Saturday 1st of October 2022
Home / খাদ্য-পুষ্টি-স্বাস্থ্য / ভেষজ পদ্ধতিতে বিষমুক্ত গুড় উৎপাদন

ভেষজ পদ্ধতিতে বিষমুক্ত গুড় উৎপাদন

Published at অক্টোবর ২৫, ২০১৭

GURজহিরুল ইসলাম : বাজারে সোনালি, হালকা লাল, চকচকে, উজ্জ্বল সাদাটে গুড় দেখে সবাই আকৃষ্ট হয়। কিন্তু এই গুড়েই যে হাইড্রোজ নামক বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ আছে তা আমরা অনেকেই জানি না। আখের, খেজুর, তালের ও গোলপাতার রসের গুড়ের রঙ হাইড্রোজ দিয়ে আকর্ষণীয় সোনালি করা হয়।

বিভিন্ন করণে গুড় পরিশোধন করা কঠিন। কারণগুলো হলো- রোগ ও পোকা আক্রন্ত আখ, অপরিপক্ক বা অধিক  পরিপক্ক আখ, রসে অধিকমাত্রায় গ্লুকোজ ও ফ্রুকটোজ, আখের জাত, রস জ্বাল দেয়ার ভুল পদ্ধতি ইত্যাদি। এসব কারণে উন্নতমানের দানাদার গুড় উৎপাদন সম্ভব হয় না। এ অবস্থায় গুড় প্রস্তুতকারকরা গুড়ের রঙ দ্রুত পরিবর্তনের জন্য অতিমাত্রায় রাসায়নিক পরিশোধক দ্রব্য হাইড্রোজ ব্যবহার করে যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

সোডিয়াম হাইড্রো সালফাইড বা সোডিয়াম ডাই থায়োনেট বাণিজ্যিকভাবে ব্লাস্ককিট, রেডো রঙ্গালাইট বা হাইড্রোজ নামে পরিচিত। রঙ সাদা, তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ ও শক্তিশালী বিজারক পদার্থ। এটি কোন কিছুর রঙ খুব দ্রুত পরিবর্তন করতে পারে। হাইড্রোজ মূলত পেপার মিল, বস্ত্রমিল এবং তৈরি বস্ত্রের রঙ করার জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু দেশের বেশিরভাগ গুড় প্রস্তুতকারী গুড়ের রঙ সুন্দর করার জন্য মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজ ব্যবহার করে। এর ফলে মানুষ ক্যান্সার, আমাশায়, অন্ত্রের প্রদাহ ও অন্যান্য গ্যাস্ট্রো ইউরিনাল সমস্যাজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

গুড় পরিশোধনে ভেষজ নির্যাস হতে পারে এক্ষেত্রে আদর্শ মাধ্যম। রস পরিশোধনের জন্য ঢেড়ঁস গাছের কাণ্ড বা শিমুল গাছের শিকড় বা বন ঢেঁড়সের কাণ্ড বা ঘৃতকুমারীর রস ব্যবহার করা যেতে পারে। ৫০০ গ্রাম বন ঢেড়ঁস গাছের কাণ্ডের সবুজ অংশ ছোট ছোট টুকরো করে কেটে ও থেতঁলিয়ে ২ থেকে ২.৫ লিটার পানির মধ্যে দুহাতে ১০-১৫ মিনিট ঘষলে ২-৩ লিটার নির্যাস তৈরি হয়। ১৮৫-২২৫ কেজি ধারণক্ষমতা সম্পন্ন কড়াই বা প্যানের আখের রস পরিশোধন করার জন্য ২-৩ লিটার বন ঢেঁড়সের নির্যাস লাগে। অর্থাৎ প্রতি কেজি রসে ১৫-২৫ গ্রাম নির্যাস দিতে হয়। অথবা ঘৃতকুমারীর উপরের সবুজ খোসা ছুরি দিয়ে তুলে ভিতরের পিচ্ছিল নির্যাস বের করতে হয়। প্রতি কেজি আখের রসে ১০-১৫ গ্রাম এই নির্যাস দিতে হয়। প্যান বা কড়াইয়ে আখের রস জ্বাল দিলে প্রচুর গাদ উঠে। এই গাদ ছাকনা দিয়ে তুলতে হবে। এরপর বন ঢেঁড়সের রস অথবা ঘৃতকুমারীর রস কড়াইয়ে ফুটন্ত আখের রসে মিশিয়ে আশানুরূপ রস পরিশোধন করা যায়। এই ভেষজ নির্যাস মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর তো নয়ই বরং উপকারী। কারণ এই নির্যাসে প্রোটিনজাতীয় পদার্থ থাকে।

গাছ থেকে বাকল আলাদা করে বলের মত গোল করে পেঁচিয়েও সরাসরি ফুটন্ত আখের রসে ব্যবহার করা যায়। রস ঘনীভূত হওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত বাকল কড়াইয়ের উত্তপ্ত রসের মধ্যে কিছু সময় পরপর  নাড়া দিতে হবে। এতে আখের রসে বিদ্যমান ময়লা নির্যাসের সাথে জমাট হয়ে দ্বিতীয়বার গাদে পরিণত হয়ে ভেসে উঠবে যা ছাকনা দিয়ে পরিস্কার করতে হবে। রস ঘনীভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রসের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। এ অবস্থায় রস হাতল দিয়ে ঘন ঘন নাড়তে হবে এবং চুলার আগুন কমাতে হবে। কাঁচের গ্লাসের পরিস্কার ঠাণ্ডা পানিতে গরম একটু রস ঢেলে দিলে যদি জমাট বাঁধে তাহলে বুঝতে হবে রস জ্বাল সম্পন্ন হয়েছে। চুলা থেকে রসের কড়াই নামিয়ে একটু ঠাণ্ডা করে ছাঁচের বা পাত্রে ঢেলে দিলে রস জমাট বেঁধে দানাদার গুড় তৈরি হবে। এই গুড়ের রস উজ্জ্বল সোনালি হলুদ হয়। হাইড্রোজ দেয়া গুড়ে হাইড্রোজের গন্ধ থাকে এবং রঙ হালকা সাদাটে বা অনুজ্জল সোনালি হয়।

This post has already been read 2696 times!