Wednesday 7th of December 2022
Home / সংগঠন ও কর্পোরেট সংবাদ / ঢাকায় “জাতীয় মৎস্য কংগ্রেস ও FOAB সম্মাননা ২০২২”অনুষ্ঠিত

ঢাকায় “জাতীয় মৎস্য কংগ্রেস ও FOAB সম্মাননা ২০২২”অনুষ্ঠিত

Published at জানুয়ারি ২২, ২০২২

নিজস্ব প্রতিবেদক: সারাদেশের মৎস্যচাষিদের নিয়ে “জাতীয় মৎস্য কংগ্রেস ও FOAB সম্মাননা ২০২২” শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ফিসফার্ম ওনার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (FOAB)। শনিবার (২২ জানুয়ারি) রাজধানীর বিএমএ মিলনায়তনে উক্ত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সারাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মৎস্যচাষি, আড়ৎদার, সরকারি-বেসরকারি মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীগণ অংশগ্রহণ করেন। এতে কারিগরি সহযোগিতা করে মৎস্য অধিদপ্তর ও ফিসারিজ প্রোডাক্ট বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল (এফপিবিপিসি), বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অনুষ্ঠানে মৎস্য চাষ ও উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখার জন্য  মৎস্য সম্প্রসারণ ও গবেষণায় ৩ জন, মৎস্য সাংবাদিকতায় ২ জন ও  সফল মৎস্য উদ্যোক্তায় ৪ জনকে FOAB সম্মাননা প্রদান করা হয়।

বিশিষ্ট মৎস্যবিদ, সীফুড হ্যাচাপ ও গ্যাপ বিশেষজ্ঞ, ডিপ সী ফিসার্স লিমিটেড (র‌্যাংগস গ্রুপ) -এর পরিচালক সৈয়দ ইশতিয়াক -এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এসিআই এগ্রিবিজনেস ডিভিশন -এর প্রেসিডেন্ট ড. এফএইচ আনসারী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মৎস্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক এবং সিনিয়র মেরিন এডভাইজর (ডব্লিউসিএস) ড. সৈয়দ আরিফ আজাদ। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা খন্দকার হাবিবুর রহমান। আলোচক হিসেবে ছিলেন মৎস্য অধিদপ্তরের সাবেক কাঁকড়া ও কুচিয়া প্রকল্প পরিচালক ড. বিনয় কুমার চক্রবর্তী। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন মৎস্য উন্নয়ন ও সমবায় ব্যাক্তিত্ব, ফোয়াব প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মোল্লা শামসুর রহমান শাহীন।

অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে মোল্লা শামসুর রহমান শাহীন বলেন, মৎস্য সেক্টরে বেশকিছু অসঙ্গতি দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান। কংগ্রেসের মাধ্যমে সরকারের কাছে অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরে সেগুলো দূর করার লক্ষ্যেই আয়োজনটি করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভিশন ২০২২ বাস্তবায়নে মাছ ও চিংড়ি চাষে ডিজিটাল উদ্ভাবনী প্রযুক্তির ব্যবহার ও মৎস্য হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, মাছ চাষিদের সরাসরি প্রনোদনা প্রদান, কৃষির ন্যায় মৎস্য খামারিদের জন্য নূন্যতম বিদ্যুৎ বিল নির্ধারন করা, নিরাপদ মাছ উৎপাদনে প্রযুক্তি সম্প্রসারন ও ট্রেসিবিলিটি বাস্তবায়ন মৎস্য খাতের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ এবং আগামী দিনের চাহিদা মোকাবেলায় এগুলোর সফল বাস্তবায়ন জরুরি, বলে আমরা মনে করি।

অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক মৎস্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক এবং সিনিয়র মেরিন এডভাইজর (ডব্লিউসিএস) ড. সৈয়দ আরিফ আজাদ বলেন, দেশে শুধু পাঙ্গাস খাতেই ৪০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো- ন্যায্য দামের অভাবে গরীবের আমিষখ্যাত এই পাঙ্গাস চাষ কমে যাচ্ছে, সেই সাথে কমছে তেলাপিয়ার চাষ; যা মোটেই ভালো লক্ষণ নয়।

ড. সৈয়দ আরিফ আজাদ জানান, বাংলাদেশে একমাত্র মৎস্য খাতে গত ৩ দশকে ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিগত অর্থ বছরে দেশকে ৮২ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা দিয়েছে এই মৎস্য খাত। এদেশে বছরে সাড়ে ৫ লাখ টন ইলিশ উৎপাদন হয় এবং পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যার কী না শুধুমাত্র মাছের একটি প্রজাতি থেকেই জিডিপি’র ১ শতাংশ অর্জিত হয়। এত কিছু দেয়ার পরও কৃষি খাতের প্রনোদনার ৫ হাজার টাকার মাত্র ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে মৎস্য খাতে, যা সম্পূর্ণ বিমাতাসুলভ আচরন। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, কৃষিতে এত প্রণোদনা ও আমদানিতে ট্যাক্স মওকুফের পরও মৎস্য খাদ্যের দাম কেন কমানো হচ্ছে না। এছাড়াও দেশে অন্তত দুটি মৎস্য ইকোনোমিক জোন হওয়া জরুরি বলে মনে করেন।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি এসিআই এগ্রিবিজনেস ডিভিশন -এর প্রেসিডেন্ট ড. এফএইচ আনসারী বলেন, বিশ্ববাজারে হোয়াইট ম্যাসল ফিলে পাঙ্গাশ ও তেলাপিয়ার ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও রঙ ও গন্ধের কারণে রপ্তানি বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশের পাঙ্গাস ও তেলাপিয়া। এজন্য তিনি, আদর্শ পুকুর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দূর্গন্ধ মুক্ত তেলাপিয়া উৎপাদনে ও হোয়াইট ম্যাসল ফিলে পাঙ্গাস উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে বলেন। সেই সাথে এফসিআর উন্নত করার মাধ্যমে আমাদের উৎপাদন খরচ উন্নয়নের দিকে মনোনিবেশ এবং আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, কৃষির সর্বক্ষেত্রেই প্রযুক্তির বিচরন করতে হবে। মাছ চাষে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হলে উন্নত প্রযুক্তি গ্রহণের বিকল্প নেই। দেশে ‍উৎপাদিত অতিরিক্ত মাছ বিদেশে রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় নিয়ম কানুন মেনে মাছ চাষের আহ্বান জানান এ সময় তিনি।

মৎস্য অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা খন্দকার হাবিবুর রহমান বলেন, একজন মৎস্যচাষি তার চাষকৃত মাছের মাত্র ৫০ ভাগ পায়, বাকী ৫০ ভাগ চলে যায় জেলে, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বাবদ। কারণ, যেসব জেলেরা পুকুরের মাছ ধরে দেয় তারা ২৫-৩০ ভাগ নিয়ে নেয়। বাংলাদেশে মৎস্যচাষিদের কোন কার্যকর কোন সংগঠন না থাকাতে সব সময় চাষিরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বলে উল্লেখ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানের আলোচক ড. বিনয় কুমার চক্রবর্তী বলেন, দেশের উন্মুক্ত জলাশয়ের ১০ ভাগ দখল করে নিয়েছে ভয়ংকর সাকার ফিস; এমনকি মাছটি পুকুরেও ছড়িয়ে পড়েছে।

ঢাকা এয়ারেটর -এর সত্ত্বাধিকারী আবু সাঈদ বকাউল বলেন, চাষিরা পুকুরে মাছ চাষ না করলে এতদিনে আমরা আর ‘মাছে ভাতে বাঙালী’ থাকতাম না। চাষিরা যে পরিশ্রম করে সে অনুযায়ী মাছের দাম পায় না। মাছ রপ্তানির জন্য এয়ারপোর্টে কোল্ড রুম করার দাবী জানান এ সময় তিনি।

বিশিষ্ট মৎস্যবিদ, সীফুড হ্যাচাপ ও গ্যাপ বিশেষজ্ঞ, ডিপ সী ফিসার্স লিমিটেড (র‌্যাংগস গ্রুপ) -এর পরিচালক সৈয়দ ইশতিয়াক বলেন, সরকার কিংবা চাষি কারোরই একার পক্ষে মৎস্য সেক্টরকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব না। টেকসই শিল্প গড়তে হলে উভয়পক্ষকেই সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। আমরা মৎস্য চাষে একটি বিপ্লব আনতে চাই; সেজন্য সবাইকে নিরাপদ মাছ উৎপাদনে সজাগ থাকতে হবে এবং উত্তম মৎস্য চাষ ব্যবস্থাপনা মানতে হবে।

এছাড়াও অনুষ্ঠানে উন্মুক্ত আলোচনায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মৎস্য চাষিগণ তাদের বিভিন্ন সমস্যা ও দাবী দাওয়ার কথা তুলে ধরেন।

This post has already been read 1963 times!