
মো. খোরশেদ আলম জুয়েল : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়ছে, আর এর সরাসরি আঘাত পড়ছে বাংলাদেশের মৎস্য খাতে। অতিরিক্ত গরমে মাছের নার্সারি ও হ্যাচারিতে ব্যাপক হারে পোনা মারা যাওয়ায় খামারিরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু খামারিরাই নয়, দেশের সামগ্রিক মাছ উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ডফিশ এক গবেষণায় জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্র তাপপ্রবাহের সময় অগভীর নার্সারি পুকুরের পানির তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। অথচ অধিকাংশ মাছের পোনা সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাই উপযোগী। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন দ্রুত কমে যায়, মাছের বিপাকীয় চাপ বেড়ে যায় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সংখ্যক পোনা মারা যায়।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন মাছের নার্সারিতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজার হাজার রুই ও সিলভার কার্পের পোনা মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে একেকজন খামারির লাখ লাখ টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ছে। অনেকেই নতুন করে পোনা উৎপাদন শুরু করতে বাধ্য হচ্ছেন, ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং লাভের পরিবর্তে লোকসান গুনতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি হ্যাচারি বা নার্সারিতে পোনা মারা গেলে ক্ষতি শুধু ওই খামারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কারণ, সেখান থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চাষিরা পোনা সংগ্রহ করেন। ফলে পোনার সংকট তৈরি হলে পরবর্তীতে মাছের উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ওয়ার্ল্ডফিশের গবেষকরা বাগেরহাটের ফকিরহাট ও মোংলার কয়েকটি নার্সারি পরিদর্শন করে দেখেছেন, সরাসরি রোদে থাকা অগভীর ‘হাপা’ ও নার্সারি পুকুরে পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এর সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনত্বে পোনা মজুত, পর্যাপ্ত পানি পরিবর্তন না করা এবং অক্সিজেনের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
খামারিরা জানিয়েছেন, তাপপ্রবাহের সময় সকালে সুস্থ থাকা পোনা দুপুরের মধ্যেই ভেসে উঠতে শুরু করে। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পুরো ব্যাচ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এতে শুধু উৎপাদন ব্যয়ই নয়, খাদ্য, শ্রম, ওষুধ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও পুরোপুরি লোকসানে পরিণত হচ্ছে।
এ অবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ওয়ার্ল্ডফিশ। প্রতিষ্ঠানটির মতে, ক্লাইমেট ইনফরমেশন সার্ভিস (CIS) এবং ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) প্রযুক্তি ব্যবহার করে পানির তাপমাত্রা, দ্রবীভূত অক্সিজেন, পিএইচ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই খামারিদের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দিলে তারা এয়ারেটর চালু করা, ছায়ার ব্যবস্থা করা বা পানি পরিবর্তনের মতো জরুরি পদক্ষেপ নিতে পারবেন। এতে পোনা মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
ওয়ার্ল্ডফিশ জানিয়েছে, বর্তমানে সিজিআইএআরের ক্লাইমেট অ্যাকশন সায়েন্স প্রোগ্রামের আওতায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পরীক্ষামূলকভাবে আইওটি-ভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। গবেষকদের আশা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে তাপপ্রবাহের ক্ষতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশে গত দুই দশকে মৎস্য খাতের উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি ছিল উন্নতমানের মাছের পোনা উৎপাদন। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যদি তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হয় এবং কার্যকর অভিযোজন ব্যবস্থা দ্রুত গ্রহণ না করা হয়, তাহলে হ্যাচারি ও নার্সারি খাত বড় ধরনের সংকটে পড়বে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে মাছ উৎপাদন, খামারিদের আয় এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তায়।



