেশে কী পরিমান মুরগির বিষ্টা উৎপাদিত হচ্ছে প্রতিদিন। আর এ বর্জ্যকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে কৃষি প্রধান এবং স্বল্প আয়ের এদেশে কী যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে যেতে পারে তা বলাই বাহুল্য।

মুরগীর পাখনা দিয়ে তৈরি কুশন।

মুরগির পালক দিয়েও তৈরি হচ্ছে দারুণ সব পণ্য! মুরগির পেটের দিকের নরম পালক দিয়ে তৈরি ‘ফেদার পিলো’ বা বালিশ ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে ফেদার ফাইবার- যা উলের মতই আরামদায়ক, হালকা এবং স্থিতিস্থাপক। বায়োফাইবার এর ব্যবহার বহুবিধ। পলিমার কম্পোজিট তৈরিতে এর ব্যবহার উৎপাদন খরচ অনেক কমিয়ে দিয়েছে। প্লাস্টিক, কাঠ, কংক্রিট এবং কার্ডবোর্ডে বায়োফাইবার ব্যবহারের ফলে ওজন অনেক কমছে বা হালকা হচ্ছে। এটি তাপ শোষণ করে এবং শব্দ লঘু করণেও দারুণ কার্যকর- বলছেন বিজ্ঞানীরা।

মুরগির বর্জ্য দিয়ে তৈরি থার্মোপ্লাস্টিক বোতল।

নেবরাসকা-লিংকইন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক উইকি ইয়াং মুরগির পালক থেকে প্লাষ্টিক তৈরির জন্য কাজ করছেন। তাঁর মতে, এ প্লাষ্টিক হবে পচনশীল এবং পরিবেশ-বান্ধব। মুরগির পালক তৈরি হয় কেরাটিন দিয়ে। এই কেরোটিন হচ্ছে এমন এক প্রোটিন যা উল, চুল, হাতের নখ, খুর ইত্যাদি শক্ত করতে সহায়তা করে। উইকি ইয়াং এর অপর এক সহযোগী নরেন্দ্র রেড্ডী বলেছেন, তাঁদের তৈরি প্রোডাক্টটি আসলে থার্মোপ্লাস্টিক। একে তাপ দিয়ে গলিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা সম্ভব। কেবল একবার নয় বহুবার গলানো এবং শক্ত করা যায়! পেট্রোলিয়াম-বেজ থার্মোপ্লাস্টিকে ফসিল ফুয়েল ব্যবহার করা হলেও মুরগির পালক থেকে তৈরিকৃত থার্মোপ্লাস্টিক উৎপাদনে ফসিল ফুয়েল ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েনা। এ থার্মোপ্লাস্টিক দিয়ে নাকি কাপ, প্লেট থেকে শুরু করে ফার্নিচার সবকিছুই তৈরি করা যায়।

যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের বেশ কিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে প্রাথমিক জ্বালানী হিসেবে পোল্ট্রি এবং টার্কী লিটার ব্যবহার করা হচ্ছে। আয়ারল্যান্ডে বায়োমাস এনার্জি’র উৎস হিসেবে পোল্ট্রি লিটার ব্যবহৃত হচ্ছে।
ব্রয়লার হাউসের তাপ বা উষ্ণতা বাড়াতে আগে যেখানে ফসিল ফুয়েল বা এলপিজি গ্যাস ব্যবহার করা হতো এখন সেখানে এর পরিবর্তে পোল্ট্রি লিটার ব্যবহার করা হচ্ছে।

‘এডভান্স ফাইবারস এন্ড পাউডারস’ এর মত বড় বড় কোম্পানী তাদের ইলেকট্রিক্যাল ও হিটিং অ্যাপ্লিকেশনে জ্বালানী হিসেবে পোল্ট্রি লিটার ব্যবহার করছে। এর পাশাপাশি তারা একটিভেটেড কার্বন এবং সারও তৈরি করছে।

লেখক: যোগাযোগ ও মিডিয়া উপদেষ্টা, বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল(বিপিআইসিসি।
ইমেইল: md.sazzad.hossain@gmail.com

This post has already been read 4783 times!