Tuesday 6th of December 2022
Home / আঞ্চলিক কৃষি / জিকেবিএসপি প্রকল্পের আওতায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি ভিক্তিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি

জিকেবিএসপি প্রকল্পের আওতায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি ভিক্তিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি

Published at অক্টোবর ২১, ২০২২

ফকির শহিদুল ইসলাম (খুলনা): দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি বিপ্লবের পাশাপাশী সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক কৃষি ভিক্তিক কর্মসংস্থান ।  মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট জিকেবিএসপি প্রকল্পের আওতায় মাটি ও সার সহায়িকার মাধ্যমে এই কৃষি বিপ্লব সম্ভব হয়েছে। কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় হাজারো কৃষকের ভাগ্য বদল হয়েছে নানা প্রজাতির সবজি উৎপাদন করে। এই অঞ্চলে আমন ধান কাটার পর জমি পতিত থাকতো। এই প্রকল্প কৃষকদের বিনা মূল্যে বীজ সার কীটনাশক ও প্রশিক্ষণ দিয়ে মানব সম্পদে পরিনত করেছে। পতিত জমিতে এখন কৃষক সোনা ফলাচ্ছেন। কোটি টাকার ফসল উৎপাদন হচ্ছে। অর্থনৈতিক ভাবে সামলম্ভী হচ্ছে।

সূত্র জানিয়েছেন, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট গোপালগঞ্জ-খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরা -পিরোজপুর জিকেবিএসপি প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয় ১০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। এই প্রকল্প ৫জেলা নিয়ে কাজ করছেন। কৃষকরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন ভুট্টা আবাদ করার জন্য। আমনধান কাটার পর নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে রোপণ করা হবে ভুট্ট। বিনা চাষে রোপণ করা হয় ভুট্টা। এ বছর ২০০০ হেক্টর জমিতে আবাদ হচ্ছে ভুট্টা। চাষ হলে সরকারের আমদানী নির্ভরতা কমবে। প্রতি হেক্টরে ১০ মেট্রিকটন ফলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ওই এলাকার ১১জন কৃষক ২০১৯ সালে ১০একর জমিতে বিনা চাষে ডিবলিং পদ্ধতিতে চারা রোপন ও পলি ব্যাগের তৈরী চারা রোপণ করে এর কার্যক্রম শুরু করেন। অল্প খরচে বেশী লাভ হওয়াতে প্রতিবছর এর চাষ বাড়ছে। বিনা চাষে ডিবলিং পদ্ধতিতে চারা রোপন ও পলি ব্যাগের তৈরী চারা রোপণ করে এর কার্যক্রম শুরু করেন। এর পর প্রতি বছর চাষ বাড়তে থাকে। লবাণাক্ত এলাকায় একটি মাত্র ফসল হত। আমন ধানে ও শুস্ক মৌসুমে আবাদের মুল সমস্যা হল লবাণাক্ততা। আমন ধান কাটার পর জমি পতিত অবস্থায় পড়ে থাকে। এখন এই পতিত জমিতে সোনা ফলছে। কৃষকের মুখে ফুটবে হাসির ফোয়ারা। স্বার্থক হবে তাদের পরিশ্রম।

বিস্তৃর্ণ এলাকাজুড়ে বাড়ছে তরমুজের চাষ। প্রতি বছর বাড়ছে আবাদ। লাভবান হচ্ছেন কৃষক। গত বছর ১৩হাজার হেক্টর জমি তরমুজ চাষ করা হয়েছে। এ বছরও ওই পরিমান জমি চাষের আওতায় আনা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে রোপণ করা হবে চারা। ফসল কাটা শুরু হবে এপ্রিল মাসে। এ বছর প্রতি হেক্টরে ৪৫ মেট্টিক টন উৎপাদন হয়েছে। গত বছর ৬হাজার ২শ’ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছিল । ট্রে ও পলিব্যাগে চারা উৎপাদন করে রোপন করা হবে। এ বছর প্রায় ৯৪ কোটি টাকার তরমুজ বিক্রি করেছেন। এর পর রয়েছে অসময়ের বর্ষাকালিন তরমুজের চাষ। ঘেরে মাছ সাতার কাটছে। পাড়ে রোপন করা হয়েছে তরমুজ। দেড় হাজার ঘেরের পাড়ে রোপণ করা হয়েছে বর্ষা কালিন তরমুজ। এতে সেচের প্রয়োজন হয়না। দাম বেশী হওয়ার কারণে অধিক লাভবান হচ্ছেন কৃষক।

সূত্র জানিয়েছেন, ডুমুরিয়া উপজেলার মাদরতলা, বারইখালি ও কুলবাড়িয়া গ্রামে মাটি ও সার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ৫০ বিঘা ঘেরের পাড়ে রোপন করা হয়েছে হাইব্রিড জাতের হানি কুইন, পাকিজা ও ইয়লো ড্রাগন। এর মধ্যে হলুদ বর্ণের তরমুজও ছিল। জুলাই মাসের মাঝামাঝি বীজ রোপণ করা হয় এবং সেপ্টেম্বর মাসের

২য় সপ্তাহ থেকে ফল কর্তণ করা হয়। বর্ষা মৌসুমে সেচের প্রয়োজন হয় না। মাচার ওপরে সবুজের সমরহ। আর নীচে হাজারো তরমুজ। এই প্রকল্প থেকে কৃষকদের বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ, বীজ, সার, কীটনাশক, নেট এবং শ্রমিকদের শ্রম মজুরী প্রদান করা হয়েছে। সরকার দক্ষিন পশ্চিম অঞ্চলে কৃষি বিপ্লব ঘটানোর জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কৃষক ঘেরের পাড়ে তরমুজ চাষে উৎসাহিত হচ্ছেন। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে অধিক দামে বিভিন্ন হাট বাজরে বিক্রি করছেন। ৫-৬কেজি ওজনের তরমুজ বিক্রি হচ্ছে ২৫০-৩০০টাকায়। ছোট বিক্রি হচ্ছে ১৫০-৫০টাকায়। উপজেলার মাদারতলা গ্রামের কংকন মন্ডল ও বারইখালি গ্রামের লিটন বিশ্বাস বলেন, খরায় ফল বেশী বড় হয়নি।

এই প্রকল্পের আওতায় কৃষক চাষ করছেন ওল কচু, ঝিঙ্গে, শসা, করলা, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, মুখি কচু, পানিকচু, চিচিংগা, টমেটো,বাঁধা কপি, ফুলকপি, বেগুন, সুর্যমুখি, কাকরোল, ডেঢ়শ, মরিচ, বরবটি, সিমসহ বিভিন্ন সবজি বছর ব্যাপী উৎপাদন করছেন কৃষক। মাটি ও সার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাটির উর্বরতা মান বজায় রেখে ফসল উৎপাদন করলে ২০-২৫শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। মালচিং পদ্ধতিওে সবজি চাষ করা হয়ে থাকে। প্রকল্পের আওতায় ৫হাজার কৃষক জড়িত রয়েছে এবং ৫হাজার হেক্টর জমিতে এই সবজি উৎপাদন করে কৃষি বিপ্লব ঘটিয়েছে।

বটিয়াঘাটার গঙ্গারামপুর এলাকার কৃষক মো. আ. হালিম হাওলাদার, ওমর আলী হাওলাদার ও মো. ইব্রাহীম কাজী এবং দাকোপ উপজেলার তিলডাঙ্গা এলাকার কৃষক পলাশ বৈরাগী, বিভূতি মন্ডল ও মৃত্যুঞ্জয় মন্ডল বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ কোন জায়গা পতিত রাখা যাবেনা। সে বিষয়টি আমরা মাথায় রেখে ভুট্টা ও তরমুজসহ নানাবিধ সবজি চাষের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। আবহাওয়া অনুকূলে ভালো থাকা ট্রে ও পলিব্যাগ পদ্ধতিতে রোপণ করা হবে। আগে চারা তৈরী করে ক্ষেতে রোপন করলে দ্রুত বড় হয় এবং সময় কম লাগে। এতে আগে থেকেই ফসল কাট যায়। ঝড় বৃষ্টি ও দুর্যোগ আসার আগেই ফসল বিক্রি করা যায়। এই প্রকল্প’র পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণ,বীজ, সার ও নানা রকম উপকরণ বিনা মূল্যে দেয়া করা হয়েছে। এখন বারো মাস সবজি উৎপাদন করা হচ্ছে। দামও বেশ ভালো পাওয়া যাচ্ছে। পদ্মা সেত চালু হওয়াতে অনেক সবজি ঢাকা নেয়া হচ্ছে। এতে কৃষক আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছেন। গত বছর আশানুরুপ ফলন হয়েছে। এ বছর সবজি তরমুজ ও ভুট্টা আবাদের প্রস্তুতি নিয়েিেছ।

গোপালগঞ্জ-খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরা -পিরোজপুর জিকেবিএসপি প্রকল্পের  পরিচালক অমরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস বলেন, কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ মানব সম্পাদে পরিনত করা হয়েছে। প্রশিক্ষণলদ্ধ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সঠিক নিয়মে চাষাবাদ করলে দ্বিগুন ফসল উৎপাদন হবে। কৃষকদের বিনামূলে সার, বীজ প্রশিক্ষণসহ সকল প্রকার উপকরণ কুষকদের মাঝে বিনা মূল্যে প্রদান করা হয়েছে । চারা তৈরী করে রোপন করলে ফসল আগে পাওয়া যায়। লবণাক্ততা আসার আগেই গাছ বেড়ে উঠে। বৈরী আবহাওয়া আসার আগেই কৃষক তার ফসল বিক্রি করতে পারেন।

This post has already been read 2091 times!