
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের পুকুরভিত্তিক মাছ চাষে নতুন সম্ভাবনার নাম এখন জি-থ্রি (G3) রুই। উন্নত প্রজনন প্রযুক্তিতে উদ্ভাবিত এই জাতটি শুধু দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে না, বরং পলিকালচার পদ্ধতিতে চাষিদের আয় বাড়াচ্ছে উল্লেখযোগ্য হারে—গড়ে প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ডফিশ-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, জি-৩ রুই প্রচলিত জাতের তুলনায় প্রায় ৩২ শতাংশ বেশি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফলে একই সময়ের মধ্যে বেশি ওজনের মাছ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে, যা সরাসরি চাষিদের লাভ বাড়াচ্ছে।
বিশেষ করে পলিকালচার পদ্ধতিতে—যেখানে রুইয়ের সঙ্গে অন্যান্য প্রজাতির মাছ একসঙ্গে চাষ করা হয়- জি-৩ রুই ব্যবহারে পুকুরের সামগ্রিক উৎপাদন ও অর্থনৈতিক রিটার্ন দুটোই বেড়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি হেক্টর পুকুরে অতিরিক্ত আয় গড়ে প্রায় ৬০০ মার্কিন ডলারের বেশি হতে পারে।
বাংলাদেশে কার্প জাতীয় মাছ চাষ দেশের মৎস্যখাতের একটি বড় ভিত্তি। মোট জলজ উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি আসে এই খাত থেকে, আর তার মধ্যে রুই অন্যতম প্রধান প্রজাতি। ফলে রুইয়ের উন্নত জাতের এমন অগ্রগতি পুরো খাতেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘদিন ধরে উন্নত মানের পোনা সংকট এবং কম উৎপাদনশীল জাত ব্যবহারের কারণে চাষিরা কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। তবে জি-৩ রুই সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। ২০২০ সালের পর থেকে সরকারি ও বেসরকারি হ্যাচারির মাধ্যমে এই উন্নত পোনা মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করে এবং ইতোমধ্যে লক্ষাধিক চাষি তা গ্রহণ করেছেন।
মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, জি-৩ রুই তুলনামূলক কম সময়ে বাজারজাতযোগ্য আকারে পৌঁছে যায়। ফলে উৎপাদন চক্র ছোট হচ্ছে এবং একই পুকুরে বছরে একাধিকবার চাষের সুযোগ তৈরি হচ্ছে—যা বাড়তি আয়ের পথ খুলে দিচ্ছে।
গবেষকরা মনে করছেন, এই প্রযুক্তির বিস্তার ঘটাতে পারলে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষিদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে। একই সঙ্গে কার্প চাষের পরিবেশগত সুবিধাও রয়েছে, কারণ এই মাছগুলো তুলনামূলকভাবে কম খাদ্যনির্ভর এবং টেকসই উৎপাদনে সহায়ক।
এদিকে, গবেষণার পরবর্তী ধাপে আরও উন্নত জি-৫ (G5) রুই নিয়ে কাজ চলছে, যা ভবিষ্যতে উৎপাদনশীলতা আরও বাড়াতে পারে। পাশাপাশি কাতলা ও অন্যান্য কার্প প্রজাতির উন্নত জাতও মাঠে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জি-৩ রুইকে কেন্দ্র করে আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিনির্ভর মাছ চাষ বিস্তৃত হলে বাংলাদেশের মৎস্যখাত নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারবে – যেখানে উৎপাদন ও লাভ দুটোই হবে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি।



