১১ মাঘ ১৪২৭, ২৪ জানুয়ারি ২০২১, ১২ জমাদিউস-সানি ১৪৪২
শিরোনাম :

শীতের ঐতিহ্য খেজুরের রস

Published at ডিসেম্বর ২৭, ২০২০

কৃষিবিদ এম. আব্দুল মোমিন : বাংলাদেশে সেই সুদূর অতীত থেকে খেজুর গাছের আধিক্য। বৃহত্তর গাঙ্গেয় বদ্বীপ এলাকা অর্থাৎ যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর ও খুলনা জেলায় বরাবর খেজুরগাছ বেশি জন্মে । একসময় অর্থকরী ফসল বলতে খেজুর গুড়ের বেশ কদর ছিল। ধান উৎপাদনে জমির ব্যবহার ছিল স্বল্প। পড়ে থাকত দিগন্তজোড়া মাঠ। বন-জঙ্গলে ভরা। আর সেখানে বিনা রোপণ ও বিনা পরিচর্যায় বুনোলতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে উঠত খেজুরগাছ। তা থেকে রস বের করে তৈরি হতো উৎকৃষ্ট গুড়। প্রবাদে প্রচলিত কথা যশোরের যশ খেজুরের রস। যশোরের ঐতিহ্যবাহী গুড় পাটালির ইতিহাস অনেক প্রাচীন। খেজুরের রস নিয়ে বহু কবি কত শত কবিতা রচনা করেছেন। একটি কবিতার বর্ণনায় কয়েকটি লাইন ছিল এরকম-

শীত এসেছে আমার বাড়ি/ নিয়ে একটা রসের হাড়ি,

শীত এসেছে আমার দেশে/ দেশটাকে ভাই ভালোবেসে,

শীত এসেছে পিঠা নিয়ে/খেজুরের রস মিঠা নিয়ে…..।

কথিত আছে- খালি কলসি রেখে দিলে ভরে যায় রসে, সেই রসে দিয়ে জ্বাল মন ভরে সুবাসে’। আবার গাভীর সাথে তুলনায় খেজুরগাছ কে বলা হয় ‘মাইট্যা গোয়াল কাঠের গাই-বাছুর ছাড়া দুধ পাই’। কাকডাকা ভোরে খেজুরের রস, মন মাতানো ঘ্রাণ শহরে বিরল। শীতের সাকালে খেজুর রস, মিষ্টি রোদ, কৃষক-কৃষাণির হাসি দারুণ প্রাণশক্তি। কবির ভাষায়, ‘এমন শীতলমিষ্টি কোথা আছে নীর? পান মাত্র তৃষিতের জুড়ায় শরীর’। তাই এ গাছকে অনেকে শখের বসে ‘মধুবৃক্ষ’ বলে থাকে।

পুরো শীতজুড়ে একটি পূর্ণবয়স্ক খেজুরগাছ দৈনিক গড়ে ৫-৬ লিটার রস দিয়ে থাক। একটি গাছ থেকে প্রতি মওসুমে গড়ে ২৫-৩০ কেজি গুড় তৈরি করা যায়।  প্রতি কেজি রসের মূল্য ৪০-৫০ টাকা আর খেজুর গুড়ের মূল্য প্রায় ১৫০-১৮০ টাকা। পরিকল্পনা অনুযায়ী একবিঘা জমিতে প্রায় ১ থেকে ১৫০ গাছ রোপণ করা সম্ভব। ১০০-২০০ খেজুর গাছ আছে এমন পরিবার পুরো বছরের সংসারের ব্যয়ভার বহন করতে পারে। ১টি প্রতিবেদনে দেখা যায় রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় চাষিরা প্রতি বছর ৮-১০ কোটি টাকা আয় করেন খেজুরের রস ও গুড় বিক্রি করেই।

খেজুরের রস মানবদেহের জন্য উপকারী বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ। প্রচলিত খাদ্য হিসেবে খেজুর রস বেশ সস্তা, পুষ্টিকর এবং উপাদেয়। খেজুর রসে অ্যাসপারটিক এসিড, নাইট্রিক এসিড এবং থায়ামিন বিদ্যমান।

ব্রিটিশ আমলে খেজুর গুড় থেকেই তৈরি হতো চিনি। এ চিনি ‘ব্রাউন সুগার’ নামে পরিচিত ছিল। খেজুরের রস থেকে উন্নতমানের মদও তৈরি করা হতো। এই চিনি ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হতো। বিলেত থেকে সাহেবরা দলে দলে যশোর অঞ্চলে এসে চিনির কারখানা স্থাপন করে চিনির ব্যবসায় নামেন। যশোরের ইতিহাস থেকে জানা যায়, এ অঞ্চলের চৌগাছা এবং কোটচাঁদপুরের আশপাশে প্রায় ৫০০ চিনি কারখানা গড়ে উঠেছিল। তখন কলকাতা বন্দর দিয়ে খেজুর গুড় থেকে উৎপাদিত চিনি রপ্তানি করা হতো। মূলত ১৮৯০ সালের দিকে আখ থেকে সাদা চিনি উৎপাদন শুরু হলে খেজুর গুড় থেকে চিনির উৎপাদনে ধ্বস নামে। একে একে কারখানাগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। খেজুরের গুড় থেকে চিনি তৈরি না হলেও এখন পর্যন্ত বাঙালির কাছে খেজুর গুড় পাটালির কদর কমেনি। তবে বিজ্ঞানের এই যুগে এখনো রস থেকে গুড় পাটালি তৈরিতে মান্ধাতা আমলের পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। গুড় পাটালি তৈরিতে আধুনিকতা আনা গেলে এটিও রপ্তানি পণ্যের তালিকায় স্থান পেতে পারে।

শীতে খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য বিশেষ পদ্ধতিতে গাছ কাটেন গাছিরা। খেজুরগাছ থেকে রস বের করার উপযোগী করে কাটা শুরু হয় হেমন্তের প্রথমেই। প্রথম গাছ কাটার পর দ্বিতীয়বার চাঁছ দিয়ে সেখানে বসানো হয় কঞ্চির বিশেষভাবে তৈরি নলি। তার পাশে বাঁশের তৈরি ছোট শলাকা পোঁতা হয় ভাড় (কলস) টাঙানোর জন্য। চোখ বেয়ে নলি দিয়ে রস পড়ে ভাড়ে। খেজুরগাছ কাটা ও তা থেকে রস বের করার মধ্যেও কিছু কৌশল আছে। যে কেউ ভালো করে গাছ কাটতে কিংবা রস বের করতে পারেন না।

কখন, কিভাবে, কোনখানে কেমন করে পোঁচ দিতে হবে এবং যার ফলে গাছ মারা যাবে না, অথচ বেশি রস পাওয়া যাবে তা একজন দক্ষ গাছিই ভালো জানেন। একবার গাছ কাটার পর ২-৩ দিন পর্যন্ত রস সংগ্রহ করা হয়। প্রথম দিনের রসকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় জিরেন। এ জিরেন রস স্বাদে ও মানে অনন্য। জিরেন রস দিয়ে তৈরি হয় উন্নত মানের গুড় ও পাটালি। দ্বিতীয় দিনের রসকে বলা হয় দোকাট এবং তৃতীয় দিনের রসকে বলা হয় তেকাট ওলা। যা দিয়ে তৈরি হয় ঝোল গুড়। রসের জন্য একবার কাটার পর ৫-৬ দিন বিরাম থাকে কাটা জায়গা শুকানোর জন্য। শুকিয়ে গেলে আবার রস সংগ্রহ চলে। এ সময় সুমিষ্ট, সুগন্ধে মৌ মৌ চারদিক। এর সুবাস আর স্বাদে ভিড় জমাতে থাকে পিঁপড়া, মৌমাছি, পাখি ও কাঠবিড়ালি।

বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শীত এলই গাছিরা গাছ পরিষ্কার ও রস জ্বাল করার জায়গা ঠিক করাসহ বিভিন্ন কাজে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। যশোরের চৌগাছার খেজুরগাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকারের বন বিভাগের উদ্যোগে গত কয়েক বছর ধরে খেজুরগাছ রোপণের কাজ চলছে। ‘বৃহত্তর যশোর জেলার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় এ অঞ্চলে রোপিত হয়েছে কয়েক লাখ খেজুরগাছের চারা। দেশি জাতের সঙ্গে পরীক্ষামূলকভাবে আরবীয় খেজুরের চারাও বিভিন্ন নার্সারিতে তৈরি করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে বন বিভাগের একটি সূত্র। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছে, সরকারিভাবে ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ না করলে, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে খেজুরগাছ হয়তো বা আরব্য উপন্যাসের গল্পই হয়ে যাবে।

শোনা যায়, আগেকার দিনে শীত পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই অন্য এলাকা থেকে যশোরে আসতেন গাছিরা। কারণ, যশোর এলাকার মানুষ অতীতে অলস ছিল। সেই গাছিরা গাছ তুলতেন, কাটতেন, রস বের করে গুড় বানাতেন। শীতের শেষে ফাল্গুনের সময় পারিশ্রমিক নিয়ে ফিরে যেতেন নিজেদের এলাকায়। এসব গাছিরা ছিলেন মূলত পেশাদার। কার্তিক থেকে ফাল্গুন- এ ৫ মাস তারা যুক্ত থাকতেন গাছ কাটার কাজে। এখন দিন বদলেছে। ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের দরুন যশোর এলাকার মানুষও শিখে নিয়েছে গাছ কাটা। গ্রামাঞ্চলের প্রায় পরিবারেই আছেন গাছি ও নিজ মালিকানায় আছে কিছু না কিছু খেজুরগাছ। এখন পেশাদার গাছিদের তেমন একটা দেখতে পাওয়া যায় না।

গাঁও-গেরামের’ অভাবের সংসারও রস, গুড়, পিঠা-পায়েসের মৌ মৌ গন্ধে ভরে যায়। গত শতাব্দীতে শুধু গুড় বেচাকেনার জন্যই যশোরের বিভিন্ন নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য বাজার। নদীর পাটা শেওলা ব্যবহার করে তৈরি করা হতো হাজার হাজার মণ চিনি। যা রপ্তানি করা হতো ইউরোপের দেশে। সে সময় গাছিদের কদর ছিল দারুণ। খেজুরগাছ কাটা মৌসুমে খেজুর বাগানেই বাঁধা হতো ছোট কুঁড়েঘর। সেখানেই চলত গাছিদের খাওয়া-দাওয়া, রাত্রিযাপন। খেজুরগাছ কাটা শুরু হতো দুপুরের পর থেকেই। ভোর থেকে রসের ভাড় নামিয়ে তা বাইন বা চুলায় চড়িয়ে জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি হতো। ৫ মাস গাছিরা পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কাটাতেন। রাতে অবসর বিনোদনের জন্য কুঁড়েঘরের পাশে আগুন জ্বালিয়ে বসত কবিগানের আসর। গাছিদের ব্যক্তিগত জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ নিয়ে পুথিসাহিত্যেও কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন- একটি পুথি সাহিত্য ছিল এমন-ঘরেতে বধূয়া কান্দে ফিরে নাহি চাও /গাছি ভাই গাছ কাট দূর দেশে যাও। গুড় মিঠা, রস মিঠা, মিঠা গাছির মন/ সব বোঝে, বোঝেনাতো কুমারী কন্যার মন।

দূর গাঁয়ে বিরহী বধূর দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রয়োজনও এখন আর নেই। ফলে, গাছিদের জীবনের প্রতিচ্ছবিও অনুপস্থিত গল্প কবিতায়। তবুও গাছিরা আছেন। শীত পড়লেই দিন শেষে বাঁকবোঝাই ভাড় নিয়ে তারা ছোটেন খেজুর বাগানে। ধারালো দায়ের কোপে বৃক্ষের বুক বিদীর্ণ করে বের করে আনেন মিঠা রস।

তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে বিজ্ঞানীরা পরামর্শ দিয়েছেন- শীতে খেজুরের রস অথবা পোকা-মাকড়ে বা বাদুড় বা পাখিতে আধ খাওয়া ফল না খেতে। নিতান্ত যদি রস খেতে হয় তা ভালো করে ফুটিয়ে খেতে হবে। তারা আশঙ্কা করছেন, শীতে কাচা খেজুরের রস ও বাদুড় বা পাখিতে আধ খাওয়া যে কোন ফল খেলে বাংলাদেশ, ভারতসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশে নিপা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। করোনার মধ্যে নিপা ছড়িয়ে পড়লে সেটি হবে আরো ভয়াবহ। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ-খেজুরের রস কাঁচা খাওয়ার পরিবর্তে বাণিজ্যিকভাবে এ রসের গুঁড় উৎপাদনে নজরদারি বাড়াতে হবে।

লেখক : ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, ব্রি, গাজীপুর। Email- smmomin80@gmail.com

This post has already been read 630 times!

Fixing WordPress Problems developed by BN WEB DESIGN