Saturday 4th of February 2023
Home / প্রাণিসম্পদ / কোরবানির পশু জবাইয়ের পূর্বাপর করণীয়

কোরবানির পশু জবাইয়ের পূর্বাপর করণীয়

Published at আগস্ট ২১, ২০১৮

ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম: কোরবানির আগে পশুকে প্রয়োজনীয় বিশ্রামে রাখুন। আর দীর্ঘ ভ্রমণের ফলে ক্লান্ত পশু জবাই করা হলে চামড়া ছড়াতে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়। চামড়ার অনেক অংশ কেটে ছিড়ে যায়।জবাইয়ের ১২ ঘণ্টা আগ থেকে পানি ব্যতিত ব্যতিত অন্য খাবার খাওয়ানো থেকে বিরত থাকুন। এতে করে পাকস্থলীতে অনুজীবের চাপ কম হয় যার ফলে খুব সহজেই চামড়া ছড়ানো যায়। পশুকে কোন ভাবেই ভয় ভীতি প্রদর্শন অথবা মারা যাবে না। এতে করে পশু জবাইয়ের পর রক্তপাত বাধাগ্রস্ত হয়। মাংসে রক্তের পরিমাণ বেশি হলে মাংশের মান কমে যায়।পশুকে ভালোভাবে পরিষ্কার করা খুব জরুরি। শরীর এবং খসে পড়া পশমগুলো সাবান অথবা ডিটারজেন্ট দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। এতে করে চামড়ায় গোবর বা অন্য জীবানুর পরিমাণ অনেক কমে যাবে এতে করে চামড়ায় দ্রুত পচন ও রোধ হবে অনেকাংশে। সংক্রামক ব্যাধিমুক্ত দক্ষ ব্যক্তি দ্বারা পরিচ্ছন্ন পরিবেশে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে নির্ধরিত স্থানে পশু কুরবাণী করুন। জবাইয়ে আগে ভালোভাবে সাবান দিয়ে পশুকে গোসল করিয় নিন।

পশু জবাই ও মাংস প্রস্তুতকরণে পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত ছুরি দা বটি ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি ব্যবহার করুন। পশুর দম গেলেই কেবল চামড়া ছড়ানো শুরু করুন। পশুর চামড়া ছাড়ানো ও মাংস কাটার সময় মাংস যেন সরাসরি মাটি ও ধুলাবালি বা অন্যান্য আবর্জনারসংস্পর্শে না আসে এবং কুকুর বিড়াল হাঁস মুরগি পোকা মাকড় মাছি পোষাপ্রাণি দ্বারা মাংস যাতে দুষিত না হয় সে দিকে লক্ষ রাখতে হবে।

জবাইকালে লক্ষণীয়
জবেহ করার জন্য নোকদার ছুরি আর চামড়া ছড়াবার জন্য মাথা বাঁকানো ছুরি ব্যবহার করুন। গবাদিপশু বিশেষত গরুকে সুন্দর করে রেস্ট্রেইনিং (নিয়ন্ত্রণ) করে কৌশলে উপযুক্ত পরিবেশে শোয়াতে হবে। পরিষ্কার পরিছন্ন এবং হালকা ঢালু এমন যায়গায় বেশি ভালো হয়। জবাইয়ের জন্য খুব ধারালো ছুরি ব্যবহার করা উত্তম, যেন পশুর কষ্ট বেশি না হয়। কোরবানি পশু নিজেই জবাহ করা উত্তম। যদি একান্তই না পারেন তাহলে অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে করিয়ে নিতে হবে। পশুকে জবাহের পর দম ভালোভাবে শেষ হলে সতর্কতার সাথে চামড়া ছড়াতে হবে। গরুর চামড়া ও ছাগলের চামড়া ছড়ানোর ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য আছে। গরুর চামড়া অনেকটা মোটা তাই সাবধানে ছুরি চালাতে হবে। এক্ষেত্রে খুব সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার যেন কোনভাবেই চামড়া ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কারণ, এতে যেমন রয়েছে জাতীয় উন্নতিতে অংশ থাকে এর প্রথমত এতে গরীব দুঃখী লোকের ভাগ রয়েছে। সে অনুভুতি নিয়ে চামড়া ছড়ালে চামড়ায় ক্ষতি কম হতে পারে। খুব তীক্ষ ছুরি দিয়ে সর্তকতা এবং সাবধানে পশুর চামড়া ছড়ালো লাভ বেশি হয় সহজ হয়ে। মাংস প্রস্তুতের সময় রোগাক্রান্ত অংশ যেন সিস্ট অস্বাভাবিক বড় লসিকাগ্রন্থি সিমেন্টের মতো শক্ত কলিজার কোন অংশ পাওয়া গেলে সতর্কতার সাথে সে অংশটুকু পৃথক করে স্বাস্থ্যসম্মত উপায় মাটিতে পুঁতে ফেলুন অথবা বিনষ্ট করে ফেলুন। চামড়া ছড়ানোর পর মাটিতে ছেঁচড়াবেন না। রক্ত, গোবর এবং কাদাযুক্ত মাটি যেন চামড়ায় না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। সবার অলক্ষ্যে মূল্যবান চামড়া যেন কুকুরের খাদ্য না হয়। ছড়ানো চামড়া যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিক্রির ব্যবস্থা নিন। ৫-৬ ঘণ্টার মধ্যে বিক্রয় সম্ভব না হলে লবণ দিয়ে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে।

চামড়ার যত্ন ও সংরক্ষণ
জবাইয়ের পর চামড়া ছড়ানোর জন্য যে জায়গা নির্ধারণ করা হবে তা যেন পরিষ্কার ও পরিছন্ন থাকে। অনেক সময় গরু জবাইয়ের পর গরু মলত্যাগ করে ফেলে চামড়ায় গোবর লেগে যায়। গোবর ও মূত্র চামড়ায় লাগলে তা সহজেই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিতে পচন ধরায়। এতে মান নষ্ট হয়। গোবর লেগে গেলেও সাথে সাথে তা সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে। ছাগলের চামড়া ছড়ানো তুলনামুলক অনেক সহজ। পায়ের চামড়া ছুরি দিয়ে ছড়ানোর পর হাতের আঙ্গুলের উপর চাপ দিয়েই বাকিটা সহজেই ছড়ানো যায়। এক্ষেত্রে ছুরির ব্যাটের অংশ ব্যবহার খুবই সহায়ক হয়। খুব রোদ না থাকলে বেশিক্ষণ না রাখাই ভালো। এতে করে ব্যাকটেরিয়া বংশবিস্তার করে চামড়ার পচন দ্রুত হয়। আর যদি চামড়া বাজারজাত করতে দেরি হয় তাহলে তাতে লবণ দিয়ে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে কয়েকটা নিয়ম আছে। ভিতরের অংশে লবণ দিয়ে পরস্পরের সাথে জড়িয়ে রাখতে হয়। আর একটা নিয়ম লবণ পানি করে তাতে ডুবিয়ে পরে শুকাতে হবে। যদি বাতাস ও রোদ থাকে তাহলেও রোদে শুকিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করা যায়। এক্ষেত্রে বাতাসের যথেষ্ট সরবরাহ আছে এমন স্থান বেছে নিতে হবে।

চামড়া ভালোভাবে ধুয়ে নিন।চামড়ায় লেগে থাকা অতিরিক্ত মাংস, চর্বি এবং ঝিল্লি ভালোভাবে ছুরি দিয়ে উঠিয়ে ফেলুন। না হলে সে সব স্থানে লবণ প্রবেশ করবে না। চামড়ার গোস্তের পিঠ উপরের দিক রেখে মুঠি মুঠি লবণ ছড়িয়ে হাত দিয়ে ভালোভাবে ঘষে তাতে লাগিয়ে দিন। প্রথমবারের লবণ চুষে নিলে আর একবার লবণ ছড়িয়ে দিন। গরু প্রতি ৪ থেকে ৫ কেজি আর ছাগল প্রতি ১ কেজি লবণের দরকার হয়। পারলে লবণ পানিতে ভিজিয়ে তারপর শুকিয়ে নিন।

লেখক: কৃষিবিদ, লেখক ও কৃষি মিডিয়া বিশেষজ্ঞ।

This post has already been read 2284 times!