Thursday 18th of August 2022
Home / প্রাণিসম্পদ / বাছুরের নাভিপচা রোগ ও প্রতিকার

বাছুরের নাভিপচা রোগ ও প্রতিকার

Published at সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৭

ডা. এ এইচ এম সাইদুল হক

5.0.2P2

: দুগ্ধ খামারের নবজাতক বাছুর সাধারণত যে ক’টি রোগে বেশি আক্রান্ত হয়ে অকালে মারা যায় তার মধ্যে নাভিপচা রোগ অন্যতম। সাধারণত নবজাতক বাছুরের নাভি এবং নাভির চারিপার্শ্বের অংশের প্রদাহ ও সংক্রমণকে নাভির রোগ (Navel ill) বলে। বাছুরের নাভি বা আমবিলিক্যাল কর্ড গঠিত হয় এমনিয়োটিক মেমব্রেন, আমবিলিক্যাল শিরা, আমবিলিক্যাল ধমনী ও ইউরেকাস দ্বারা। জন্মের সময় নাভি বা আমবিলিক্যাল কর্ড ছিঁড়ে যায়। এ সময়ে আমবিলিক্যাল শিরা ও ইউরেকাস বন্ধ হয়ে যায় কিন্তু বাকি অন্যান্য অংশগুলো পারিপার্শ্বিক বস্তুর সংস্পর্শে আসে। এর ফলে নাভিতে সংক্রমণ ঘটে থাকে। এমনকি এ সংক্রমণ মূত্রথলি পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়ে মূত্রথলির প্রদাহ হয়ে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাছুরের গিরা ফোলা (Joint ill) রোগও দেখা দেয়।

সংক্রমণ সৃষ্টিকারী জীবাণু
Escherichia coli, Proteus Spp, Staphylococcus spp. এবং Corynebacterium pyogenes। এ জীবাণুগুলো ব্যাকটেরিমিয়া বা স্থানীয় সংক্রমণ যেমন বাছুরের পায়ের সন্ধি, মেনিনজেস, চক্ষু, এন্ডোকার্ডিয়াম, পা, কান ও লেজের ধমনীতে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। নাভিপ্রদাহ (Omphalitis) সাধারণত নাভির বাহ্যিক অংশের প্রদাহ বা সংক্রমণকে বোঝায়। বাছুরের জন্মের ২-৫ দিনের মধ্যে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগ সংক্রমণের কারণ
১. জন্মের পর বাছুরের নাভি যদি সঠিকভাবে কাটা না হয়।
২. বাছুরকে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে রাখা হলে।
৩. বাছুরের নাভি কাটার ব্লেড বা ছুরি জীবাণুমুক্ত না হলে।
৪. গাভী অধিক পরিমাণে বাছুরের নাভি চাটলে।

রোগ লক্ষণ
জন্মোর ৪-৬ দিনের মধ্যে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। শরীরের তাপমাত্রা খুব বৃদ্ধি পায় (১০৫-১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট)। নাভি ফুলে বড় হয়ে যায় এবং ভেজা ভেজা থাকে। অনেক সময় নাভিতে ব্যথা এবং পুঁজ জমে থাকে। চাপ দিলে রক্তমিশ্রিত তরল পদার্থ বের হয়। নাভিতে ব্যথা থাকায় বাছুর মায়ের দুধ টেনে খেতে পারে না। বাছুর বারবার আক্রান্ত নাভি চাটে। বাছুর ঘন ঘন প্রস্রাব করে।  জ্বরসহ সেপটিসেমিক লক্ষণ দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি টক্সিমিয়ার কারণে বাছুর খায়না এবং ঝিমায়। ক্ষুধামান্দ্য ও অবসাদগ্রস্তভাব লক্ষ করা যায়। এভাবে ক্রমান্বয়ে নিস্তেজ ও দুর্বল হয়ে পড়ে। নাভিতে ক্ষত থাকার কারণে মাছি বসে ডিম দেয়ার ফলে নাভি থেকে পুঁজ বা রক্ত পড়তে দেখা যায়।

রোগ নির্ণয়
বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লক্ষণ দেখে নাভিপাকা রোগ নির্ণয় করা যায়। আক্রান্ত নাভি হতে সোয়াব (Swab) নিয়ে প্রাণিরোগ অনুসন্ধান ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে রোগের প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা যায়।

চিকিৎসা
প্রাথমিক অবস্থায় নাভি রোগের জন্য টেট্রাসাইক্লিন ইনজেকশন যেমন Renamycin, Tetracycline এর যে কোনো একটি ইনজেকশন মাঝারি ওজনের বাছুরের জন্য ৩-৪ মিলি. করে মাংসে দিনে একবার করে ৫-৭ দিন দিতে হবে। এছাড়া পেনিসিলিন গ্রুপের ওষুধ যেমন: Pronapen, Strepto P ইত্যাদি যেকোনো একটি মাঝারি বাছুরকে ১ ভায়াল করে মাংসপেশীতে দিনে একবার করে ৫-৭ দিন দিলে নাভিরোগ ভালো হয়ে যায়।

নাভি পেকে গেলে
প্রয়োজনবোধে ব্লেড বা ছুরি দ্বারা কেটে পুঁজ বের করে জীবাণুনাশক ওষুধ যেমন পটাশের পানি দিয়ে পরিষ্কার করে ফাঁকা স্থান দিয়ে টিংচার আয়োডিন বা পভিডন আয়োডিনযুক্ত গজ ঢুকাতে হবে। এভাবে পরপর ২দিন গজ ঢুকাতে হবে এবং পরে আক্রান্ত স্থানে সালফার গ্রুপের পাউডার (Sumid vet) দিতে হবে। আক্রান্ত নাভি টিংচার আয়োডিন দ্বারা পরিষ্কার করতে হবে এবং নিচের যেকোনো একটি এন্টিবায়োটিক দ্বারা চিকিৎসা করা যাবে। যেমন: ইনজেকশন Pronapen/Streptopen -এর যে কোনোটি ১০ লাখ মাংসপেশিতে দিনে একবার করে ৪-৫ দিন দিতে হবে।

রোগ নিয়ন্ত্রণ
বাছুর জন্মের সময়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত মানের হতে হবে। জন্মের পর বাছুরের নাভি যাতে ৭ দিনের মধ্যেই শুকিয়ে যায় সেজন্য প্রতিদিন নাভি পরিষ্কার করে টিংচার অব আয়োডিন লাগাতে হবে। প্রসবের পর Umbilicus বাছুরের নাভি ১ ইঞ্চি পরিমাণ রেখে এবং সিল্ক সুতা দিয়ে বেঁধে দিতে হবে। মা যেন নাভি চাটতে না পারে সে দিকে লক্ষ রাখতে হবে। নাভি যেন চিড়ে না যায় এবং মাছি না পড়ে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। বাছুরকে শুকনো পরিষ্কার স্থানে রাখতে হবে।

This post has already been read 4979 times!