৪ কার্তিক ১৪২৬, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ১৯ সফর ১৪৪১
শিরোনাম :

লবণাক্ত জমিতে ভুট্টা চাষে সম্ভাবনার হাতছানি

Published at মার্চ ২৪, ২০১৯

ফকির শহিদুল ইসলাম (খুলনা): আমাদের দেশে ভুট্টা বা কর্ন অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় একটি খাবার। ভুট্টার মোচা পুড়িয়ে খাবার প্রচলন চলে আসছে বহুকাল ধরেই। আধুনিক জীবনেও ভুট্টা তার নিজ গুণে ঠাঁই করে নিয়েছে নানা রূপে নানা স্বাদে। ভুট্টার খই বা পপকর্ন কখনও খায়নি অথবা খেয়ে পছন্দ করেনি এমন মানুষ আজকাল আর খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ক্লান্তিকর দীর্ঘ পথচলা কিংবা ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকার একঘেয়ে সময়গুলোকে কিছুটা বৈচিত্র্যময় করতে পপকর্ন ভালো সঙ্গী। বাচ্চাদের কাছে তো এটা  সবসময়ই প্রিয়। আর সকালের নাশতায় কর্নফ্লেক্স সব ঋতুতে সব জায়গায় সব বয়সীদের জন্য  উপযোগী।

এছাড়াও ভুট্টা থেকে তৈরি হতে পারে নানা রকম রুটি, খিচুরি, ফিরনি, নাড়ুসহ সুস্বাদু ও পুষ্টিকর বিভিন্ন খাবার। মজাদার চাইনিজ খাবার তৈরিতে অপরিহার্য কর্নফ্লাওয়ার ভুট্টারই অবদান। ভুট্টা যেমন সুস্বাদু তেমনি স্বাস্থ্যকর। এতে রয়েছে ভিটামিন এ যা দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে সাহায্য  করে। রক্তস্বল্পতা দূর করতে প্রয়োজনীয় আয়রন ও ভিটামিন বি১২ এর ভালো উৎস ভুট্টা। ভুট্টাতে আছে ভিটামিন এ, সি ও লাইকোপিন যা ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। এতে রয়েছে কোষ্ঠ কাঠিন্য প্রতিরোধী ফাইবার। এতে আছে প্রচুর পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট যা শরীরে শক্তি জোগাতে সাহায্য করে। ভুট্টা ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়, আমাদের হৃৎপি- ও কিডনির সহায়তা করে।

চমৎকার স্বাদ আর পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এ খাবারটি বাংলাদেশের আবহাওয়ায় সারা বছর ধরেই জন্মানো সম্ভব। এর ফলনও হয় অনেক বেশি। মানুষের খাবার শুধু নয় ভুট্টা গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি কিংবা মাছের খাবার হিসেবেও উৎকৃষ্ট বলে এরই মধ্যে প্রমাণিত। হাঁস-মুরগি, মাছ ও গবাদিপশুর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ভুট্টার ভাঙ্গা দানা ও গাছ  অতুলনীয়। জ্বালানি হিসেবেও ভুট্টা গাছ ব্যবহার করা যায়। ভুট্টার চাহিদা তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে, বাড়ছে জমিতে ভুট্টা উৎপাদনে কৃষকের আগ্রহ। সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশের কৃষি জমিতে  খাদ্য শস্য হিসেবে ধান ও গমের পরের জায়গাটি এখন ভুট্টার দখলে। বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ধান ও গমের তুলনায় ভুট্টার উৎপাদন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

উপকুলীয় জনপদ খুলনার লবণ সহিষ্ণু জমিতে গম চাষ করে ভালো ফলন হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের ভুট্রাচাষে আগ্রহ বাড়ছে। উপকুলীয় জনপদে কিভাবে ভুট্টা চাষ করা যায় এ নিয়ে বটিয়াঘাটা মৃত্তিকা গবেষণা ইনস্টিটিউট গবেষণা চালায়। তাদের পরীক্ষামূলক ভুট্টা চাষে ডেমো গবেষণায় ব্যাপক সফলতা অর্জিত হওয়ায় ডিপ্লিং পদ্ধতির পরীক্ষামূলক এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে কৃষকের জমিতেই ভুট্টা চাষ পাইলট প্রকল্প নেওয়া হয়েছে ।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এর পরিচালিত খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা মৃত্তিকা গবেষণা ইনস্টিটিউট নিজস্ব প্লটে ডেমো আকারে বিনা চাষে ডিপ্লিং পদ্ধতিতে ভুট্টা চাষ করে সফলতা অর্জন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি উপকুলীয় জনপদের প্রায় ৩০ ভাগ জমিকে ভুট্টা চাষের আওতায় এনে ভুট্টা চাষে সক্ষমতা অর্জন করার লক্ষ্যে ডেমো আকারে ভুট্টা চাষ করে। ভুট্টা চাষের ডেমো প্লটের সফলতা তাদেরকে উৎসাহিত করছে এই পদ্ধতি কৃষক পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে।

সেই লক্ষ্যে বিনা চাষে কিভাবে কৃষক অল্প বিনিয়োগ করে সফল হতে পারে এবং ভুট্টা চাষের ওপর সরাসরি কৃষক পর্যায়ে দক্ষতা অর্জনের জন্য ২৫ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষের পাইলট প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এ পদ্ধতি ইতোমধ্যে মৃত্তিকা গবেষণা প্লটে আমন মৌসুষ শেষে একই জমিতে ডিপ্লিং ভুট্টা চাষ করে ভালো উৎপাদন হওয়ায় উপকুলীয় জনপদের আমন মৌসুম শেষে কৃষক পর্যায়ে এ চাষ পদ্ধতি ছড়িয়ে দিতেই প্রকল্পের আওতায় ঝিলেরডাঙ্গা গ্রামের কৃষকদের নিয়ে একটি দল গঠন করা হয় । গঠনকৃত দলের সদস্যদের  নিয়ে ২৫ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষে সরাসরি সম্পৃক্ত করা হয়েছে। নতুন এ চাষ সর্ম্পকে কৃষক প্রশিক্ষণ ও এই বড় আকারের প্রদর্শনীর মাধ্যমে আমরা প্রতিনিয়ত কৃষকদের উদ্ধুদ্ধ করে যাচ্ছি। যে ভুট্টা চাষে কৃষকদের কারিগরী সহায়তা প্রদানের আমাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক নিয়োজিত আছেন। যাতে করে কৃষকরা ভুট্টা চাষ পদ্ধতির বাস্তব ভিক্তিক জ্ঞান অর্জন করে তা পরবর্তী বছর আমন ধান কেটে সাথে সাথে ভুট্টার আবাদ শুরু করতে পারে এ জন্য ভুট্টা চাষে ২৫ বিঘার পরীক্ষামুলক পাইলট প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মৃত্তিকা গবেষণা ইনস্টিটিউট।

এ বিষয়ে কথা হয় ভুট্টা চাষের পরীক্ষামূলক পাইলট প্রকল্পের কৃষক পর্যায়ের দলনেতা কাকন মল্লিকের সাথে। তিনি বলেন, আমি মৃত্তিকা গবেষণা ইনস্টিটিউট এর ভুট্টা চাষের ডেমো দেখে উৎসাহিত হই এবং এই পদ্ধতিতে ভুট্টা চাষে আগ্রহ আমার আরো বেড়ে যায়। তারই ধারাবাহিকতায় এ পদ্ধতি আমাদের এই জনপদের কৃষকদের সম্পৃক্ত করে একটি দল গঠন করা হয়। দলের সদস্যরা সরাসরি ডিপ্লিং পদ্ধতির এ ভুট্টা চাষে একদিকে যেমন কম খরচে বেশি লাভবান হতে পারবে অন্যদিকে ভুট্টা চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে দক্ষতাও অর্জন করতে পারবে। কৃষকের এই দক্ষতা আগামী আমন মৌসুম শেষে কাজে লাগালে এ অঞ্চলে লবণ সহিষ্ণু জমিতে বিনা চাষে  ভুট্টা চাষ করে ব্যাপক লাভবান হওয়ার সাথে বাড়বে দেশের ভুট্টার উৎপাদন।

এ বিষয়ে কথা হয় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, আঞ্চলিক কার্যালয়ের খুলনা জেলার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শচীন্দ্র নাথ বিশ্বাস -এর সাথে, তিনি জানান, অল্প জমি থেকে অধিক ফলন এখন সময়ের দাবি। এ দাবি পূরণে সময় এসেছে ভুট্টা চাষের ওপর বাড়তি নজর দেয়ার। খুলনার লবণ সহিষ্ণু জমিতে বিনা চাষে ভুট্টা চাষ করে কৃষক অধিক লাভবান হতে পারে তার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে ভুট্টা চাষের পরীক্ষামূলক পাইলট প্রকল্প। খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন করে সমৃদ্ধি আনতে আমাদের হয়তো আর খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না। এ অঞ্চলের আবাদযোগ্য মোট জমির প্রায় ৩০ ভাগ জমি লবণাক্ততার কারণে অধিকাংশ সময় পতিত পড়ে থাকে। সে কারণে আমাদের বটিয়াঘাটার মৃত্তিকা সম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্লটে পরীক্ষামূলক উপকূলীয় জনপদে এই প্রথম ভুট্টা চাষ করা হয়। আমাদের গবেষণা ডেমো প্লটের ভুট্টা চাষ বেশ সফলতা অর্জন করছে। বিনা চাষে কম খরচে অধিক ভুট্টা উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে উপকূলীয় এ জনপদে। তাই আমরা শুধু ভুট্টাই নয় পাশাপাশী গম, সূর্যমূখিসহ পিট জাতীয় ক্রপ চাষে ব্যাপক সফলতা অর্জনের এই আইডিয়া সরাসরি কৃষক পর্যায়ে প্রশিক্ষণ এবং বাস্তব ভিক্তিক জ্ঞানের জন্য কৃষকের জমিতে আমরা ভুট্টা চাষের এই পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করেছি। যাতে আগামী অর্থ বছরে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকরা অল্প খরচে পছন্দ মতো জাত বেছে নিয়ে তা ভুট্টা চাষের উপযোগী জমিতে করে নিজেও লাভবান হবে অন্যদিকে দেশে ভুট্টার উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশে সাধারণত ভুট্টা বীজ বপনের উপযুক্ত সময় হলো রবি মৌসুমে মধ্য-আশ্বিন থেকে মধ্য অগ্রহায়ণ (অক্টোবর-নভেম্বর) এবং খরিফ মৌসুমে ফাল্গুন থেকে মধ্য-চৈত্র (মধ্য ফেব্রুয়ারি-মার্চ) পর্যন্ত। তাই আগামী অর্থ বছরকে লক্ষ্য রেখে মৃত্তিকা সম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট কৃষকদের প্রশিক্ষণের জন্য এই বড় আকারে পরিক্ষামূলক ভুট্টা চাষ পাইলট প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বিনা চাষে এবং স্বল্প খরচে লাভজনক ভুট্টা চাষের এ প্রকল্প সরেজমিন দেখতে প্রতিনিয়ত দুর দুরান্ত থেকে কৃষকরা আসছেন। উপকূলীয় জনপদের কৃষকরা ব্যাপক হারে ভুট্টা চাষে আগ্রহী হওয়ায় এ লবণাক্ত এলাকায় আরেকটি সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত ভুট্টা চাষ। ভুট্টাকে আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকাতেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে খুব যত্ন সহকরে। খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন করে সমৃদ্ধি আনতে আমাদের হয়তো আর খুব বেশি দিন  অপেক্ষা করতে হবে না।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনিস্টিটিউট এ পর্যন্ত ভুট্টার বেশ কিছু উন্নত জাত ও হাইব্রিড ভুট্টার জাত উদ্ভাবন করেছে। এগুলো হলো শুভ্রা, বর্ণালী, মোহর,  খই ভুট্টা, বারি ভুট্টা-৫, বারি ভুট্টা-৬, বারি  ভুট্টা-৭, বারি মিষ্টি ভুট্টা-১, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-২, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৩, বারি টপ ক্রস হাইব্রিড ভুট্টা-১, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৫, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৬, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৭, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৮, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৯, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১০, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১১, বারি বেবি  কর্ন-১, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১২, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৩।

This post has already been read 375 times!

Fixing WordPress Problems developed by BN WEB DESIGN