
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বিভিন্ন ফিড মিলে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই)-এর সাম্প্রতিক অভিযানকে কেন্দ্র করে ফিড শিল্পে সৃষ্ট উদ্বেগ, বিদ্যমান আইনি কাঠামোর ব্যাখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব ও সমন্বয়ের বিষয়টি নিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রোববার (২ আগস্ট) একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় শিল্প উদ্যোক্তারা তাদের উদ্বেগ ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন, আর সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে সমন্বিত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। সভায় উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তারা ফিড ও পোল্ট্রি শিল্পের শীর্ষ সংগঠনগুলোর নেতাদের বক্তব্য মনোযোগসহকারে শোনেন এবং শিল্পের স্বাভাবিক বিকাশ, ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণ ও আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আশ্বাস দেন।

সভায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মো. খালেদ কনক, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পরিচালক ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। শিল্প খাতের পক্ষে অংশ নেন বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (BPICC)-এর সভাপতি মসিউর রহমান, কাজী ফার্মস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জাহেদুল হাসান, বাংলাদেশ এগ্রো ফিড ইনগ্রেডিয়েন্টস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন (BAFIITA)-এর মহাসচিব মো. গিয়াস উদ্দিন খান, ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন–বাংলাদেশ শাখা (WPSA-BB)-এর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান, ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (FIAB)-এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম এবং অ্যানিমেল হেলথ কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (AHCAB)-এর নেতৃবৃন্দ।
আলোচনার শুরুতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. এবিএম খালেদুজ্জামান পশুখাদ্য আইন, ২০১০ এবং পশুখাদ্য বিধিমালা, ২০১৩-এর বিভিন্ন বিধান, ফিড উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণের আইনি কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও ক্ষমতা সম্পর্কে একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন।
এরপর সংগঠনগুলোর নেতারা সাম্প্রতিক বিএসটিআই অভিযানের বিষয়ে তাদের উদ্বেগ তুলে ধরেন। তারা বলেন, দেশে পশুখাদ্য উৎপাদন, নিবন্ধন, মান নিয়ন্ত্রণ, নমুনা সংগ্রহ, পরিদর্শন এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পশুখাদ্য আইন, ২০১০ ও পশুখাদ্য বিধিমালা, ২০১৩-এর অধীনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে সুস্পষ্ট দায়িত্ব ও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সেই বাস্তবতায় একই বিষয়ে বিএসটিআইর অভিযান শিল্পে দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের ধারণা তৈরি করছে, যা উদ্যোক্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে।
তাদের বক্তব্য, ফিড মিলগুলোর নিবন্ধন থেকে শুরু করে নিয়মিত তদারকি, নমুনা সংগ্রহ, মান যাচাই, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ—সবকিছুই প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কোনো প্রতিষ্ঠান অনিয়ম করলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের প্রচলিত আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ সুযোগ রয়েছে। তাই একই বিষয়ে অন্য একটি সংস্থার অভিযান পরিচালনা শিল্পের জন্য জটিলতা সৃষ্টি করছে।
সংগঠনগুলোর নেতারা আরও বলেন, কোনো পশুখাদ্যের গুণগত মান নির্ধারণ একটি বৈজ্ঞানিক ও পরীক্ষানির্ভর প্রক্রিয়া। নির্ধারিত পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণ ছাড়া কোনো পণ্যের মান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক অভিযানে অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষা না করেই জরিমানা আরোপ করা হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। এর ফলে সারা দেশের ফিড শিল্পে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং অনেক উদ্যোক্তা উৎপাদন ও বিনিয়োগ নিয়ে শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন।
বিএসটিআই লাইসেন্সের বিষয়টিও সভায় গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। সংগঠনগুলোর নেতারা বলেন, ২০১৮ সালে ফিড মিলের জন্য বিএসটিআই লাইসেন্স সংক্রান্ত বিধান যুক্ত হওয়ার পর থেকেই তারা বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে আলোচনা করে আসছেন। পরবর্তীকালে দীর্ঘ সময় এ ধরনের অভিযান বন্ধ ছিল। তবে সম্প্রতি আবার অভিযান শুরু হওয়ায় সংগঠনগুলো প্রতিবাদ সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলনের কর্মসূচি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আহ্বান ও আলোচনার আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে তারা সেই কর্মসূচি স্থগিত রেখে সংলাপের পথ বেছে নেয়।
সভায় কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, দেশের প্রাণিসম্পদ ও পোল্ট্রি শিল্প জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। তাই শিল্পের স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় মানসম্মত পশুখাদ্য উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই। তিনি সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে বিষয়টি পর্যালোচনার আশ্বাস দেন এবং অপ্রয়োজনীয় হয়রানি এড়িয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, শিল্পের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ—উভয় বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়েই সরকার কাজ করবে। একই সঙ্গে তিনি উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পশুখাদ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং প্রচলিত আইন ও বিধিমালা কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানান।
সভায় মন্ত্রী আরও বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের বা ভেজাল পশুখাদ্য উৎপাদন করবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি শিল্পের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকেও আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান এবং সদস্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেউ অনিয়ম করলে সংগঠনগুলোকেই আগে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন।
এ সময় অনিবন্ধিত ফিড মিলগুলোকে দ্রুত নিবন্ধনের আওতায় আনা, পশুখাদ্য আইন, ২০১০ ও পশুখাদ্য বিধিমালা, ২০১৩-এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সভা শেষে উপস্থিত শিল্প উদ্যোক্তারা আশা প্রকাশ করেন, আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের নীতিগত অস্পষ্টতা দূর হবে এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগে দেশের ফিড শিল্প একটি স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশে পরিচালিত হওয়ার পথ সুগম হবে।



